কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীকে প্রথমে ধর্ষণের চেষ্টা করে কবিরাজ মোবারক। এ ঘটনা দেখে ফেলেন শিক্ষার্থীর মা। বাধা দিলে প্রথমে মাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন মোবারক। মেয়ে বাধা দিলে তাকেও হত্যা করেন। এরপর চারটি মোবাইল ও একটি ল্যাপটপ চুরি করে পালিয়ে যান কবিরাজ। গতকাল মঙ্গলবার কুমিল্লা জেলা পুলিশের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
কুমিল্লা নগরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কালিয়াজুরী এলাকার একটি ভবনের দোতলার ভাড়া বাসা থেকে গত সোমবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আফরিন (২৩) ও তার মা তাহমিনা বেগমের (৫২) লাশ উদ্ধার করা হয়। ওইদিন সন্ধ্যায় কুমিল্লা নগরের বাগিচাগাঁও এলাকা থেকে কবিরাজ মো. মোবারক হোসেনকে (২৯) গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি দেবিদ্বার উপজেলার কাবিলপুর গ্রামের মৃত আবদুল জলিলের ছেলে।
গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান বলেন, ঝাড়ফুঁকের কাজে ওই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল মোবারকের। এ সুযোগে রবিবার সকালে তিনি বাসায় প্রবেশ করেন।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, বাসায় ঢুকে ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন মোবারক। ওই সময় শিক্ষার্থীর মা বাধা দিলে প্রথমে তাকে অন্য ঘরে নিয়ে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করেন। পরে ছাত্রীকে আবার ধর্ষণের চেষ্টা করলে প্রতিরোধের মুখে গলাটিপে হত্যা করেন তিনি। হত্যার পর ঘর থেকে চারটি মোবাইল ফোন ও একটি ল্যাপটপ নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যান।
ধর্ষণ হয়েছে কি না এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে এসপি নাজির আহমেদ খান বলেন, এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে এলে স্পষ্ট হবে।
এদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তার মায়ের হত্যাকা-ে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং বিচার দাবিতে পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষার্থীরা। তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন।
গতকাল দুপুর ১২টা থেকে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন শুরু করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী। তাদের ভাষ্য, প্রশাসনকে ১২ ঘণ্টা সময় দেওয়ার পরও তারা ঘটনার বিস্তারিত জানাতে গড়িমসি করছে। এজন্য তারা পুলিশ সুপার কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করছেন। পরে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ।
এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের বেলা ২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তার কথা না শুনে অবরোধ করতে থাকেন।
এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘১২ ঘণ্টা পার হলো, পুলিশ পুলিশ কী করব’, ‘ফাঁসি ফাঁসি চাই, খুনিদের ফাঁসি চাই’, ‘তুমি কে আমি কে, সুমাইয়া, সুমাইয়া’, ‘আমার বোন কবরে, খুনি কেন বাইরে’, ‘বিচার চাই, বিচার চাই, সুমাইয়া হত্যার বিচার চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নিহত সুমাইয়ার সহপাঠী নুরানি শেখ বলেন, ‘আমরা আমাদের সহপাঠীকে হারিয়েছি। কিন্তু ঘটনার শুরু থেকেই পুলিশ বিষয়টি নিয়ে টালবাহানা করছে। যে পর্যন্ত পুলিশ সবকিছু পরিষ্কার করবে না, সে পর্যন্ত আমরা এখান থেকে এক পা-ও নড়ব না। প্রয়োজনে কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও কুমিল্লা নগর অচল করে দেবে।’
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রবিবার সকাল ৮টা ৮ মিনিটে এক ব্যক্তি মাথায় টুপি ও সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরে ওই বাসায় প্রবেশ করেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বেলা ১১টা ২২ মিনিটে তিনি বাসা থেকে বের হয়ে যান এবং ১১টা ৩৪ মিনিটে আবার বাসায় প্রবেশ করেন। এরপর দুপুর ১টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত আর কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
নিহতের বড় ছেলে আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম (ফয়সাল) বলেন, ‘রবিবার রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে বাসায় এসে দেখি দরজা খোলা। একটি টুল দিয়ে দরজা মিলিয়ে রাখা হয়েছে। ভেতরে প্রবেশ করে দেখি লাইট বন্ধ। লাইট অন করতেই দেখি বোনের কক্ষে তার নিথর দেহ পড়ে আছে আর মায়ের কক্ষে মায়ের নিথর দেহ। আমরা জানি না কে বা কারা আমার মা ও বোনকে হত্যা করেছে। আমি সঠিক তদন্ত এবং খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আমাদের তেমন কোনো শত্রু ছিল না। কারা এভাবে আমাদের নিঃস্ব করল জানি না।’