শেখার শেষ নেই এ কথা শুনছি এবং বলছিও আমরা বহুদিন ধরে। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি দেখে মনে হতে পারে, শেখার মনে হয় শুরুও নেই। এত আন্দোলন, এত রক্তদান তারপরও কেন দুর্নীতি, দুঃশাসন বন্ধ করা যাচ্ছে না? সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ বের করা যাচ্ছে না? এমন প্রশ্ন তাড়া করছে বারবার। স্বাভাবিক পথে ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতা হস্তান্তর করেন না বা জনগণের দাবিতে কর্ণপাত করেন না। যে কারণে জনগণকে শুধু রাজপথে দাবি জানালেই চলে না, মাঝে মাঝে অভ্যুত্থানের মতো ঘটনায় আলোড়িত হয় সমাজ এবং দেশ। আরবের দেশগুলোর দীর্ঘদিনের চেপে থাকা শাসকদের সরাতে, আরব বসন্তের মতো আন্দোলনের ঢেউ উঠেছিল। শুরু হয়েছিল, তিউনিশিয়ায়। পরবর্তী সময়ে তা ছড়িয়ে পড়েছিল দেশে দেশে। কিন্তু এরপর যারা ক্ষমতায় এলেন, তারা জনগণের জীবন ও রক্তের ঋণ তো শোধ করলেনই না বরং পুরনো পথে দেশ পরিচালনা করে আরবের জনগণের ক্ষোভ ও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভ্যুত্থান হয়েছে শ্রীলঙ্কায়। কিন্তু সেখানে অভ্যুত্থানের পর বামপন্থিদের জোট নির্বাচিত হওয়ায় একদিকে দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। অন্যদিকে বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতকে। দুর্নীতি এবং টাকা পাচার নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। বিদেশি ঋণ পরিশোধে সফল হয়েছে এবং দেউলিয়া দশা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। একটা তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে। অভ্যুত্থানের পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে যিনি ছিলেন, তিনি বিদেশ সফরে ব্যক্তিগতভাবে বেশি খরচ করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশে গিয়ে ৮০ কোটি রুপি ব্যক্তিগতভাবে খরচ করায়, তার বিরুদ্ধে মামলা এবং জেলে পাঠানো হয়েছে তাকে। অর্থাৎ সুস্পষ্ট ঘোষণা দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং পদক্ষেপ গ্রহণ নিশ্চয়ই জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি করেছে।
এরপর অভ্যুত্থান হলো বাংলাদেশে। মানুষের ক্ষোভ প্রায় একই ধরনের। নিজের মতো করে ক্ষমতায় থাকার জন্য নির্বাচন, বিরোধী দল ও মতের ওপর দমন-পীড়ন, দেশ থেকে টাকা পাচার, দ্রব্যমূল্য ও বাজার সিন্ডিকেট আর জনমতকে উপেক্ষা করতে করতে মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। স্বাভাবিকভাবে নির্বাচন করে, এই দুঃশাসনের অবসান হবে না এটা জনমনে স্থায়ী ধারণা হয়ে গিয়েছিল। ফলে অভ্যুত্থান অনিবার্য হয়ে ওঠে। অভ্যুত্থানে সরকার পালিয়ে গেল শ্রীলঙ্কার মতোই। এরপর এক বছর পার হয়ে গেল। মানুষ ভাবছে, আওয়ামী লীগ সরকার গেল। কিন্তু দেশ পরিচালনার যে ব্যবস্থা রেখে গেল, তা তো পাল্টানোর কোনো লক্ষণ নেই। এর ফলে প্রশ্ন উঠছে, শুধু কি শাসকদের চেহারা পরিবর্তনের জন্য এত আন্দোলন করা হয়েছিল? বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের এক বছর পর নেপালেও সংঘটিত হলো গণঅভ্যুত্থান। পালিয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানেও অভ্যুত্থানের মূল কারণ ছিল নেপালে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো এবং বিনিয়োগের ঘাটতি যা অর্থনীতিকে স্থবির করে তুলেছিল। যে কারণে বেড়ে গিয়েছিল বেকারত্ব। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট বেকারত্বের হার ছিল ১১ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০২২-২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১২.৬ শতাংশে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২০২৪ সালে ছিল ২০ দশমিক ৮২ শতাংশ। এটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। দেশে কাজ নেই, ফলে তরুণরা ছুটছে বিদেশে। প্রায় ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন নেপালি বিদেশে কর্মরত, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তরুণ জনগোষ্ঠী।
নেপালের তরুণরা আন্দোলনের ইতিহাস তৈরি করেছে বারবার। ২০০৮ সালে নেপাল তার শতাব্দীপ্রাচীন রাজতন্ত্র বিলোপ করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে। সেই ঐতিহাসিক পরিবর্তন জনগণের মনে জাগিয়ে তুলেছিল সাম্য এবং উন্নত জীবনের স্বপ্ন। দেশে কর্মসংস্থান, মানসম্পন্ন সরকারি সেবা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন পাবে বলেই মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। রাজতন্ত্র নয়, মানুষ বিশ্বাস করেছিল, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দারিদ্র্য দূর হবে, আঞ্চলিক বৈষম্য দূর হবে, নেপাল হয়ে উঠবে সমৃদ্ধ দেশ। কিন্তু গত দুই দশকে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতির বিস্তার তরুণদের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অথচ ২০০৭ সালে নেপাল একটি অন্তর্বর্তী সংবিধান গ্রহণ করে ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছিল। ২০০৮ সালে কেন্দ্রীয়, প্রাদেশিক ও স্থানীয় স্তরে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের সংবিধানে নারী, দলিত ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়, যা বিশ্বের অন্যতম প্রগতিশীল সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত। সংবিধান সামাজিক ন্যায়বিচার, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অসমতা দূরীকরণের প্রতিশ্রুতি বহন করেছিল। এই প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও জনজীবনে তার প্রভাব না থাকা, দুর্নীতি আড়াল করা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্লাটফর্ম ইকোনমি যে ভূমিকা পালন করে, তা বন্ধ করা তরুণদের মরিয়া প্রতিরোধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু একটি বিষয় লক্ষণীয় তা হলো, অভ্যুত্থানের পর যে অরাজকতা তৈরি হয়েছিল, জ্বালাও, পোড়াও, লুটপাট শুরু হয়েছিল তা দ্রুততম সময়ে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। লুটপাটকারীদের তারা বিচারের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছে। অভ্যুত্থান পরবর্তী তিন সদস্যের সরকার সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে যে, মার্চের মধ্যেই নির্বাচন হবে এবং নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করবে। তাহলে দেখা গেল তিউনিশিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং নেপাল তিন ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ এখান থেকে কী শিক্ষা নেবে? এক্ষেত্রে দুটো বিষয় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। যেখানে সরকারের ভূমিকা পালনের বিষয়টি জনগণ দেখতে চাইবে। দেশে এত অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, শ্রমিকদের কাজ হারানো, মজুরি না পাওয়া, কৃষকদের ফসলের দাম না পাওয়া, দারিদ্র্যসীমার নিচে ২৬ শতাংশ মানুষের নেমে যাওয়া আর সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া মধ্যবিত্তের দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে বন্যার পানির গতিতে। গত তিন মাসে ৬ হাজার নতুন কোটিপতির জন্ম হয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ মাসের শেষে মোট আমানত ছিল ১৯ লাখ ২৩ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা দাঁড়িয়েছে, ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকায়। তিন মাসে আমানত বেড়েছে, প্রায় ৭৩ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। এই সময়ের মধ্যে দেশে ব্যাংক হিসাবের মোট সংখ্যা ১৬ কোটি ৫৭ লাখ ৬৮ হাজার ৮২১টি থেকে বেড়ে হয়েছে ১৬ কোটি ৯০ লাখ ২ হাজার ৬৭১টি। অর্থাৎ, নতুনভাবে প্রায় ৩২ লাখ ৯৫ হাজার ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। সবার হিসাবে টাকা বাড়েনি। কোটি টাকার বেশি জমা থাকা হিসাবগুলোতে, জমার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মার্চ শেষে এসব হিসাবে মোট জমা ছিল, ৭ লাখ ৮৩ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা। যা জুন শেষে দাঁড়িয়েছে, ৮ লাখ ৮০ হাজার ৭৭২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ তিন মাসে কোটিপতির হিসাবগুলোতে জমা বেড়েছে প্রায় ৯৭ হাজার ১১৯ কোটি টাকা।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে মাত্র ৫টি কোটি টাকার হিসাব ছিল। ১৯৭৫ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭টিতে, ১৯৮০ সালে হয় ৯৮টি। এরপর দেশের বয়স বেড়েছে আর কোটিপতিও বেড়েছে। ১৯৯০ সালে ৯৪৩টি কোটি টাকার হিসাব ছিল। ২০০১ সালে ৫ হাজার ১৬২টি এবং ২০০৮ সালে বেড়ে হয় ১৯ হাজার ১৬৩টি। ২০২০ সালের শেষে কোটিপতির হিসাব দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৮৯০টিতে। এরপর ২০২১ সালে তা বেড়ে হয় ১ লাখ ৯ হাজার ৭৬, ২০২২ সালে ১ লাখ ৯ হাজার ৯৪৬ এবং ২০২৩ সালে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮। ২০২৪ সালের শেষে হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৮১টি, যা ২০২৫ সালের মার্চে দাঁড়ায় ১ লাখ ২১ হাজার ৩৬২টিতে এবং জুনে এসে পৌঁছায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৩৩৬। দুর্নীতির টাকা সব ব্যাংকে রাখা হয় না। সেই টাকা হিসাব করলে, এই সংখ্যা আরও অনেক বেড়ে যাবে। এই টাকাওয়ালারা এরপর চাইবে ক্ষমতা এবং ক্ষমতাই আরও বাড়িয়ে দেবে টাকার পরিমাণ। অর্থাৎ ১৮ কোটি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে, দেড় লাখ কোটিপতি। এতো গেল টাকার হিসাব। সাধারণ জনগণের জন্য আরেকটি বিষয় উদ্বেগজনক হিসেবে দেখা দিয়েছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে টি-ব্যাগে থাকা বিপজ্জনক ভারী ধাতুর মাত্রা নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি। চা প্রিয় মানুষের দেশে এটি ভয়ানক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। জরিপে দেখা যায়, ৫৫ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন ২-৩ কাপ এবং ২৭ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন ৪ বা তারও বেশি কাপ চা পান করেন।
সহজে চা বানানোর জন্য টি-ব্যাগ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু এটা নিরাপদ কি? দেখা যাচ্ছে, টি-ব্যাগের প্যাকেজিংয়ে ক্রোমিয়াম সর্বোচ্চ ১,৬৯০ পিপিএম (নিরাপদ সীমা ৫ পিপিএম), সিসা ৫১ পিপিএম পর্যন্ত (সীমা ৫ পিপিএম), পারদ ১০৮ পিপিএম পর্যন্ত (সীমা ০.৩ পিপিএম), এবং আর্সেনিক ১৪ পিপিএম (সীমা ২ পিপিএম) পাওয়া গেছে। এখানেই শেষ নয়, গবেষণায় টি-ব্যাগ থেকে চা পাতা আলাদা করার পর ভারী ধাতু অ্যান্টিমনি (সর্বোচ্চ ১৫৪ পিপিএম) পাওয়া গেছে। পাশাপাশি নগণ্য পরিমাণে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম শনাক্ত হয়েছে। চায়ে আছে মানবদেহের জন্য উপকারী পুষ্টি উপাদান। চা পাতায় আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, কপার, জিঙ্ক এবং কোবাল্টের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানও পাওয়া গেছে, যা সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। তা সত্ত্বেও টি-ব্যাগে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়মিত চা পানকারীদের জন্য ‘গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি’ তৈরি করছে। এটি ভোক্তা অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের তোয়াক্কা না করে, মুনাফা বৃদ্ধির এই প্রবণতা রোধ করার পদক্ষেপ কে নেবে? অভ্যুত্থানে দাবি উঠেছিল, বৈষম্য থেকে মুক্তির। পুঁজিবাদ বৈষম্য দূর করবে না, এটা জানা কথা। কিন্তু জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রবর্তন করে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈষম্য কমাতে ভূমিকা রাখবে এই প্রত্যাশাটুকু ছিল। বৈষম্য কমানো ও দুর্নীতি, ভেজাল রোধ করার পদক্ষেপ সরকার নিতে পারবে না এটা জনগণ মানতে চাইবে না কিছুতেই। ফলে প্রশ্ন তুলবে, সরকার কি শিখবে না কিছু?
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক
rratan.spb@gmail.com