ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডররা এলেন কোথা থেকে

পণ্যের প্রচারণার এক শক্তিশালী কৌশল হলো ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরশিপ। ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরের ইতিহাস নতুন নয়, কেবল আধুনিক যুগের উদ্ভাবন নয়, বরং এর শেকড় মানবসভ্যতার গভীরে প্রোথিত। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

একজন বিখ্যাত বা প্রভাবশালী ব্যক্তির অনুমোদন যখন কোনো পণ্য বা সেবাকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে, তখন সেই প্রক্রিয়াটিকে আমরা ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরশিপ বলি। এর বিবর্তন ঘটেছে সমাজের পরিবর্তন, প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং মিডিয়ার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে। প্রাচীন যুগে যখন কোনো রাজা বা সম্রাট কোনো বিশেষ জিনিস ব্যবহার করতেন, তখন সাধারণ মানুষ সেটাকে সেরা বলে মানত। মিসরের ফারাওদের ব্যবহৃত প্রসাধনী, ভারতের সম্রাটদের প্রিয় বস্ত্র বা মুঘল আমলের নির্দিষ্ট খাবার এসবই জনগণের কাছে বিশেষ মর্যাদা পেত। আবার মন্দিরে দেবতার নামে দেওয়া প্রসাদকেও মানুষ আস্থার প্রতীক হিসেবে নিত। এগুলো ছিল এক ধরনের প্রাচীন ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরশিপ’।

প্রাচীনকালের ‘রাজকীয় সিলমোহর’

প্রাচীনকালে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরশিপ আজকের মতো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত না হলেও, এর ধারণা বিদ্যমান ছিল। সমাজের উচ্চপদস্থ ব্যক্তি, যেমন রাজা-সম্রাট, ফারাও বা মুঘল সম্রাটরা যখন কোনো বিশেষ পণ্য ব্যবহার করতেন, তখন সেই পণ্যটি সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান ও সেরা বলে বিবেচিত হতো। তাদের এই ব্যবহার এক ধরনের ‘রাজকীয় সিলমোহর’ হিসেবে কাজ করত, যা সাধারণের মধ্যে সেই পণ্যের প্রতি আগ্রহ তৈরি করত।

একইভাবে, ধর্মীয় মূর্তি বা পুরোহিতদের অনুমোদনও এক ধরনের অ্যাম্বাসেডরশিপ ছিল। পবিত্র বা সম্মানীয় ব্যক্তিরা যে বস্তু বা প্রতীক ব্যবহার করতেন, তা সাধারণ ভক্তদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠত। এ ধরনের প্রথা বাণিজ্যিক না হলেও, এর মাধ্যমে একটি পণ্য বা ধারণার প্রতি জনসমর্থন ও বিশ্বাস তৈরি হতো।

আধুনিকতার সূচনা

আঠারো শতকের শেষভাগে শিল্পবিপ্লব ইউরোপের সমাজ ও অর্থনীতিতে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। বাষ্পীয় ইঞ্জিন, যন্ত্রচালিত তাঁত, রেলপথ আর বিদ্যুতের কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়া দ্রুত হয়ে যায়। কারিগরের হাতে তৈরি একক পণ্যের যুগ শেষ হয়ে গিয়ে শুরু হয় গণ-উৎপাদনের যুগ। বাজারে একসঙ্গে হাজার হাজার একই ধরনের পণ্য আসতে থাকে সাবান, টনিক, কাপড়, সিগারেট কিংবা প্রসাধনী। এই ভিড়ে সাধারণ ক্রেতা বুঝে উঠতে পারছিল না কোনটি ভালো, কোনটি ভরসাযোগ্য। তখনই কোম্পানিগুলো টিকে থাকার নতুন কৌশল খুঁজতে শুরু করল, আর সেই কৌশলের ফলশ্রুতিতেই জন্ম নিল আধুনিক ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরশিপ।

উনিশ শতকের বিজ্ঞাপনে তাই এক অভিনব দৃশ্য দেখা গেল। টনিক বা ওষুধের বিজ্ঞাপনে চিকিৎসকরা সরাসরি বলছেন, এটি শরীরকে সুস্থ রাখে। তখন চিকিৎসকদের প্রতি মানুষের আস্থা ছিল অপরিসীম, ফলে তাদের কণ্ঠস্বর কোম্পানির জন্য হয়ে উঠত বিশ্বাসযোগ্যতার সনদ। অন্যদিকে ক্রীড়াবিদদেরও ব্যবহার করা হলো সিগারেট বা অন্যান্য পণ্যের প্রচারে। আজকের দিনে এটি অস্বাভাবিক মনে হলেও, তখন ক্রীড়াবিদ মানেই শক্তিও প্রাণশক্ষির প্রতীক। তাদের হাতে কোনো পণ্য মানে সেটি ভালো ও স্বাস্থ্যকর এই বার্তা দ্রুতই সাধারণ মানুষের মনে পৌঁছে যেত। লেখক ও বুদ্ধিজীবীরাও বিজ্ঞাপনে জায়গা করে নিতে শুরু করেন। তাদের ছবি বা নাম ব্যবহার করা হতো বিশেষ করে সাবান, টনিক বা বিলাসবহুল পণ্যের বিজ্ঞাপনে, যাতে শিক্ষিত ও অভিজাত শ্রেণির ভোক্তাদের কাছে এগুলো গ্রহণযোগ্য হয়।

এ সময়ের কিছু কোম্পানি ইতিহাসে নাম লিখে নেয় তাদের দূরদর্শী কৌশল দিয়ে। কোকা-কোলা উনিশ শতকের শেষ দিকে চিকিৎসক ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের ব্যবহার করে পানীয়টিকে শুধু সতেজতার প্রতীক নয়, বরং স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবেও প্রচার করে। পরে তারা সান্তা ক্লজের ছবি ব্যবহার করে ব্র্যান্ডকে উৎসব ও আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়, যা আজও বহমান। জিলেটও তখন ক্রীড়াবিদ ও সেনাদের সামনে এনে তাদের রেজরকে প্রচার করল। শক্তি, সাহস আর সফলতার প্রতীক এই মানুষগুলো পণ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাধারণ পুরুষের কাছে জিলেটকে অপরিহার্য বানিয়ে তোলে।

শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী এ সময়েই নতুন ভোক্তা সংস্কৃতির জন্ম হলো। ভোক্তারা আর কেবল পণ্যের গুণাগুণ দেখে সিদ্ধান্ত নিল না, বরং তার সঙ্গে যুক্ত ভাবমূর্তি বা ইমেজকে গুরুত্ব দিতে শুরু করল। মানুষ ভাবতে লাগল আমার প্রিয় বা শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব যদি এই পণ্য ব্যবহার করেন, তবে নিশ্চয়ই সেটি ভালো। আর সেই আস্থা তৈরির কাজটাই করছিলেন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডররা।

এক কথায়, শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী যুগেই আধুনিক ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরের জন্ম হয়। এখান থেকে যে যাত্রা শুরু হলো, তা পরে রেডিও, সিনেমা ও টেলিভিশনের মাধ্যমে আরও প্রসারিত হলো এবং একবিংশ শতাব্দীতে এসে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে একেবারে নতুন রূপ নিল।

রেডিও, সিনেমা এবং টেলিভিশন

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন রেডিও মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল, তখন বিজ্ঞাপনও এক নতুন মাত্রা পেল। একজন তারকার কণ্ঠস্বর কোটি মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছে যেত। আগে যেখানে বাজার সীমাবদ্ধ ছিল মেলা বা পোস্টারের মধ্যে, সেখানে রেডিও বিজ্ঞাপন হয়ে উঠল সর্বজনীন প্রচারের মাধ্যম।

সিনেমার আবির্ভাব এই প্রভাবকে আরও গভীর করল। বড় পর্দায় তারকাদের দেখার অভিজ্ঞতা দর্শকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলত। হলিউডের তারকারা যেমন চার্লি চ্যাপলিন বা পরে

মেরিলিন মনরো যখন কোনো পণ্যের সঙ্গে যুক্ত হতেন, তা তৎক্ষণাৎ জনপ্রিয় হয়ে যেত। একইভাবে মার্কিন বেসবল কিংবদন্তি বেব রুথ যখন বিজ্ঞাপনের জগতে আসেন, তখন ক্রীড়া তারকাদেরও ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে ব্যবহার করার ধারা তৈরি হয়।

টেলিভিশনের যুগে প্রবেশ করার পর বিজ্ঞাপন যেন ঘরে ঘরে ঢুকে গেল। একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোটি কোটি মানুষ একই বিজ্ঞাপন দেখতে শুরু করল। এর ফলে তারকার প্রভাব বহুগুণ

বেড়ে গেল।

এই ধারার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে মাইকেল জর্ডান ও নাইকির যুগলবন্দিতে। ১৯৮৪ সালে নাইকি ‘এয়ার জর্ডান’ জুতার জন্য জর্ডানকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে বেছে নেয়। এটি শুধু একটি ক্রীড়া সরঞ্জাম ছিল না এটি হয়ে ওঠে একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক, যা তরুণদের ফ্যাশন, জীবনধারা ও পরিচয়ের অংশে পরিণত হয়। এ সময় থেকেই বোঝা গেল ‘তারকা’ ও ‘ব্র্যান্ড’ মূলত একে অপরের পরিপূরক।

একই সময়ে জর্জ ক্লুনি নেসপ্রেসোর বিজ্ঞাপন করে সাধারণ কফিকে বিলাসবহুল অভিজ্ঞতায় রূপ দিলেন। ভারতের শাহরুখ খান শুধু বলিউডের ‘কিং খান’ নন, বরং ব্র্যান্ডিংয়ের দুনিয়ায়ও রাজা হয়ে উঠলেন হুইন্দাই, পেপসি, ট্যাগ হয়ারের মতো ব্র্যান্ডের মাধ্যমে। আর বিয়ন্সে ও রিহানা তাদের গান ছাড়াও ফ্যাশন, কসমেটিক্স ও পারফিউমের জগতে বিশ^ব্যাপী প্রভাব ফেললেন।

সংক্ষেপে, রেডিও, সিনেমা ও টেলিভিশন যুগে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরশিপ হয়ে ওঠে গ্লোবাল প্রপঞ্চ, যা বাজারকে একেবারেই বদলে দেয়।

ইনফ্লুয়েন্সার ও ব্লগারের উত্থান

একবিংশ শতাব্দীতে ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার আবির্ভাব বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় নতুন বিপ্লব ঘটায়। এখন আর শুধু সিনেমা বা খেলার তারকারাই নয়, বরং সাধারণ মানুষও ব্র্যান্ডের মুখ হতে পারেন যদি তার সামাজিক মাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা যথেষ্ট বেশি হয়।

ইউটিউবার ও ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সাররা এখানে বড় ভূমিকা রাখেন। তারা পণ্যের রিভিউ দেন, ব্যবহার করে দেখান, কিংবা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করে তার কার্যকারিতা তুলে ধরেন। এতে প্রচারণা হয়ে ওঠে অনেক বেশি ব্যক্তিগত ও বিশ্বাসযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ, একজন বিউটি ব্লগার যখন নতুন কোনো লিপস্টিক বা কসমেটিক্স ব্যবহার করে ভিডিও দেন, তখন তার ভক্তরা সেটিকে বেশি আস্থার সঙ্গে নেন।

গেমার ও স্ট্রিমাররাও আজ ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। টুইচ বা ইউটিউবে লাখো মানুষ তাদের লাইভস্ট্রিম দেখে। একজন গেমার যদি নতুন কোনো হেডফোন বা গ্রাফিক্স কার্ড ব্যবহার করেন, সঙ্গে সঙ্গে তা দর্শকদের মধ্যে চাহিদা তৈরি করে।

এই নতুন যুগের বিশেষত্ব হলো তাৎক্ষণিক যোগাযোগ : ইনফ্লুয়েন্সাররা তাদের ফলোয়ারদের কমেন্ট বা ইনবক্সে সরাসরি উত্তর দেন, ফলে ব্র্যান্ডের সঙ্গে দর্শকের দূরত্ব কমে যায়।

নিশ মার্কেটিং : বড় তারকারা সাধারণ দর্শকের জন্য কাজ করলেও, ইনফ্লুয়েন্সাররা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর (যেমন গেমার, বিউটি প্রিয় তরুণী, ভ্রমণপ্রেমী) কাছে পৌঁছাতে পারেন।

কম খরচে বিশাল প্রভাব : একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বা ভিডিও কখনো কখনো প্রচলিত বিজ্ঞাপনের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।

ডিজিটাল যুগে তাই ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরের সংজ্ঞা অনেক প্রসারিত হয়েছে। এখন তিনি কেবল পর্দার নায়ক নন, বরং হতে পারেন আপনার পাশের বাড়ির ছেলে, যিনি টিকটকে জনপ্রিয়; অথবা কোনো মেয়ে, যিনি ইনস্টাগ্রামে রান্নার ভিডিও আপলোড করেন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশেও ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরশিপের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। ক্রীড়াজগতের তারকারা এখানে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা এবং তারকা ক্রিকেটার তামিম ইকবাল অসংখ্য স্থানীয় ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের পরিচিত মুখ। তাদের গ্রহণযোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তা ব্র্যান্ডগুলোর প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ক্রিকেটারদের পাশাপাশি, চলচ্চিত্র ও নাটকের তারকারাও এই তালিকায় রয়েছেন। চঞ্চল চৌধুরী, জয়া আহসান এবং শাকিব খানের মতো শিল্পীরাও বিভিন্ন পণ্যের অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করে থাকেন। তাদের সুপরিচিত মুখ এবং জনপ্রিয় ভাবমূর্তি ব্র্যান্ডের পরিচিতি বাড়াতে সাহায্য করে।

ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরশিপের এই বিবর্তনের মাধ্যমে বোঝা যায় যে, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং মিডিয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এটি আরও পরিবর্তিত হবে। এখন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও) এবং ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েন্সারদের নিয়েও কাজ হচ্ছে, যারা ভবিষ্যতে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরশিপের একটি নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত, একজন অ্যাম্বাসেডরের মূল শক্তি হলো তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, প্রভাব এবং মানুষের সঙ্গে তার সংযোগ।