এলডিসি থেকে উত্তরণে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ

এলডিসি থেকে উত্তরণে সরকার ও ব্যবসায়ী সংগঠনের মধ্যে বেশ টানাপড়েন লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকার বলছে, আমরা এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছাব না অর্থাৎ ২০২৬ সালের যথাসময়ে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ হবে। বিপরীতে সংগঠনগুলো বলছে, এলডিসি থেকে উত্তরণে প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে। সুতরাং এলডিসি থেকে উত্তরণ হবে, বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এখন প্রশ্ন হলো, এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য কতটা যৌক্তিক?

১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠার পর, গত পাঁচ দশকে সব মিলিয়ে আটটি দেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ হয়েছে। সেই দেশগুলো থেকে একটু অভিজ্ঞতা নেওয়া যেতে পারে। এলডিসি থেকে উত্তরণে, অনেক দেশই নানা ধরনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছে এবং শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে। ঝুঁকি বলতে বোঝানো হয় বাণিজ্য নির্ভরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্যের উচ্চহার, অবকাঠামোগত দুর্বলতা অথবা বহিঃনির্ভরশীল অর্থনীতি। তবু সঠিক পরিকল্পনা ও সংস্কারের মাধ্যমে কিছু দেশ সফলভাবে উত্তরণ ঘটাতে পেরেছে। ফলে বাংলাদেশ যে পারবে না, এমনটা ভাবা সমীচীন নয়। ভুটান ভৌগোলিকভাবে পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকা, অবকাঠামোগতভাবে দুর্বল এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ একটি রাষ্ট্র। তবু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ ও বিদ্যুৎ (হাইড্রোপাওয়ার) খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন করেছে। লাওস একটি স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র হওয়ার কারণে, বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল। দারিদ্র্যের হার ছিল বেশ উঁচু। তবু আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা উত্তরণের পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশ দুটি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যদি তুলনা করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকবে। কারণ বাংলাদেশ স্থলবেষ্টিত দেশও নয় আবার পাহাড়ি দুর্গম এলাকাও নয়। সুতরাং এসব রাষ্ট্র পারলে, বাংলাদেশ কেন পারবে না? গত ১৩ সেপ্টেম্বর, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘এলডিসি থেকে উত্তরণ ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন এলডিসি উত্তরণ নিয়ে সরকার আগের অবস্থানে আছে। নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। আবার এটাও মনে রাখতে হবে, বিতর্কও অনেক সময় ছিনতাই হয়ে যায়। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ  পেছানোর আবেদন, অন্তর্বর্তী সরকার করবে না। নির্বাচিত সরকার চাইলে, এ আবেদন করতে পারে। তিনি যুক্তি দাঁড় করান নেপাল ও লাওস যদি আবেদন করে, বাংলাদেশও করতে পারে। তাদের কথা অত্যন্ত যুক্তিশীল এবং সরকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট করেছে যে সরকার আর এলডিসি থেকে উত্তরণে পেছাতে চায় না। তাদের কথা যতটা স্পষ্ট, অনুরূপভাবে বলা যায় এলডিসি থেকে উত্তরণের দিকনির্দেশনার মূল বক্তব্য ততটা অস্পষ্ট। তারা যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছেন, কিন্তু একটু আবেগি হয়েছে বলে মনে হয়। সরকারি উচ্চপর্যায় থেকে আবেগি হওয়ার সুযোগ নেই। তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে এবং সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। ছোটরা বরাবরই বড়দের কাছে আবেদন করবে। বড়দের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। বাস্তবতা হলো এটাই, যে আটটি রাষ্ট্র এলডিসি থেকে উত্তরণ হয়েছে তারা তিনটি শর্তের মধ্যে দুটি শর্ত পূরণ করে হয়েছে। বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যেখানে তিনটি শর্তই সম্পূর্ণরূপে পরিপালিত হয়েছে। সুতরাং উত্তরণ পেছানো এতটা সহজ হবে না। যদি পেছানো সম্ভব না হয় তার মানে আপনাকে উত্তরণের আগে ও পরে কিছু কর্মসূচি বা কর্মপন্থা হাতে নিতে হবে এবং সেই কর্মসূচি সবার মধ্যে স্পষ্ট করে দিতে হবে।

রপ্তানি বাণিজ্যের বিভিন্ন সংগঠন, বিভিন্নভাবে দাবি  করছে এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন রকম সভা-সেমিনার করছে। তারা বুঝাতে চাচ্ছে যে, এলডিসি থেকে উত্তরণের যথেষ্ট প্রস্তুতি নেই। তাই এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য আরও তিন বছর সময় প্রয়োজন। এ কথা সত্য যে, সুবিধা পেতে কে না চায়? সুবিধা নিতে পারলে, সেটা অবশ্যই রাষ্ট্রের জন্যই ভালো। কিন্তু সেই সুবিধা নেওয়ার জন্য যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত থাকতে হবে। তবে আপনি সঠিক যুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে আপনার সুবিধাটি অর্জন করতে পারবেন। একটু  পেছনে গেলে দেখা যায় এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য সর্বপ্রথম নির্বাচিত হয় ২০১৮ সালে। কারণ ওই বছরই বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য তিনটি শর্তই পূরণ করে। তিন বছর পর ২০২১ সালে পুনরায় বাংলাদেশের মানদ- নিয়ে পূর্ণ মূল্যায়ন হয় সেখানেও বাংলাদেশ তিনটি শর্ত ভালোভাবে পূরণ করে এবং ওই বছরই চূড়ান্ত সুপারিশ পায় যে ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাবে বাংলাদেশ। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে দুবছর সময় পিছিয়ে দিয়ে ২০২৬ সাল নির্ধারণ করা হয়। যদি ২০১৮ সালকে ভিত্তি বছর ধরা হয়, তাহলে আট বছর সময় পেল বাংলাদেশ। আবার ২০২১ সালকে ভিত্তি বছর ধরলেও, বাংলাদেশ পাঁচ বছর সময় পেয়েছে। অতএব সময়টি কি যথেষ্ট না? সুতরাং, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য কিছুটা হলেও সময় পাচ্ছে। এটিকে আশীর্বাদ হিসেবে ধরে নিয়ে চেষ্টা করতে হবে সময় পেছানোর জন্য। যদি সময় পাওয়া যায়, সেটা আমাদের জন্য সৌভাগ্যের। প্রয়োজনে রপ্তানিকারকদের সঙ্গে নিয়ে কোনো উপায় খুঁজে পাওয়া যায় কি না, সে বিষয়টি দেখা দরকার। তখন রপ্তানিকারকরাও বুঝবেন, সরকার আমাদের প্রতি আন্তরিক। সময় পেছাতে না পারলেও, তাদের আফসোস থাকবে না। সরকারকে আরেকটু দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন এ বিষয়ে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ পরিবেশ, সমুদ্র বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশের অভ্যন্তরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোকে আধুনিকায়ন, দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবিচ্ছিন্ন সংযোগ স্থাপন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয় রপ্তানিকারক এবং ব্যবসায়ীদের শতভাগ নিশ্চয়তা প্রদান করা। এর ফলে সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য স্থাপিত হবে।

লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট

aktarrofikul@gmail.com