বিটিসিএল এসটিএন প্রকল্প

কারচুপিতে বাতিল না করে উল্টো কাজ পাচ্ছে জিনিউ 

গ্রাহকের সেবার মানবৃদ্ধি রাজস্ব আয়সহ কলড্রপ হ্রাসের লক্ষ্যে ডিজিটাল কানেক্টিভিটি শক্তিশালীকরণে সুইচিং ও ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এসটিএন) প্রকল্প হাতে নিয়েছে বিটিসিএল। তবে প্রকল্প পরিচালকের স্বেচ্ছাচারিতায় অযাচিত হস্পক্ষেপে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে প্রকল্পটি। অখ্যাত ও জাল অভিজ্ঞতা সনদ প্রদান করা প্রতিষ্ঠান জিনিউকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প পরিচালক তৌফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

নানা অনিয়মের কারণে দ্বিতীয় দফায় পুণরায় দরপত্র আহ্বান করলে স্বয়ং প্রকল্প পরিচালক নিজ উদ্যোগে গত ১৩ আগস্ট কারিগরী বিনির্দেশ কমিটির আহ্বায়কের কাছে চিঠি দিয়ে আইসিএক্সের নূন্যতম ক্যাপাসিটি ৫০ হাজার এসাইপি ট্রাঙ্ক কমিয়ে ৩২ হাজার ৫০০ এসাইপি ট্রাঙ্ক করার সুপারিশ করে যা দরপত্র চলাকালীন সুনির্দিষ্ট অনৈতিক হস্পক্ষেপ। পাশাপাশি অখ্যাত কোম্পানি জিনিউয়ের স্বার্থের কথাও সেখানে উল্লেখ করেন। তার এই স্বেচ্ছাচারী আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ করেছে খোদ বিটিসিএলকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাল অভিজ্ঞতা সনদ বা কোনো কারচুপি উঠলে অভিযোগ দেওয়া যেতে পারে। অভিযোগ দিলে আমরা সেই অনুপাতে ব্যবস্থা নেব। এখানে দরপত্র পায়িয়ে দেওয়ার কোনো কিছু নেই। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।’

জানা গেছে, গত ২১ এপ্রিল এই দরপত্রে অংশ নেয় হুয়াওয়ে ও জিনিউ। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি সদস্য সচিব হিসেবে প্রকল্প পরিচালক নিজেই সব কারিগরি প্রস্তাব ও তথ্য যাচাই-বাছাই করেন করে মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেন। সেই প্রতিবেদন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বিটিসিএলের পরিচালনা পরিষদ সভায় উপস্থিত করা হলে উক্ত পরিষদ সন্দেহ করে। তখন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের তৎকালীন যুগ্মসচিব (পরিচালনা পরিষদের সদস্য) শেখ সালেহ আহমেদকে আহবায়ক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি অধিকতর যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করে।

মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও প্রস্তাবিত দরপত্র যাচাই করে গুরুতর অসঙ্গতির প্রমাণ পায় কমিটি। জিনিউ থেকে প্রদান করা প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা সনদটিও জাল হিসেবে প্রমাণ হয়। এই ধরণের অপরাধের শাস্তি স্বরূপ পিপিএর ৬৪ অনুযায়ী ও পিপিআরের ১২৭ অনুচ্ছেদের ৪ অনুযায়ী, এ রকম দরদাতার প্রস্তাব সরাসরি বাতিল ও দরদাতার বিরুদ্ধে আইনগত শাস্তির বিধান রয়েছে।

শুধু তাই নয়, প্রকল্পের দরপত্র অনুযায়ী ৫০ হাজার এসআইপি ট্রাঙ্ক-এর সক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্রপাতি সরবরাহের দাবি করে জিনিউ দরপত্র জমা দিলেও সেগুলোর সক্ষমতা প্রমাণে ব্যর্থ হয় তারা। যা সরাসরি ম্যাটেরিয়াল ডিভিশন ও দরপত্র বাতিলের জন্য যথেষ্ট।

তিন সদস্য বিশিষ্ট যাচাই-বাছাই কমিটি ক্রয় সংক্রান্ত কাজের দরপ্রস্তাব বাতিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করার এবং প্রতারক প্রতিষ্ঠান জিনিউয়ের বিরুদ্ধে পিপিএ এবং পিপিআর অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে। প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে দরপত্রটি বাতিল করে পুনরায় দরপত্র আহবানের নির্দেশ করা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ জুলাই প্রকল্প পরিচালক দরপত্রটি পুণরায় আহবান করে।

আর জিনিউ-এর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরে থাক, বরং কারিগরি বিনির্দেশ কমিটির আহ্বায়ক বরাবর প্রকল্প পরিচালক নিজ উদ্যোগে আইসিএক্সের ন্যূনতম ক্যাপাসিটি ৫০ হাজার এসআইপি ট্রাঙ্ককে কমিয়ে ৩২ হাজার ৫০০ করার সুপারিশ করেন যাতে জিনিউ এবার কোনও ঝামেলা ছাড়া কাজ পেয়ে যায়। তার প্রেক্ষিতে, প্রকল্প পরিচালক ১৪ আগস্টে এই সংক্রান্ত সংশোধনী প্রকাশ করে।

নতুন দরপত্রটি ২৮ আগস্টে জমা নেওয়া হয়। তারপর প্রকল্প পরিচালক তড়িঘড়ি করে মূল্যায়ন কমিটিকে প্রভাবিত করে তথ্য গোপণের আশ্রয় নিয়ে জিনিউয়ের অনুকূলে আবারও প্রতিবেদন দাখিল করে।

গত ১১ সেপ্টেম্বর পরিচালনা পরিষদের সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব করা হয়। পরিচালনা পরিষদ আবারও সন্দেহ প্রকাশ করায় দ্বিতীয় দফায় তিন সদস্য বিশিষ্ট যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করে যার আহ্বায়ক করা হয় মিজানুর রহমানকে।

কমিটির এই পর্যন্ত অনুসন্ধান সম্পর্কে মিজানুর রহমানকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি কোন মন্তব্য করেননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্প পরিচালক গতবারের যাচাই-বাছাই কমিটির প্রতিবেদনটি নথিপত্র থেকে গায়েব করে ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে আইসিএক্সের ক্যাপাসিটি এই এক তৃতীয়াংশ কমিয়ে ফেললে তা বর্তমান চাহিদা মেটাতে পারবে না।

এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়। প্রথম দরপত্রে চাওয়া হয়েছিল ৫০ হাজার সিপিই ট্রাঙ্ক। আর দ্বিতীয়টায় চাওয়া হয় ৩২ হাজার ৫০০ সিপিই ট্রাঙ্ক। দ্বিতীয়বার কম সক্ষমতার প্রযুক্তির কারণে এর দাম কম হবার কথা। অথচ প্রথমবারের চেয়ে দ্বিতীয়বার ইকুপমেন্ট বাবদ ৬১ লাখ টাকা বেশি প্রস্তাব করে জিনিউ। এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠছে, কম সক্ষমতার পণ্য চাওয়ার পরও জিনিউ কেন টাকা বৃদ্ধি করল?

প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ

বিটিসিএল’র এসটিএন প্রকল্প ‘কারচুপিতে বাতিল না করে উল্টো কাজ পাচ্ছে জিনিউ’ শিরোনামের এই সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে অভিযুক্ত কোম্পানি জিনিউ টেকনোলজিস কোম্পানি লিমিটেড।

জিনিউ-এর প্রতিবাদে বলা হয়েছে,  এই সংবাদটি ‘আমাদের উপর আক্রমণ এবং নোংরা জালে ভরা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২১ সালে বাংলাদেশে জিনিউ কাজ শুরু করেছে এবং এই পর্যন্ত তিনটি প্রকল্পে কাজ করার বিষয় তারা উল্লেখ করেছে। 

প্রতিবাদলিপিতে আরও দাবি করেন, তারা সম্পূর্ণভাবে বিটিসিএল আইসিএক্স টেন্ডারের সব শর্ত পূরণ করেছে। যদিও টেন্ডার ডকুমেন্টে প্রযুক্তিগত আইটেম পরিবর্তন, প্যারামিটার পরিবর্তন, হার্ডওয়্যার পরিবর্তন হয়েছিল, তবুও তা পর্যালোচনা করে সঠিকভাবে পালন করেছে। জিনিউ প্রতিষ্ঠানটি ৫০ হাজার বা ৩২ হাজার ৫০০ এসআইপি ট্রাঙ্ক সার্টিফিকেট অনুরোধ এবং পারফরম্যান্স ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলের তৃতীয় দরপত্রের সাথে তুলনা করলে, বর্তমান  দরপত্রে মূল্য ১২ মিলিয়ন টাকা বাড়েনি বরং ২২ মিলিয়ন টাকা কমেছে বলে উল্লেখ করেন। 

প্রতিবেদকের বক্তব্য

প্রকল্পের নানা নথিপত্র পর্যাপ্ত প্রমাণ ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা এবং অভিযুক্ত প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্যসহ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। 

বিটিসিএল’র এসটিএন প্রকল্পের টেন্ডারের সব শর্ত পূরণের দাবি জিনিউ করলেও দরপত্র প্রক্রিয়ার কারিগরি কমিটির সদস্য পরিষ্কারভাবেই দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, জিনিউ টেকনোলজিস লিমিটেডের নথিগুলো জাল বলে প্রতীয়মান হয়। যা আমাদের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়। কিন্তু কারিগরি কমিটির এহেন সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে জিনিউ কোন পদক্ষেপ নিয়েছিল কি না তা তারা তাদের সংশোধনীতে উল্লেখ করেনি। বরং দেখা যায়, সেই সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে পরের বার দরপত্রে তারা অংশ নেয়।

যে কোনো প্রকল্পে স্পেসিফিকিশনের যদি কোনো পরিবর্তন আনতে হয়ে তাহলে তা স্পেসিফিকিশন কমিটির আহবায়কের থেকে আসতে হয়। কিন্তু এই প্রকল্পে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রকল্প পরিচালক স্ব-উদ্যোগে ৫০ হাজার এসআইপি ট্রাঙ্ক কমিয়ে ৩২ হাজার ৫০০ করার সুপারিশ করে। আইন লঙ্গন করে প্রকল্প পরিচালকের স্বাক্ষরিত সেই চিঠি আমাদের হাতে আসে। সেই চিঠিতে জিনিউ-এর পক্ষ থেকে প্রদত্ত সংশোধনের প্রেক্ষাপটের বিষয়টিও উল্লেখ আছে।

এদিকে জিনিউ যেসব কাগজপত্র প্রদান করেছে তা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে সোয়া দুই কোটি টাকা বৃদ্ধির তথ্যটি ভুল ছিল। কিন্তু নতুন কাগজপত্র বিশেষণে যে প্রসঙ্গটি সামনে এসেছে তা হল, দরপত্রে ৫০ হাজার এসআইপি ট্রাঙ্ক কমিয়ে ৩২ হাজার ৫০০ করা হলেও যন্ত্রাংশ বাবদ প্রায় ৬১ লাখ টাকা বৃদ্ধি করে জিনিউ। আর মাত্র চার মাসে সার্ভিস চার্জ প্রায় পৌণে তিন কোটি টাকা কমিয়ে ফেলা হয়েছে। একই সেবার জন্য মাত্র ৪ মাসে সার্ভিস চার্জে এই বিপুল পরিমাণ কম দরপ্রস্তাবের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা দরকার।