গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভায় সাড়ে ২৩ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্প দুই বছরেও চালু হয়নি। উল্টো বিদ্যুৎ বিল ও পাহারার খরচে প্রতি মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। পৌরশহরের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ১১টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সাবমার্সিবল পাম্প ঘর ও প্রায় ১৩৮ কিলোমিটার পাইপলাইন কোনো কাজে আসছে না। বিষয়টি নিয়ে পৌরবাসীর মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
শ্রীপুর পৌরশহরের ভাংনাহাটি ঈদগাহ মাঠের পাশে একটি পাম্প ঘরে বড় তালা ঝুলছে, তালায় জং ধরেছে। এমন ১১টি পাম্প ঘরে স্থাপিত পানির পাম্প দুই বছরেও চালু হয়নি। পৌরবাসীর ঘরে পানি পৌঁছানোর জন্য মাটির নিচে স্থাপিত পাইপলাইনও অকেজো। কিছু পাম্প ঘরে ফাটল দেখা দিয়েছে, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি হয়েছে, পাম্প ও পাইপলাইন নষ্ট হচ্ছে।
২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ‘৩২ শহর পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন’ প্রকল্পের আওতায় কাজ শুরু হয়। মেসার্স জিলানী ট্রেডার্স ও মেসার্স মনির ট্রেডার্স নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি সম্পন্ন করে। পাম্প স্থাপনে ৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা এবং পাইপলাইন স্থাপনে ১৫ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু জমি ক্রয় বা অধিগ্রহণের জন্য কোনো টাকা পরিশোধ করা হয়নি, ফলে জমির মালিকদের মাঝে ক্ষোভ রয়েছে। তারা পৌর কর্র্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন।
২০২৩ সালের এপ্রিল ও জুন মাসে পৌর কর্র্তৃপক্ষ নানা অসঙ্গতি সত্ত্বেও কাজ বুঝে নেয়। কিন্তু প্রকল্পটি কার্যকর হয়নি। প্রতি মাসে ১১টি পাম্প ঘরের বিদ্যুৎ বিল বাবদ ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং পাহারাদারদের বেতনে এক লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে। এ হিসাবে বছরে ১৭ থেকে ১৮ লাখ টাকা গুনতে হচ্ছে পৌরসভাকে। অথচ এক গ্লাস পানি সরবরাহ করতে পারছে না তারা।
লোহাগাছ এলাকার পাম্পঘরের জমির মালিক কাজী মাসুদ রানা বলেন, ‘জমি কেনার কথা বলা হলেও কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। এটি প্রতারণা।’
পাম্প নম্বর ২-এর তিনটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে, পাম্প নম্বর ১১-এ বিদ্যুৎ সংযোগই দেওয়া হয়নি। মাওনা গরুহাটির পাম্পের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও চুরি হয়েছে।
পৌরবাসীর অভিযোগ, এ প্রকল্প অপ্রয়োজনীয় এবং লুটপাটের মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, প্রকল্পটি কখনোই কার্যকর হবে না। ঠিকাদাররা যেনতেনভাবে কাজ শেষ করে বিল উত্তোলন করেছে।
পাইপলাইনের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পৌরসভার কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, ১৩৮ কিলোমিটার পাইপলাইনের অস্তিত্বই বাস্তবে নেই।
পাম্পগুলো ৩০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন, ঘণ্টায় ২ থেকে ৩ কিউসেক পানি তুলতে সক্ষম। তিনটি ট্রান্সফরমারে ১৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এসব পাম্প কখনো চালু হয়নি। পাহারাদার সানজিদ আহাম্মেদ বলেন, ‘বিদ্যুৎ সরঞ্জাম চুরি হয়েছে। ঘরে থাকার পরিবেশ নেই, তবু নিরাপত্তার জন্য থাকি।’
মেসার্স জিলানী ট্রেডার্সের মালিক মো. জিলানী বলেন, ‘আমরা গুণগত মান বজায় রেখে কাজ করেছি। পরীক্ষামূলকভাবে পানি উত্তোলন করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
তবে মেসার্স মনির ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নূরুজ্জামান বলেন, ‘পাম্প ও পাইপলাইনের কাজ আলাদা ঠিকাদার করায় সমন্বয়হীনতা ছিল। আমাদের প্রতিষ্ঠানের সাড়ে তিন কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
শ্রীপুর পৌরসভার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন বিভাগের প্রকৌশলী আবু হেনা মুস্তফা কামাল বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে কাজ বুঝে নেওয়া হয়েছে। পাহারাদারদের প্রতিদিন ৩৪০ টাকা সম্মানি দেওয়া হয়।’
উপজেলা জনস্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী তাসজিদ আহম্মেদ বলেন, ‘কাজ শেষ করে পৌর কর্র্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন তারাই খরচ বহন করছে। পাম্পগুলো সচল কি না, তা আমরা জানি না।’
শ্রীপুর পৌর প্রশাসক ও ইউএনও ব্যারিস্টার সজীব আহমেদ বলেন, ‘ব্যাপারটি আমাদের নজরে আছে। বড় ফান্ডিং প্রয়োজন। জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত কিছু বাড়িতে পানি সরবরাহের চেষ্টা করছি।’