গাজীপুর সাফারি পার্ক, এক সময়ের জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ স্থানটি এখন ক্রমশ তার আকর্ষণ হারাচ্ছে। অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও তদারকির অভাবে প্রাণীর সংখ্যা কমছে, দর্শনার্থীদের সমাগম কমছে এবং দালালদের হয়রানি বাড়ছে। স্থানীয়রা বলছেন, কর্র্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও প্রাণীদের প্রতি অবহেলার কারণেই পার্কটির বর্তমান বেহাল দশা।
ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা প্রাণীদের বিরল অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে চান, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনা নষ্ট আর প্রাণীরাও রুগ্ণ।
শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নে ইন্দ্রপুরে প্রায় ৪ হাজার একর জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠা এই পার্কে রয়েছে ছোট টিলা ও শালগাছের সারি। পার্কটি পাঁচটি অংশে বিভক্ত : স্কয়ার, কোর সাফারি পার্ক, বায়ো-ডাইভার্সিটি পার্ক, সাফারি কিংডম ও এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারি পার্ক। কোর সাফারি’র প্রধান আকর্ষণ, যেখানে বিশেষ বাসে চড়ে বাঘ, সিংহ, ভাল্লুকসহ আফ্রিকান প্রাণী দেখা যায়। কিন্তু চার কিলোমিটারের এই সড়কের তিন কিলোমিটার কাদা, জল ও খানাখন্দে ভরা, যা দর্শনার্থীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় পার্কে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। মূল ফটক, ম্যুরাল, প্রাণী জাদুঘর, পাখিশালা, পার্ক অফিস, খাদ্যের দোকান, বৈদ্যুতিক মোটর, সিসি ক্যামেরা, চেয়ার, টেবিল, রেস্ট হাউজের জানালা ও দুটি জিপ গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৩ মাস ৯ দিন পর পার্ক পুনরায় খুললেও অবস্থার উন্নতি হয়নি।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, পার্কে জেব্রা, ওয়াইল্ড বিস্ট, জলহস্তী, ময়ূর, অজগর, কুমির, হাতি, বাঘ, ভালুক, সিংহ, হরিণ, লামচিতা, শকুন, কচ্ছপ, রাজধনেশ, কাকধনেশ, ইগল, সাদা বক, রঙিলা বক, সারস, কাস্তেচরা, মথুরা, নিশিবক, কানিবক, বনগরু, গুইসাপ, শজারু, বাগডাশ, মার্বেল ক্যাট, গোল্ডেন ক্যাট, ফিশিং ক্যাট, খেকশিয়াল ও বনরুইসহ প্রায় শতাধিক প্রজাতির প্রাণী থাকার কথা থাকলেও তা নেই।
২০২১ সালে পার্কে তিনটি ক্যাঙারু মারা যাওয়ার পর থেকে ক্যাঙারুশূন্য হয়ে যায় কোর সাফারি। এ ছাড়া লেকগুলো এক সময় কালো ও সাদা রাজহাঁসে পরিপূর্ণ থাকলেও বর্তমানে একটিও নেই।
দর্শনার্থী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পার্কে অনেক কিছু পরিত্যক্ত। হরিণের বেষ্টনীতে খাবার নেই, ঘোড়া শুকিয়ে গেছে। প্রাণীদের স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা স্পষ্ট। বসার জায়গা বা ভালো পথ নেই। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও বনায়ন হলে দর্শনার্থী বাড়ত।’
আরেক দর্শনার্থী রমজান হোসেন বলেন, ‘প্রাণীগুলোর অবস্থা অগোছালো। একটি রোগা বাঘ দেখলাম। পাখির খাঁচা খালি। অজগর অবহেলায় পড়ে আছে। রঙিন মাছের পানি ঘোলা, কচুরিপানায় ভরা। প্রবেশে ৫০ টাকা, আবার প্রতি স্থানে টিকিট কাটতে হয়, কিন্তু প্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা মেলে না।’
পার্কের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চলছে। ইজারাদাররা সরকার পতনের পর পলাতক। গ্রুপে আসা দর্শনার্থীদের টিকিটের টাকা আত্মসাৎ হয়। দালালরা ৪০০ টাকায় ৯টি স্থান ঘুরিয়ে দেখানোর প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু খরচ হয় ৮০০ টাকা।’
পার্কের বাইরে ভাতের হোটেলের মালিক আবুল কালাম বলেন, ‘দর্শনার্থী কমে গেছে। শুক্রবার ছাড়া লোক আসে না। ব্যবসা মন্দা, দোকান বন্ধ রাখতে হয়। একবার আসা দর্শনার্থীরা ফিরে না এসে অন্যদের নিরুৎসাহিত করে।’
বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু সংস্কার করা হয়েছে। ইজারা প্রক্রিয়াধীন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পার্ক চলছে। প্রাণীদের প্রজনন ও পার্কের স্বকীয়তা ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।’
ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা শারমীন আক্তার বলেন, ‘রাস্তা সংস্কারের জন্য হিসাব চাওয়া হয়েছে। দ্রুত সংস্কার করা হবে।’