শুক্রবার বিকেল তিনটার কিছু পরে। মাত্র ১৯ বছরের সিনেলেথু ইয়াসোর সবচেয়ে আনন্দের জায়গা তখন ক্রিকেট মাঠ। কৃত্রিম সবুজ টার্ফের মাঝে ঝকঝকে সাদা পোশাকে তার উপস্থিতি পুরো চিত্রটিকেই আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। মাঠের চারপাশ থেকে ভেসে আসছে স্থানীয় কাওয়াইতো সঙ্গীতের ছন্দ। ইয়াসো দৌড়ে এসে বল হাতে তুলে নিলেন। প্রতিপক্ষ অনূর্ধ্ব-১৩ বালক দল। তাই কোচ বলে দিয়েছেন কিছুটা কোমল থাকতে। কিন্তু ইয়াসোর নিখুঁত লাইন ও লেন্থে একের পর এক তিনটি ডেলিভারিতেই বল মিস করলেন ব্যাটসম্যান। চতুর্থ বলে ব্যাটে লাগলেও সেটি উড়ে গিয়ে সরাসরি ইয়াসোর হাতে পড়লো ধরা। মাঠের বাউন্ডারি লাইনের পাশে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে দৃশ্যটি দেখছিলেন কারস্টেন। তার ভাবনা, ‘এই টাউনশিপগুলোতে অবিশ্বাস্য প্রতিভা আছে। অভাব শুধু সুযোগের।’
সুযোগ এনে দিলেন গ্যারি কারস্টেন
ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর কারস্টেন ২০১৪ সালে গড়ে তুলেছিলেন অলাভজনক সংগঠন ‘ক্যাচ ট্রাস্ট’। অনেকে প্রতিভাবানদের শহুরে অভিজাত স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে গিয়ে সুযোগ করে দেন, কিন্তু কারস্টেন বেছে নিয়েছিলেন অন্য পথ—সরাসরি টাউনশিপে বিশ্বমানের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া। টাউনশিপ হলো দক্ষিণ আফ্রিকার অশ্বেতাঙ্গ জনপদগুলোর জন্য সংরক্ষিত শহরতলির মতো জায়গা, যাকে ‘বস্তি’ বললেও-ভুল বলা হয় না। ন্যাশনাল ট্রেজারির ২০০৭ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী কম করে হলেও দক্ষিণ আফ্রিকায় এমন টাউনশিপ রয়েছে ৭৬টি। ২০১১ সালের তথ্যানুযায়ী বড় আকারের টাউনশিপ আছে ২০টি, যেখানে বাস চার থেকে পাঁচ লক্ষ মানুষের। কেপটাউনের এমনই একটি টাউনশিপ হলো খায়েলিতশা। যার জনসংখ্যার ৯৮.৬ শতাংশই হলো ব্ল্যাক আফ্রিকান।
২০১৫ সালে ইয়াসো প্রথম ক্রিকেটের অংশ হন। নাচের শিক্ষকই ছিলেন তার প্রথম ক্রিকেট কোচ। তারপর থেকে তার জীবনে ক্রিকেট হয়ে ওঠে অবিচ্ছেদ্য অংশ। নারী ক্রিকেটের কোচ বাবালওয়া ‘বাবস’ জোথের তত্ত্বাবধানে ইয়াসো দ্রুতই বয়সভিত্তিক দল পেরিয়ে ২০২১ সালে ওয়েস্টার্ন প্রভিন্স সিনিয়র দলে জায়গা করে নেন। তার নিজের স্বীকারোক্তি, ‘নিউল্যান্ডসে প্রথম খেলতে গিয়ে ভীষণ চাপ ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম পিচটা আমার খেলার সঙ্গে মানিয়ে যায়।’
অথচ খায়েলিতশার কোনো স্কুলে ছিল না খেলার অস্তিত্বই
২০১৪ সালে ক্রিস হানি সেকেন্ডারি স্কুলের প্রিন্সিপাল মাদোদা মাহলুৎসানার সঙ্গে হাত মিলিয়ে কারস্টেন খায়েলিতশার আটটি স্কুল ঘুরে দেখেন। চমকে ওঠেন এটা জেনে যে, কোনো স্কুলে ক্রিকেট তো দূরে থাক, খেলাধুলারই কোনো কার্যক্রম ছিল না। সেখান থেকেই শুরু। প্রথমে পাঁচটি স্কুলে নেট বসানো হয়, তিনজন কোচ নিয়োগ হয়। ধীরে ধীরে তৈরি হয় স্থায়ী কৃত্রিম পিচ, তারপর ২০২১ সালে তিন লেনের ইনডোর সেন্টার।
এখন বছরে ৬ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রায় ৪০০ কিশোর-কিশোরী এখানে নিয়মিত অনুশীলন করে। আছেন ১৮ জন কোচ। শুধু খেলা নয়, তাদের পড়াশোনার টিউটর, মানসিক স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য, এমনকি আর্থিক সচেতনতা নিয়েও ওয়ার্কশপ হয় নিয়মিত। কোচ জোথে বলেন, ‘এখানকার সবাই পেশাদার ক্রিকেটার হবে না, কিন্তু সবাই ক্রিকেট থেকে কিছু না কিছু পাচ্ছে। এই জায়গাটা আমাদের স্বপ্নের মতো—আমাদের ঘর।’
সময় এখন ক্রিকেট দিয়েই ক্রিকেটের ঋণ শোধ করার
গ্যারি কারস্টেন বলেন, ‘ক্রিকেট আমাকে সব দিয়েছে। এখন আমার কিছু ফেরত দেওয়ার পালা।’ তার কাছে ক্রিকেট মানেই ছিল নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়। ধনী স্কুলগুলোর দল বিদেশ সফরে যায় বটে, কিন্তু টাউনশিপের শিশুদের জন্য সেটা কল্পনাতীত। ২০১৯ সালে পুরুষদের বিশ্বকাপের সময় তিনি ক্যাচ ট্রাস্টের একটি ছেলেদের দলকে নিয়ে যান ইংল্যান্ডে। তার নিজের ভাষায়, ‘এটি আমার ক্রিকেট জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত।’
আগামী জুনে ২০২৬ নারী টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ উপলক্ষে এবার তিনি একটি মেয়েদের দল নিয়ে যাবেন ক্রিকেটের জন্মভূমি ইংল্যান্ডে। ইয়াসোর স্বপ্ন, এবার হয়তো তিনিও দলের সঙ্গে যাবেন, ‘আমি সবসময় লর্ডসে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছি। সুযোগ পেলে সেটা আমার জীবনের সবকিছু হয়ে উঠবে।’
কোচ জোথের চোখেও আনন্দ, আবেগ, ‘শুধু খেলাই নয়, সাংস্কৃতিক আদান–প্রদানও হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার মেয়েরা ইংল্যান্ডের সংস্কৃতি দেখবে, আবার নিজের সংস্কৃতিও ভাগাভাগি করবে। এটা হবে সবার জন্য অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।’ শেষে তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে কৃতজ্ঞতায়, ‘গ্যারি খায়েতলিতশায় এই অ্যাকাডেমি তৈরির মাধ্যমে আমাদের জন্য যা করেছেন, সেটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এটাই প্রমাণ করে যে তিনি টাউনশিপের তিক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা একজন কালো শিশুর স্বপ্নকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার।’
[দ্য গার্ডিয়ানের ফিচার থেকে ভাবানুবাদ: মুসাহো মুকুল]