সৌদি-পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর

সৌদি আরব ও পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান বুধবার গভীর রাতে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। কাতারে ইসরায়েলের হামলার ঠিক এক সপ্তাহ পর এই চুক্তির ফলে কয়েক দশকের পুরনো নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার হয়েছে।

কাতারে হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বে বেড়েছে নিরাপত্তা উদ্বেগ। এমনকি আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্যও বদলে গেছে।

কাতারে হামলার পর উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তার গ্যারান্টর হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে ক্রমশই ভরসা হারাচ্ছে। এমন সময়ে সৌদি-পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।

সৌদি আরব এখন পাকিস্তানের কাছ থেকে ‘নিউক্লিয়ার আম্ব্রেলা’ পাবে কিনা জানতে চাইলে এক জ্যেষ্ঠ সৌদি কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি একটি সর্বাত্মক প্রতিরক্ষা চুক্তি। এর মধ্যে সব ধরনের সামরিক উপায়কে অন্তর্ভুক্ত।’

পাকিস্তান বিশ্বের একমাত্র মুসলিম প্রধান পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনীও তাদের অধীনে রয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, এই সেনাবাহিনী মূলত প্রতিবেশী শত্রু ভারতকে প্রতিহত করার ওপর কেন্দ্রীভূত।

সৌদি কর্মকর্তা বলেন, এই চুক্তি বহু বছরের আলোচনার ফল। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; বরং দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য স্বাক্ষরিত।

গত ৯ সেপ্টেম্বর গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় বসা হামাসের রাজনৈতিক নেতাদের কাতারের দোহায় টার্গেট করে ইসরায়েলের বিমান হামলার চেষ্টা আরব দেশগুলোকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।

গাজা যুদ্ধের আগে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো—যারা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র—দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উদ্বেগ মেটাতে ইরান ও ইসরায়েল উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চেয়েছিল। গত এক বছরে কাতার দুইবার হামলার শিকার হয়েছে—একবার ইরানের, একবার ইসরায়েলের।

ইসরায়েল ব্যাপক পারমাণবিক অস্ত্রাগার রয়েছে বলে সর্বজনবিদিত, যদিও দেশটি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার বা অস্বীকার করে না।

অন্যদিকে, পাকিস্তান বরাবরই বলে আসছে যে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কেবল ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জন্যই, আর তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লাও মূলত ভারতের ভেতর পর্যন্ত।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এই চুক্তি অনুযায়ী যেকোনো এক দেশের বিরুদ্ধে কেউ আগ্রাসন চালালে তা উভয় দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করা হবে।’

পবিত্র ইসলামী স্থানসমূহের পূণ্যভূমি সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের কয়েক দশকের পুরনো জোট মূলত অভিন্ন ধর্মবিশ্বাস, কৌশলগত স্বার্থ ও অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।

সৌদি আরবে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার সৈন্য মোতায়েন করেছে পাকিস্তান। তারা সৌদি সেনাবাহিনীকে কার্যক্রম, প্রযুক্তিগত ও প্রশিক্ষণ সহায়তা দিয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে বিমান ও স্থল বাহিনীর সহযোগিতা।

এছাড়া, সৌদি আরব পাকিস্তানকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে, যা গত ডিসেম্বরেও নবায়ন করা হয়েছিল।

সৌদি আরবের এই পদক্ষেপটি আসে কয়েক মাস পর, যখন পাকিস্তান মে মাসে ভারতের সঙ্গে একটি স্বল্পমেয়াদি সামরিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বৃহস্পতিবার এক্স-এ পোস্টে জানান, ভারত এই ঘটনার বিষয়ে অবগত এবং নয়াদিল্লির নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য এর প্রভাবগুলো পর্যালোচনা করবে।

এক সৌদি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি, কারণ ভারতও একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও শক্তিশালী। আমরা এই সম্পর্ককে আরও বাড়িয়ে তুলব এবং আঞ্চলিক শান্তিতে যেভাবে পারি অবদান রাখব।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান ও ভারত তিনটি বড় যুদ্ধ করেছে। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পর তাদের সংঘাত অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। মূলত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকির কারণেই তারা সর্বাত্মক যুদ্ধ থেকে এখনো বিরত আছে।