মাত্র ৪–৫ লাখ টাকার একটি পানির পাম্প না থাকার কারণে প্রায় দুই যুগ ধরে বন্ধ নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার। অথচ এ সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনে খরচ হয়েছে প্রায় তিন কোটি টাকা। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জেলার হাজারো মৎস্য চাষী।
নেত্রকোনার দুর্গাপুরের মাছ চাষী এনায়েত উল্লাহ। ভোরে ময়মনসিংহ থেকে কিনে আনলেন রুই, কাতলাসহ বিভিন্ন মাছের পোনা। কারণ, নিজ উপজেলা দুর্গাপুরের সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন কেন্দ্রটি প্রায় দুই দশক ধরে বন্ধ। ফলে তার সময়, খরচ আর পরিশ্রম বেড়েছে কয়েকগুণ।
১২ কেজি মাছের পোনা আনতে আনতে পথে ধকল সইতে না পেরে দুই কেজির বেশি পোনা মারা গেছে বলে জানান তিনি।
এনায়েতের মতো দুর্গাপুর উপজেলায় প্রায় চার হাজার মাছ চাষীর গল্প অনেকটাই এমন। তাদেরকেও পোনা আনতে হয় বাইরে থেকে। সরকারি দরে কেজিপ্রতি ২৫০ টাকার পোনা কিনতে গেলে বেসরকারি বাজারে গুনতে হয় ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। পরিবহন খরচ আরও প্রায় এক হাজার টাকা। সঙ্গে পোনা মারা যাওয়ার ঝুঁকি তো রয়েছেই। তবে মৎস্য চাষের কথা চিন্তা করে স্বাধীনতার আগেই সরকারি একটি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার প্রতিষ্ঠা করা হলেও তার অবস্থান কি?
জেলার সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর উপজেলায় ষাটের দশকে চালু হয় মাছের পোনা উৎপাদন খামার। পরবর্তীতে আশির দশকে পাহাড়ি সোমেশ্বরী, কংশসহ মোট পাঁচটি পাহাড়ি নদীর দেশীয় মাছের নমুনা সংগ্রহ করে তা থেকে মৎস্য বীজ উৎপাদনের জন্য পাঁচটি হ্যাচারিতে রেণু উৎপাদন শুরু হয়। ১৯৮০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ভালো চললেন বিপত্তি বাঁধে ২০০২ সালের শুরু থেকে।
পানি না পাওয়া ও পরবর্তীতে পাম্প নষ্ট দেখিয়ে ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে সকল কার্যক্রম। এর মধ্যে ২০০৫ সালে একটি উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা মাঝপথে আটকে যায়। ফলে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে খামারটিতে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এই সময় ঝড় বৃষ্টি আর নানা সংকটে ভেঙেছে ঘর আর পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে সকল যন্ত্রাংশ। শুধু একটি পানির পাম্পের কারণেই খামারের আজ বেহাল দশা।
একটি পানির দাম কত হতে পারে তার উত্তর খুঁজতে খামারের আশপাশেই খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, দশাল গ্রামের মোহাম্মদ নুরুল হুদা ধানি জমিতে সেচের ব্যবস্থা করতে গত পাঁচ বছর আগে বৈদ্যুতিক পাঁচ ঘোড়া সাবমারসিবল পাম্প স্থাপন করেন। ১১০ ফুট গভীরে পাম্প বসাতে তার খরচ হয়েছে প্রায় তিন লাখ টাকা। এই পাম্পে এলাকার ২০০ কাঠা জমির সেচের চাহিদা পূরণ করছেন। একই পাম্প ব্যবহার হচ্ছে বিভিন্ন মাছের খামারে। ৪ থেকে ৫শ ফুট গভীরে পাম্প বসাতে খরচ প্রায় সাড়ে চার লাখ সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা হতে পারে বলে জানেন তিনি।
অর্থাৎ পাঁচ লাখ টাকার একটি পাম্প এর জন্য ২৫ বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে সরকারের সম্ভাবনাময় এই খামার। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মাছের হাউজে বিস্তার করছে মশার বংশ। জমে থাকা পচা পানিতে কেঁচোসহ ক্ষতিকারক পোকামাকড়। হ্যাচারি ঘর ভেঙেছে আরো অনেক আগেই এখন কোন রকমে জানান দিচ্ছে অস্তিত্বের। আর খাবারের পাঁচটি পুকুরের খনন হয়নি দীর্ঘদিনেও। এরপরেও বাহিরের রেণু পোনা কিছুদিন লালন পালন করে তাই বিক্রি করে খামার কর্মকর্তারা তাদের দায় সারছেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায় কর্মকর্তারা কাগজে পত্রে খামারটি চালু রেখেছে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খামারটিতে আয় দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার যাতে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার। বিগত দশ বছরে এমন হিসাব খতিয়ে দেখা যায় আয় এবং ব্যয় অনেকটাই পাশাপাশি।
অথচ খামারের একজন ব্যবস্থাপক সহ মোট চারজন কর্মকর্তা বেতন, বৈদ্যুতিক বিল আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে সরকারের প্রতিবছর ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১১ লাখ টাকা বেশি। এ হিসাবে বিগত ২৫ বছরে এ খামারের কর্মকর্তা কর্মচারীরা বসে থেকেই বেতন পেয়েছে তাই তিন কোটি টাকা!
সরকারি খামার নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের শেষ নেই। স্থানীয় বাসিন্দা কমল মিয়া জানান, মাছের যে সরকারি খামার রয়েছে তা থেকে আমরা কোন ধরনের সহযোগিতা পাই না। তারা একটি টার্গেট নিয়ে ওপেন অর্ডারের মাধ্যমে দায় সারে। অনেক সময় বাহির থেকে কিনে আনা মাছ কিছুদিন রেখে তা পুনরায় বাজারের বিক্রি করে দেয়। এখান থেকে কৃষকরা তেমন কোন পোনাও পায় না বা সহযোগিতা পায় না। আর তাছাড়া একটি পানির পাম্পের দাম কত টাকা আর হতে পারে? একটি পাম্পের জন্য যে এতদিন খামারটি বন্ধ রেখেছে এর দায়ভার কে নিবে?
দুর্গাপুর মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে খামার ব্যবস্থাপক হিসেবে রয়েছেন গোপাল চন্দ্র দাস। বারবার ঘুরে ফিরে এখানে এসেছেন তিনি। কোন মায়ায় এখানে এতদিন ধরে রয়েছেন তার উত্তর জানতে না পারলেও খামারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘ ১৭ মিনিট সাক্ষাৎকার দেন তিনি। বর্তমান অবস্থা এবং সংকটের একমাত্র কারণ পানির পাম্পের অভাব বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, খামারে পাম্প স্থাপনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সামনে একটি প্রকল্প রয়েছে এই প্রকল্পের আওতায় হয়তো খামারে নতুন পাম্প বসানো যেতে পারে। তবে অবহেলা আর নিয়মিত অফিস না করার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।
এদিকে সকল অভিযোগের খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এ এস এম রাসেল জানান, আমরা শুনেছি দীর্ঘদিন ধরে খামারটি অবহেলিত হয়ে পড়ে রয়েছে। আমরা নতুন করে খামারটিকে কিভাবে সফল করা যায় এবং পুনরায় উৎপাদনে ফেলা যায় সেজন্য কার্যক্রম শুরু করেছি। আশা করি খুব দ্রুতই পানির পাম্প বসানোসহ প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যেই অভিযোগ এসেছে সেই বিষয়গুলো আমরা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনের ব্যবস্থা গ্রহণ করব।