বাংলাদেশে পাহাড়ি বন, ম্যানগ্রোভ বন, উপকূলীয় বন, শালবন, কৃত্রিম বন এ ধরনের নানা রকম বন রয়েছে। পাহাড়ি বন বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম ও সিলেট জেলায় অবস্থিত। বৃহত্তর খুলনা জেলায় অবস্থিত ম্যানগ্রোভ বন। বৃহত্তর পটুয়াখালী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ভোলা জেলায় উপকূলীয় বন অবস্থিত। এছাড়া বৃহত্তর ঢাকা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলায় শালবন রয়েছে। পাহাড়ি বনের পরিমাণ ১৩ লাখ হেক্টরেরও বেশি। এসব বনে তেলশুর, চিকরাশি, বৈলাম, গামার, বাঁশ, শিল কড়ই প্রভৃতি গাছ জন্মে। বন্যপ্রাণীর মধ্যে দেখা যায় বানর, শূকর, বন মুরগি, সাপ, শেয়াল, নেকড়ে, কাঠবিড়ালি
প্রভৃতি। লতার মধ্যে রয়েছে কাঞ্চনলতা, আনিগোটা, কুমারিলতা, শতমূলী, গিলা প্রভৃতি। এছাড়া এই জায়গায় অনেক ছনই ঘাস পাওয়া যায়। শালবনটির একটি অংশ ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার মধ্যবর্তী অঞ্চলে। এটি ৮০ কিমি দীর্ঘ ও ৭-২০ কিমি চওড়া। আবার এটি ‘মধুপুর গড়’ নামেও পরিচিত। আরেকটি অংশ শেরপুর জেলায়। এই অংশটি ৬০ কিমি দীর্ঘ ও ১.৫-১০ কিমি চওড়া। এছাড়া শালবনের কিছু অংশ দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নওগাঁ জেলায় অবস্থিত। বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৪.০৭ ভাগ ম্যানগ্রোভ বন। এসব বনের অধিকাংশ এলাকায় হয়, জোয়ারভাটা। ফলে বনের গাছপালা বেশ লবণাক্ত সহনশীল হয়ে থাকে। সুন্দরী, গেওয়া , গরান, বাইন, ধুন্দুল, কেওড়া, গোলপাতা এসব বনের প্রধান বৃক্ষ। এছাড়া এখানকার উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণী হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বানর ইত্যাদি। শালবনের প্রধান বৃক্ষই হলো শাল। এখানকার নব্বই ভাগ এলাকায় শালগাছ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ একটি অংশ সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। রাস্তাঘাট, রেললাইনের দু’ধার, স্কুল-কলেজের আঙিনা প্রভৃতি জায়গায় এই বনায়ন কর্মসূচি পালন করা হয়। এসব কর্মসূচিতে স্থানীয় জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। এ সমস্ত সামাজিক বনে প্রধান বৃক্ষ হলো ইউক্যালিপটাস, কড়ই, আকাশমনি, গোড়ানিম ইত্যাদি। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা যেমন খুলনা, পটুয়াখালী, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম জেলায় উপকূলীয় বন অবস্থিত। এর আয়তন প্রায় ৫২০০০০ হেক্টর। প্রধানত সুন্দরী, গেওয়া, গরান, ধুন্দুল, আমুর, ডাকুর প্রভৃতি পাওয়া যায়। এখানে ঝাউ, কেরু, পনিয়াল, কাঠবাদাম, পিপুল, নিশিন্দার দেখা মেলে।
প্রায় ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দ্রাবিড় সভ্যতার বিকাশের সময়, বনের ব্যবহার সম্পর্কে জানা গেছে। সে সময় তারা গাছ কেটে ঘর বানাত। শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। বেদ, পুরাণ, রামায়ণ ও মহাভারতেও বন ও বনায়ন সম্পর্কে জানা যায়। এই ধরনের গ্রন্থে শাল, বেল, কিংশুক প্রভৃতির কথা উল্লেখ আছে। সম্রাট অশোক সম্পর্কে জানা যায়, তিনি বন ও বন্যপ্রাণী ভালোবাসতেন ও সে সবের খুব যত্ন নিতেন এবং বন সংরক্ষণ করতেন। মুঘলদের আমলে, বন সংরক্ষণের কথা তেমন পাওয়া না গেলেও, বন ব্যবহার করার কথা জানা গেছে। তারা সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য বনের গাছ ব্যবহার করত। পরবর্তী সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যাপকমাত্রায় বন কেটে রেললাইনসহ নানা কাজ শুরু করলেও, ভারতবর্ষে প্রথম বন সংরক্ষণের কথা আসে লর্ড ডালহৌসির আমলে। পরবর্তী সময়ে ১৮৬৪ সালের ১ নভেম্বর প্রথম ভারতে বন বিভাগ চালু হয়। বন এমন একটি প্রাকৃতিক সম্পদ, যেখানে প্রাকৃতিকভাবে গাছপালা পশুপাখি সবাই মিলে একসঙ্গে থাকে। বনের আয়তন বিশাল হয়ে থাকে, যেখানে নানা বৃক্ষরাজি, ছোট-বড় ঝোপঝাড় থাকে। থাকে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী, পাখি ও কীটপতঙ্গ। এখানকার ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও উঁচু কোথাও নিচু, কোথাও শুকনো, কোথাও জলাশয়ে পূর্ণ থাকে। বাংলাদেশে এই প্রাকৃতিক বনের ব্যবহার বহু আগে থেকেই। জাতিসংঘের মতে, সারা বিশ্বে ১.৬ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে বনের ওপর নির্ভর করছে। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে, আজ অবধি বিশ্বের ৮০ শতাংশ বন মানুষের কারণে ধ্বংস হয়েছে। এফএও এর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে জ্বালানি কাঠের বার্ষিক অর্থমূল্য ৪ লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি।
বনের ওপর মানুষ নানাভাবে নির্ভরশীল। এই বনই অক্সিজেন তৈরি করে। আমাদের শীতল রাখে। কার্বন ডাই-অক্সাইড সংরক্ষণ করে। বাতাস পরিষ্কার ও ভূমিক্ষয় রোধ করে। খাবারের জোগান দেয় ও কোটি কোটি মানুষকে চাকরি দেয়। বন বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে, বাতাসকে নির্মল রাখে। পৃথিবীর প্রায় ৩০ কোটি লোক বাস করে বনে। এদের মধ্যে ৬ কোটি লোকই আদিবাসী। এসব মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বনের ওপর নির্ভর করে। একটি তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের গাছ বছরে ৮৫০ জন মানুষ বাঁচায় আর স্বাস্থ্যখরচ কমায় ৬৮০ কোটি ডলার। পৃথিবীর এক কোটি মানুষ সরাসরি বনের ওপর নির্ভরশীল। বন আমাদের বিভিন্ন ধরনের ওষুধসহ মধু, মাশরুম, ফল, বাদাম ইত্যাদির জোগানদাতা। এছাড়া বনের গাছপালা শব্দ প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে, যা মারাত্মক শব্দদূষণ থেকে আমাদের রক্ষা করে। বলা হয়ে থাকে, বাড়ির চারপাশে গাছপালা থাকলে ৫ থেকে ১০ ডেসিবল শব্দ কমিয়ে আনতে পারে। জীবজগতের আশি শতাংশের বসবাস বনে। প্রায় ৬০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদের আবাসস্থল এই বন। এছাড়া উভচর প্রজাতির ৮০ শতাংশ, পাখি প্রজাতির ৭৫ শতাংশ এবং স্তন্যপায়ী প্রাণী প্রজাতির ৬৮ শতাংশের বসবাস বনে। কিন্তু ধীরে ধীরে উজাড় হয়ে যাচ্ছে এসব বন। ডব্লিউডব্লিউএফের তথ্য মতে, প্রতি বর্গকিলোমিটার বন এক হাজার পর্যন্ত জীব প্রজাতি ধারণ করতে পারে। এফএও এর মতে, বিশ্বব্যাপী ২০০০-২০১৫ সাল নাগাদ প্রায় ১.৪ শতাংশ বন হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশে অধিকাংশ বন ধ্বংস হচ্ছে দখলের মাধ্যমে।
বন বিভাগের তথ্য মতে, সারা দেশে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৫৮ একর বন দখলে চলে গেছে। ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গড়ে ২৫ হাজার একর বনভূমি দখল হয়েছে। এসব বন ধ্বংসের কারণে, বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বন্যপ্রাণী। এ ব্যাপারে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর নেচার কনজারভেশনের ২০১৫ সালের প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে বিলুপ্ত প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা ৩১টি। ১৬০০ প্রাণী প্রজাতির মধ্যে ৩৯০টি হুমকির মধ্যে রয়েছে। আর ৫০টির বেশি প্রজাতি ঝুঁকিতে রয়েছে। আইইউসিএনের ২০০০ সাল ও ২০১৫ সালের প্রতিবেদন তুলনা করলে দেখা যাবে, এই বিলুপ্তির হার অত্যধিক। ২০০০ সালে বিলুপ্ত প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা ছিল ১৩টি। অর্থাৎ ১৫ বছরে ১৮টি প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে যা ভয়াবহ বিলুপ্তির হারকে নির্দেশ করছে। বাংলাদেশে বিলুপ্ত প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে ডোরাকাটা হায়েনা, ধূসর নেকড়ে, নীল গাই, সুমাত্রা গণ্ডার, জাভা গণ্ডার, ভারতীয় গণ্ডার, শিঙা হরিণ, মন্থর ভালুক ইত্যাদি। আইইউসিএন-এর মহাবিপন্ন প্রাণীদের তালিকায় আছে হাতি, ভোঁদড়, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিতা, বনরুই, উল্লুক, চশমা পরা হনুমান, বনগরু, সাম্বার হরিণ, কাঠবিড়ালি, কালো ভালুক প্রভৃতি। বেশ কিছুদিন আগে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আয়োজিত এক আলোচনা সভায়, বন উদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উঠে এসেছিল। বলা হয়েছিল, সারা দেশে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৫৮ দশমিক ৮৪ একর বন বেদখল হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬১৩ একর সংরক্ষিত বন। বনভূমি দখল করে আছে এমন ৮৮ হাজার ২১৫ জন চিহ্নিত করা আছে। বনের জমি দখল করে এখানে শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে রিসোর্ট, বসতভিটাও বানানো হয়েছে। এমনকি বনের জমি দখল করে চাষাবাদও করা হচ্ছে। তথ্যমতে, এক লাখ ৬০ হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বনভূমি দখল করে আছে। চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের বন বেশি হুমকির মুখে। ২৮টি জেলায় দখলকৃত বনভূমি রয়েছে।
সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে রয়েছে কক্সবাজার। কক্সবাজার জেলায় দখলকৃত বনভূমির পরিমাণ ৫৯ হাজার ৪৭১ একর। শেরপুরের বনের অবস্থাও খারাপ। এখানকার তিনটি উপজেলায় বনের জমি দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। চাষাবাদ করা হয়েছে। একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার তথ্যমতে, গত এক দশকে পার্বত্য অঞ্চলে বনভূমির পরিমাণ বেশি কমেছে। হ্রাসকৃত বনভূমির পরিমাণ প্রায় ৮২ হাজার ৫৬৮ হেক্টর। বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে বনভূমি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ চাষাবাদ। এখানে অর্থকরী ফসলের চাষ অনেক বেড়ে গেছে। ড্রাগন চাষ যেমন বেড়েছে, তেমনি আম ও কাজু চাষাবাদও করা হচ্ছে। এছাড়া রাবার বাগান তো আছেই। অনেকের মতে, অবৈধভাবে বনের গাছ কাটাও আরেকটি কারণ। যে পরিমাণ বনের গাছ কাটা হচ্ছে, সেই পরিমাণ বনাঞ্চল সৃষ্টি হচ্ছে না। এসব ছাড়াও পার্বত্য অঞ্চলে বিনোদন কেন্দ্র ও রিসোর্টের সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, অর্থ ও লোভ-লালসার কাছে জিম্মি হয়ে গেছে এসব বন আর বনের পশুপাখি। সরকারের উচিত, স্থানীয় এলাকাভিত্তিক প্রকল্প প্রণয়ন করা। যে সমস্ত এলাকায় প্রাকৃতিক বন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, সেসব এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করতে হবে। আমাদের অস্তিত্বকে যদি আমরাই সংরক্ষণ না করি, তাহলে মানবসভ্যতার করুণ পরিণতি কে আটকাবে? এখনো কি সচেতনতা এবং কার্যকরী উদ্যোগের সময় আসেনি!
লেখক: পরিবেশবিষয়ক কলাম লেখক
mitra_bibhuti@yahoo.com