অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশ্যে আজ রবিবার রাতে ঢাকা ত্যাগ করছেন। সফরসঙ্গী হিসেবে নিচ্ছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চার শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিককে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও সংস্কারের জন্য জুলাই জাতীয় সনদ কার্যকর করার বিষয়ে বেশ মতপার্থক্য রয়েছে, এমন তিন প্রধান দলের নেতাদের প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী করাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ কথা চালাচালি হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আগামী জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সে প্রেক্ষাপটে রাজনীতিবিদদের সঙ্গে নিয়ে এই আন্তর্জাতিক সফরকে সরকারের রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।’
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে থাকছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের এবং এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন।
প্রেস সচিব বলেন, জাতিসংঘে এবারের অধিবেশনের পাশে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদেরও রাখা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি অংশের সঙ্গেও প্রধান উপদেষ্টা বৈঠক করবেন।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে একটি সমঝোতার চেষ্টা করা হতে পারে।
রাজনীতিকদের প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী করার বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন গত বুধবার এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘ভবিষ্যতে রাজনীতিবিদরাই দেশ পরিচালনা করবেন, তাই তাদের এই প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমরা একটি রূপান্তর পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছি। ফলে রাজনীতিবিদদের সম্পৃক্ত করা জরুরি।’
তবে বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা এ সফরের সঙ্গে দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো সংযোগের দিকটি অস্বীকার করেছেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের সঙ্গে রয়েছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বার্তা আন্তর্জাতিক মহলে দিতেই এই সফর।’
আর জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. তাহের বলেন, ‘জাতিসংঘ অধিবেশনের পাশাপাশি কয়েকটি সেশনে আমাদের অংশগ্রহণ আছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে একটি সভা রয়েছে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন সূত্র বলছে, জুলাই সনদ আইনি ভিত্তি দিয়ে বাস্তবায়ন, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (পিআর) মাধ্যমে আইনসভার সদস্য নির্বাচনের উপায় নিয়ে দলগুলোর মধ্যে থাকা মতভেদ দূর করা ও আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য রূপরেখা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সফরের সময় আলোচনায় আসতে পারে।
দল তিনটির নেতাদের সঙ্গে দূরের দেশ আমেরিকায় এই যাত্রায় ইউনূসের কথাবার্তা থেকে কী ফল আসতে পারে, সে বিষয়ে অবশ্য রাজনীতিকদের বড় একটি অংশের মধ্যে মতভিন্নতা আছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি সরকারের আমলে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে করে বিদেশ সফরের রেকর্ড রয়েছে। (তবে) এই সফর নিয়ে যে সমঝোতার কথা বলা হচ্ছে, তা সঠিক নয়।’
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমেরিকায় গিয়ে সমঝোতা হবে এমন সম্ভাবনা কম। ড. ইউনূসের আলোচনার অতীতে ভালো কোনো রেকর্ড নেই।’
আর জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আমরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠবে।’
পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপি, জামায়াতসহ সাতটি রাজনৈতিক দল এবং এনসিপির মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও ঐকমত্য কমিশনে এ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র সফরে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সম্ভাব্য অনানুষ্ঠানিক আলোচনার প্রভাব আগামী নির্বাচনে পড়তে পারে, এমনটা মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তবে বিএনপি ও দলটির জোটসঙ্গীদের কয়েকজন নেতা মনে করেন, এবার যুক্তরাষ্ট্র সফরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে বেশ বিক্ষোভ হতে পারে। এ বিষয়টিও নেতাদের সঙ্গে রাখার কারণ হতে পারে।