ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো মঙ্গলবার। ভোটের চূড়ান্ত ফল গতকাল সকালে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে ইসলামী ছাত্রশিবির ভিপি, জিএস, এজিএসসহ ডাকসুর ১২টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে ৯টি পদ জিতে নিয়েছে। ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩৭ বার ডাকসু নির্বাচন হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালের নির্বাচনে ভিপি হয়েছিলেন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নুরুল হক নুর। জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) গোলাম রাব্বানী। ওই নির্বাচন হয়েছিল সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে। অবাক করা ব্যাপার হলো, এরশাদ সরকারের সময়ই ডাকসু নির্বাচন সবচেয়ে বেশি হয়েছে। ওই সময় পাঁচবার নির্বাচন হয়েছে। ডাকসু নির্বাচনী ঐতিহ্যের এই বিদ্যাপীঠে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদে বরাবরই সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এবারও তাই হলো। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক দলের প্রার্থী চমৎকার সংযম প্রদর্শন করেছেন। স্বাধীনতার পর ছাত্রশিবির ডাকসু নির্বাচনে সুযোগ পায়নি। এবার নিজেদের সাংগঠনিক পরিচয় নিয়েই অবাধে ডাকসু নির্বাচনে নিজেদের হাজির করেছেন। শেষে তারাই হাসলেন জয়ের হাসি। ডাকসু নির্বাচনের ফল নিয়ে হাজার বিতর্ক হতে পারে। তবে ডাকসুতে ইতিহাস গড়েছেন শিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটে’র প্রার্থীরা। সত্য যে, ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (ডাকসু) অভাবনীয় জয় পেয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর এই সহযোগী সংগঠন যেখানে স্বাধীন বাংলাদেশে অতীতে কখনো ডাকসু নির্বাচনে প্রকাশ্যে প্যানেল দিতে পারেনি, কেন্দ্রীয় সংসদের কোনো পদে কখনো জয় পায়নি, সেখানে তারা এবার ভূমিধস বিজয় নিয়ে এলো। যদিও ডাকসু নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছেন ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান। অন্যদিকে জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ছাত্রদল সমর্থিত প্রার্থী শেখ তানভীর বারী হামিম শিক্ষার্থীদের রায়কে সম্মান জানিয়েছেন।
ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান বলেন, ‘পরিকল্পিত কারচুপির এ ফল দুপুরের পরপরই অনুমান করেছি। নিজেদের মতো করে সংখ্যা বসিয়ে নিন। এই পরিকল্পিত প্রহসন প্রত্যাখ্যান করলাম।’ ডাকসু নির্বাচনে প্রকাশ্য কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলের প্রার্থী উমামা ফাতেমা। এরপর আবিদ ফেসবুকে বলেন, ‘আবিদ আপনাদের কখনো ছেড়ে যাবে না। আমার যাত্রা এখানেই শেষ নয়, আমার যাত্রা আরও অনেক দীর্ঘ।’ ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে’ শিবির ডাকসু নির্বাচনে জয় পেয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। গতকাল রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলতে পারি না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতে ইসলামীর এত ভোট কোত্থেকে এলো। আমার তো হিসাব মেলে না ভাই।’ তিনি এটাকে কারচুপি না, বরং ‘গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস’ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সেভাবেই চললাম, আর তলে তলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে ছাত্রলীগের সব ভোট জামায়াত নিয়ে নিল।’ ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৯ সালে। কিন্তু অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদে আওয়ামী লীগের ১৬ বছরে বা তার আগেও অনেক বছর কোনো নির্বাচন হয়নি। ডাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) পদে বিজয়ী আবু সাদিক কায়েম বলেছেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আমাদের ওপর নেতৃত্বের আমানত রেখেছেন। শিক্ষার্থীরা আমাদের ওপর যে আমানত রেখেছেন, আমরা এর যথাযথ হক আদায় করব ইনশাআল্লাহ। আমরা কথা দিচ্ছি, আমাদের শিক্ষার্থীদের যে স্বপ্নের ক্যাম্পাস, সেই ক্যাম্পাস বিনির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামব না। আমাদের লড়াই চালিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ। শিক্ষার্থীদের ভয়েস আমাদের ভয়েস। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা আমাদের প্রত্যাশা।’
সবচেয়ে বড় কথা, ডাকসু নির্বাচনের যে যাত্রা শুরু হয়েছে তা যেন বন্ধ না হয়ে যায়। যদি নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়, তাহলে নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে। তারা জাতীয় নেতৃত্বে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে। ডাকসুতে সুষ্ঠু, গণতান্ত্রিক, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনী যাত্রা যেন বন্ধ না হয়, সেটি গণতন্ত্রকামী সবার প্রত্যাশা। নির্বাচনে যারা পরাজিত হয়েছেন, মনে রাখা দরকার, পরাজয়ের এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে জয়ের বার্তা নিয়ে আসবে। তবে জাতীয় নির্বাচনে এই ফলে কোনো ধরনের প্রভাব পড়বে কি না তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে আজকের জাকসু নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।