দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে একের পর এক অভ্যুত্থানের ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট থেকে পাকিস্তানে ইমরান খানের পতন, বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর এবার আন্দোলনের আগুনে জ্বলে উঠেছে নেপাল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা জারির পর শুরু হওয়া এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন।
শুরুতে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নামলেও অল্প সময়েই সেটি রূপ নেয় দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে। ক্রমেই তা এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি ও রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পাওডেল পদত্যাগে বাধ্য হন। রাজনৈতিক মহলের গুঞ্জন, ওলি ইতিমধ্যে দুবাইয়ে পালানোর পরিকল্পনা করছেন।
রাজধানী কাঠমান্ডুতে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান তোলে—‘কেপি চোর, দেশ ছাড়’। এর মধ্যেই ওলি, রাষ্ট্রপতি পাওডেল ও মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যের ব্যক্তিগত বাসভবন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার মালিকানাধীন কাঠমান্ডুর বিখ্যাত হিলটন হোটেলও আগুনে পুড়ে যায়।
শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের প্রতিধ্বনি
দৃশ্যপট অনেকটা ২০২২ সালের শ্রীলঙ্কা ও ২০২৪ সালের বাংলাদেশের মতোই। শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু করে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ পর্যন্ত বিক্ষোভকারীদের দখলে চলে যায়। গোতাবায়া রাজাপাকসে পালান মালদ্বীপে। বাংলাদেশে নির্বাচনী সংকট ঘিরে একই ধরনের জনরোষে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে আশ্রয় নেন ভারতে।
২০০৮ সালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকে নেপাল ক্রমাগত রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে আছে। গত ১৭ বছরে দেশটিতে ১৪টি সরকার পরিবর্তন হয়েছে, বেশির ভাগই জোট সরকার। ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও কর্মসংস্থানের সংকটে হতাশ হয়ে পড়েছে তরুণ প্রজন্ম। এরই মধ্যে নেতাদের সন্তানদের বিলাসী জীবনযাপনকে ঘিরে শুরু হয় আলোচিত ‘নেপো কিড’ আন্দোলন।
ওলির চতুর্থ দফায় ক্ষমতায় এসে প্রথম বিদেশ সফর ছিল বেইজিংয়ে—যা নেপালের প্রচলিত রাজনৈতিক প্রথাকে ভেঙে দেয়। সাধারণত নতুন প্রধানমন্ত্রী প্রথম সফরে ভারত যান। এরপর চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যোগ দিয়ে নেপাল ৪১ মিলিয়ন ডলার সহায়তা নেয়। এ সিদ্ধান্তে অলির প্রতি বিরূপতা আরও বেড়ে যায়।
ভূরাজনীতির নতুন টানাপোড়েন
চীনের প্রভাব বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রও তৎপর হয়ে ওঠে। ট্রাম্প প্রশাসন নেপালকে ফিরিয়ে আনে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ‘মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কমপ্যাক্ট’ প্রকল্পে। এতে দুই পরাশক্তির প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করে। ওলি চীনের জাতীয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নেওয়ার পর তাঁকে খোলাখুলিভাবে মার্কিনবিরোধী শিবিরের অংশ হিসেবে দেখা হয়।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পতনের মতো নেপালের সাম্প্রতিক অস্থিরতার পেছনেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাই প্রধান—এমন বিশ্লেষণ দিচ্ছেন অনেকেই। বিশ্লেষক এসএল কান্তনের মতে, ‘এটি শতভাগ মার্কিন প্রভাবিত বিপ্লব’।
অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিযোগিতা নেপালের সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—নেপাল কি দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটি ভূরাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নিতে যাচ্ছে?