ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় দ্বিতীয় স্ত্রীকে পুনরায় বিয়ে করে সম্পত্তি দিয়ে দিবে ভেবে নিজের বাবাকে মাথায় পাইপ দিয়ে আঘাত করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ছেলে মাহমুদুল হাসান।
বৃহস্পতিবার বিকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জহিরুল আলম তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নথিভুক্ত করেন।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি জানায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুলিশ সুপার শচীন চাকমা। ঘটনার আটদিনের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পিবিআই।
গ্রেপ্তারকৃত আসামি মো. মাহমুদুল হাসান (২১) নাসিরনগর উপজেলার ফান্দাউক গ্রামের মৃত হাজী মো. আলম মিয়ার ছেলে। সম্পত্তি লোভে নিজের বাবা আলম মিয়াকে (৬০) হত্যা করে ঘটনার তিনদিন পর গত ৬ সেপ্টেম্বর নিজেই বাদী হয়ে নাসিরনগর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
গতকাল বুধবার বিকাল আনুমানিক সাড়ে পাঁচটার দিকে মাহমুদুলকে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নিজের বাবা আলমকে হত্যার দায় পিবিআইয়ের কাছে স্বীকার করেছে মাহমুদুল।
পিবিআইয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা গেছে, বাবাকে হত্যার তিনদিন পর মাহমুদুল নিজেই বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী আমেনা বেগম এবং আমেনার পূর্বের স্বামী মমিন মিয়াকে হত্যাকাণ্ডের জন্য সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করে মাহমুদুল।
পিবিআইয়ে প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোস্তফা কামাল এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার শচীন চাকমার তত্ত্বাবধানে পুলিশ পরিদর্শক মো. বেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে ছায়া তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়।
হত্যাকাণ্ডের সমস্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে পিবিআই বুঝতে পারে, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এজাহারে সৎ মা আমেনা ও তার পূর্বের স্বামীকে সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করলেও সম্পত্তির লোভ, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন মাহমুদুলের অস্বাভাবিক গতিবিধি, মুঠোফোন চুরির ঘটনা গোপন করা এবং সাজানো চুরির গল্প সবকিছুই মাহমুদুলের দিকে সন্দেহ ঘনীভূত করে।
বাদী মাহমুদুল হাসান তার এজাহারে দাবি করেছেন, গত ৩ সেপ্টেম্বর অজ্ঞাতনামা আসামিরা তার বাবার বাড়ির টিনের চালা কেটে এবং পেছনের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা আলম মিয়াকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করে। এরপর হত্যাকারীরা আলমের আলমারি থেকে আলমের প্রয়াত স্ত্রী বিলকিস বেগমের আড়াই লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার চুরি করে নিয়ে যায়। এজাহারে তার দাবি, মাহমুদুল ঘটনার সময় সিলেটে ছিলেন এবং বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসেন।
মাহমুদুল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাত দিয়ে এসপি শচীন চাকমা বলেন, ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর মাহমুদুলের মা বিলকিস বেগম মারা যান। মাহমুদুলের ধারণা ছিল, বাবা আলম তার মায়ের সুচিকিৎসা করেননি এবং তার মা জীবিত থাকাবস্থায় বাবা পুনরায় বিয়ে করতে চেয়েছিল। আলম প্রায় সময় অকত্য ভাষায় মাহমুদুলকে গালিগালাজ করত।
এছাড়াও একাধিকবার মাহমুদুলকে তার স্ত্রীর সামনে চড় মেরেছিলেন আলম। দ্বিতীয় স্ত্রীকে পুনরায় বিয়ে করে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার চিন্তা করায় মাহমুদুল তার বাবাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন এবং পরিকল্পনা করে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২ সেপ্টেম্বর সিলেট যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন মাহমুদুল এবং বাড়ির পেছনের দরজা খোলা রাখেন। এরপর বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করে রাত আনুমানিক আটটার দিকে পেছনের খোলা দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন এবং ঘরের মাচার ওপর লুকিয়ে থাকেন।
এরপর সুকৌশলে বাবা আলমকে ফোন করে দ্রুত বাসায় আসার জন্য চাপ দের মাহমুদুল। আলম বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন। রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে মাহমুদুল লোহার পাইপ দিয়ে মাথায় আঘাত করে তার বাবা আলমকে হত্যা করেন। হত্যার পরে লোহার পাইপটি বাড়ির সামনের পুকুরে ফেলে দেয়।
তিনি আরও বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে মাহমুদুলের দেখানো স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ৩ ফুট লম্বা ও দেড় ইঞ্চি প্রস্থের লোহার পাইপটি নাসিরনগরের ফান্দাউক থেকে উদ্ধার করে পিবিআই।