আমাদের গ্রামে ছাগল প্রচুর। তবে সবার ছাগল একই রকম না। কারও ছাগল খুব শান্ত, কারওটা দুষ্টু। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশী হাশেম কাকার ছাগলটা একেবারে ভিন্ন রকম।
ছাগলটার নাম টুনি।
প্রথমে ওকে স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল। ক্ষেতের ঘাস খায়, কলাগাছের পাতা খায়। কিন্তু হঠাৎ একদিন ওর আসল কীর্তি ধরা পড়ল।
ঘটনাটা ঘটল আমাদের স্কুলে। আমি রাফি। পড়ি ক্লাস সেভেনে। সেদিন গরমে জানালা খোলা ছিল। হাশেম কাকার টুনি স্কুলের ভেতর ঢুকে পড়ল। আমাদের ইংরেজি বইগুলো বেঞ্চে রাখা ছিল। আমরা টিফিনে মাঠে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি, টুনি একটা বই চিবুচ্ছে!
আমরা হৈ হৈ করে ছুটে গেলাম। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, বইটা খাওয়া শেষ করেই টুনি হঠাৎ বলল, ‘ঞযব পড়ি রং ধ ফড়সবংঃরপ ধহরসধষৃ’
আমরা তো থ। ছাগলটা ইংরেজি বলছে! পাশে দাঁড়িয়ে মাসুম হা করে বলল, ‘রাফি, ছাগলটা কি ম্যাডামের বই মুখস্থ কইরা ফেলছে?’
সেদিন থেকে শুরু হলো টুনির কাণ্ড। যেই বই খায়, সেই বইয়ের ভেতরের জ্ঞান মুখস্থ করে বলে ফেলে। বাংলা খায় তো কবিতা আওড়ায়, গণিত খায় তো গুনের নামতা গড়গড় করে বলে যায়।
হাশেম কাকা প্রথমে ভয় পেয়ে ভেবেছিলেন, ছাগলের মধ্যে ভূত ঢুকেছে। পরে বুঝলেন, এটা বুদ্ধির কাজ। গ্রামের মানুষ দূর দূর থেকে টুনিকে দেখতে আসতে লাগল।
আমরা বন্ধুরা ঠিক করলাম, টুনি আসলে কেন বই খেয়ে কথা বলতে পারে, সেটা বের করব। কিন্তু ব্যাপারটা সহজ ছিল না। কারণ রাতে স্কুলের গোপন লাইব্রেরিতে ঢুকতে গিয়ে আমরা আবিষ্কার করলাম, সেখানে এক অচেনা লোক লুকিয়ে বই সাজাচ্ছে। তার হাতে ছিল অদ্ভুত যন্ত্র, যেটা দিয়ে সে বইতে কিছু একটা লাগাচ্ছিল। আর সেই যন্ত্রের দিকেই টুনি বারবার টান খাচ্ছিল।
আমাদের মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন, টুনি কি আসলে ছাগল? নাকি কোনো গোপন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফল?
লাইব্রেরির ভেতর যে অচেনা লোকটাকে দেখেছিলাম, পরে জানা গেল উনি ঢাকা থেকে আসা এক বৈজ্ঞানিক। নাম ড. রিয়াজ। উনি একটা গোপন একটা প্রকল্প চালাচ্ছিলেন যেখানে প্রাণীদের মস্তিষ্কে মাইক্রোচিপ বসিয়ে জ্ঞান সঞ্চার করা যায় কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছিল। টুনি সেই পরীক্ষার অংশ।
কিন্তু ড. রিয়াজ বললেন, ‘আমি চেয়েছিলাম ইঁদুরের ওপর কাজটা করতে। কিন্তু গ্রামে আসার পর দেখি ইঁদুর নিয়ে পরীক্ষা অসম্ভব। তখন হাশেম সাহেবের এই ছাগলটাকে পেলাম। টুনির ওপর চিপ লাগানোর পরই বিস্ময়কর
ব্যাপার ঘটল, সে বই পড়তে না শিখে বই খেয়েই মুখস্থ করতে লাগল!
আমরা হা করে শুনছিলাম।
টুনি তখন পাশে দাঁড়িয়ে নিরীহ চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ গড়গড় করে বলে উঠল, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি...’
আমরা হেসে গড়াগড়ি খেলাম।
সমস্যার শুরু হলো, খবরটা ছড়িয়ে পড়লে। গ্রামে লোকজন দল বেঁধে আসতে লাগল টুনিকে দেখতে। কেউ বলে, এটা বিদেশিদের পাঠানো গুপ্তচর ছাগল। কেউ বলে, এর অনেক দাম হবে বাজারে। আমাদের ভেতরে তখন ভয় আর দুঃখ। টুনিকে আমরা খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম।
শেষ পর্যন্ত ড. রিয়াজ ঠিক করলেন, টুনিকে ঢাকায় নিয়ে যাবেন না। বললেন, ‘ছাগলটা এখন তোমাদের গ্রামের সম্পদ। তবে আমি চিপটা খুলে দেব, না হলে ভবিষ্যতে বিপদ হতে পারে।’
আমরা সবাই হতাশ হয়ে পড়লাম। যদি টুনি আর কখনো কথা না বলতে পারে!
কিন্তু আশ্চর্য ঘটনা ঘটল, চিপ খুলে ফেলার পরও টুনি মাঝে মাঝে কথা বলে। যদিও পুরো বই মুখস্থ করতে পারে না, তবু সহজ কিছু শব্দ বলে ফেলে। যেমন একদিন
হাট-বাজারে হাশেম কাকা টুনিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এক লোক দাম জিজ্ঞেস করতেই টুনি হঠাৎ বলে উঠল, ‘বিক্রি না, বিক্রি না!’
পুরো হাটে হাসির রোল উঠল। আমরা চারজন বন্ধু দাঁড়িয়ে হেসে বললাম, ‘টুনি হয়তো এখন পুরো বই মুখস্থ করতে পারে না, কিন্তু গ্রামের মনের কথা ঠিকই বলতে পারে।’
সেদিন থেকে টুনি আমাদের গ্রামে শুধু ছাগল না, একেবারে বন্ধু হয়ে গেল। আর যখনই আমরা পড়া ভুল করি, টুনি এক কোণে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলে, ‘অধ্যয়ন করো!’