বর্তমানে শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী না হওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং আলোকিত সমাজ গঠনের প্রধান হাতিয়ার হলেও, নানা কারণে শিক্ষার্থীরা আজ স্কুলের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, এই দায় কার? শিক্ষার্থী, অভিভাবক নাকি শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার? একটি শিশুকে স্কুলমুখী করতে পরিবার, শিক্ষক, সমাজ ও রাষ্ট্র সবার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। কিন্তু নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নীতিগত সমস্যার কারণে সেই ভূমিকা আজ কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে দরিদ্র পরিবারের শিশু জীবিকার তাগিদে পড়ালেখা ছেড়ে কাজে নামছে, আবার কোথাও শিক্ষকদের অনুপ্রেরণার অভাব কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার বাঁধাধরা নিয়ম শিক্ষার্থীদের বিমুখ করছে। অন্যদিকে অভিভাবকের উদাসীনতা, প্রযুক্তির অযথা ব্যবহার এবং শিক্ষার মানের প্রশ্নও শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহের কারণ। ফলে মূলত দায় কার, তা নির্ধারণ করা সহজ নয়। বরং বিষয়টিকে গোটা সিস্টেমের ত্রুটি ও সমাজ পরিবর্তনের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়।
শিক্ষার্থীদের স্কুলে না আসার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। যার মধ্যে, প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলার অভাব অন্যতম। শিক্ষকদের কথা শিক্ষার্থীরা মানে না, এমনকি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারামারি বা বিশৃঙ্খল আচরণের কোনো বিচারও হয় না। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা জানে, ক্লাসে উপস্থিত হলে বা না হলেও সমস্যা নেই। ফলে তারা স্কুলে না এসে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে আড্ডা দেয়। এ সমস্যা মূলত সেই সব প্রতিষ্ঠানে বেশি, যেখানে নিয়ম-কানুনের প্রয়োগ নেই। এ ধরনের স্কুল বা কলেজে ভর্তি হলেই শিক্ষার্থীরা পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে, এমনকি দশ বিষয়ে ফেল করলেও পরবর্তী ক্লাসে প্রমোশন পায়। পরীক্ষার নামে, কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মানের প্রতি কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না। প্রতিষ্ঠান প্রধানরা প্রায়ই নিজের চেয়ার বাঁচাতে ব্যস্ত থাকেন, শৃঙ্খলা বা শিক্ষার পরিবেশের প্রতি কোনো মনোযোগ থাকে না। বিশেষ করে, ভারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান প্রধানের অধীনে এ সমস্যা বেশি। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসার আগ্রহ কমে যায়। তারা বুঝতে পারে, শৃঙ্খলাহীন পরিবেশে পড়াশোনার কোনো মূল্য নেই। শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণের অভাব, শৃঙ্খলার ঘাটতি এবং পরীক্ষার নামে প্রহসন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমিয়ে দেয়।
অভিভাবকদের দায় : অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের প্রথম শিক্ষক এবং পথপ্রদর্শক। তাদের ভূমিকা শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন রুটিন এবং অভ্যাস গঠনে সরাসরি জড়িত। যদি অভিভাবকরা শিক্ষার মূল্য না বোঝান বা নিজেরা শিক্ষাকে গুরুত্ব না দেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা স্কুলকে অপ্রয়োজনীয় মনে করবে। অভিভাবকদের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং উৎসাহের প্রতি যতœশীল হওয়া উচিত। যদি বাড়িতে অশান্তি, অর্থনৈতিক সমস্যা বা অভিভাবকের অবহেলা থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করে। অভিভাবকরা যদি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেন, তাদের সমস্যা শোনেন এবং স্কুলের অগ্রগতি অনুসরণ করেন, তাহলে স্কুলবিমুখতা কমবে। এখানে অভিভাবকের দায় আরও বেড়ে যায়, কারণ স্কুলের বাইরে শিক্ষার্থীদের জীবনের বেশিরভাগ সময় বাড়িতে কাটে। অভিভাবকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে ব্যর্থ হলে সমস্যা বাড়ে। স্কুলের শৃঙ্খলাহীনতা বা শিক্ষকের সমস্যা দেখে অভিভাবকরা যদি চুপ করে থাকেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা স্কুলকে অপছন্দ করে। তবে, স্কুলবিমুখতার জন্য শুধু অভিভাবককে দোষারোপ করা ঠিক নয়। স্কুলের পরিবেশ, শিক্ষকের ভূমিকা, সমাজের প্রভাব এবং ডিজিটাল আসক্তিও দায়ী।
শিক্ষকদের দায় : শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের জন্য রোল মডেল এবং তাদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কিছু ত্রুটি শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষমতার অভাব শিক্ষার্থীদের স্কুলবিমুখতার কারণ হয়। যখন শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের দুষ্টুমি বা অমনোযোগী আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন, তখন ক্লাসে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়। এতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ হারায় এবং স্কুলে আসার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি যদি একঘেয়ে বা অপ্রীতিকর হয়, তবে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আগ্রহ হারায়। আধুনিক ও আকর্ষণীয় পাঠদানের পরিবর্তে, শুধু বইয়ের পড়া মুখস্থ করানো শিক্ষার্থীদের স্কুলবিমুখ করে। শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার অভাবও এই সমস্যার জন্য দায়ী। শিক্ষার্থীরা যখন শিক্ষকদের কাছ থেকে সহানুভূতি বা উৎসাহ পায় না, তখন তারা স্কুলকে নিরুৎসাহিত পরিবেশ মনে করে। এছাড়া, কিছু শিক্ষক শিক্ষার্থীদের প্রতি অতিরিক্ত কঠোর বা শাস্তিমূলক আচরণ করেন, যা শিক্ষার্থীদের মনে ভয় বা বিতৃষ্ণা তৈরি করে। যদিও প্রতিষ্ঠান প্রধান বা নীতিনির্ধারকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ, শিক্ষকদের দায় অস্বীকার করা যায় না। শিক্ষকরা যদি শৃঙ্খলা বজায় রাখেন, পাঠদানকে আকর্ষণীয় করেন এবং শিক্ষার মান উন্নয়নের চেষ্টা করেন তাহলে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির হার অবশ্যই বাড়বে।
রাষ্ট্রের দায় : শিক্ষার্থীদের স্কুলবিমুখতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় অনস্বীকার্য। এখনো গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হয়নি। পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক নেই, শ্রেণিকক্ষে শিখনপদ্ধতি একঘেয়ে, পাঠ্যক্রম বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন। ফলে প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীরা স্কুলে আগ্রহ হারাচ্ছে। দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও সামাজিক বৈষম্যও স্কুলবিমুখতার বড় কারণ, যা মোকাবিলায় রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা থাকা উচিত। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা অবকাঠামো জরাজীর্ণ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার সীমিত এবং বিনোদনমূলক শিক্ষার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশের বদলে মুখস্থনির্ভর মূল্যায়ন তাদের ক্লান্ত করে তোলে। এসব সমস্যার সমাধান না হলে শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের বিমুখতা বাড়বে। তাই রাষ্ট্রকে সর্বজনীন ও মানসম্মত শিক্ষা, শিক্ষকের প্রশিক্ষণ, সৃজনশীল পাঠ্যক্রম, দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র দায়িত্বশীল হলে শিক্ষার্থীরা শুধু স্কুলমুখী হবে না, বরং শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে জাতির সম্পদে পরিণত হবে। অভিভাবক, শিক্ষক ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের স্কুলের প্রতি আগ্রহী করে তোলা সম্ভব।
লেখক : যুগ্ম মহাসচিব,বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটি
sayedzamanwlfsac@gmail.com