চাই ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতা

এক দুস্থ পরিবারের গল্প দিয়ে আজকের নিবন্ধ শুরু করা যাক। পরিবারটির পুরুষপ্রধান প্রয়াত, মা জীবিত আছেন ও দুই মেয়ে। মা এবং অবিবাহিত ছোট মেয়ের হাড়ভাঙা খাটুনিতে সংসার চলে। বড় মেয়ে আপাতত বাসায়। সব মিলিয়ে তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। এর মধ্যে সুন্দরী ছোট মেয়ের সম্পর্ক আসে এক সচ্ছল পরিবার থেকে। সেই খরচ মেটাতে গিয়ে, অতিরিক্ত দেনার বোঝা পরিবারটির পিঠে চাপে। মাস শেষে বাড়িওয়ালার রক্তচক্ষুর শাসানিতে পরিবারটি মাটিতে নিক্ষিপ্ত হওয়ার উপক্রম। তা ছাড়াও অসুখ-বিসুখে চিকিৎসা ও হাসপাতাল খরচ বাবদ কয়েক লাখ টাকা দেনায় নাক অবধি ডুবন্ত। অবশ্য পরিবারটির মালিকানায় এক খণ্ড জমি আছে। পরিবারের সদ্যস্যরা যখন শেষ সম্বল এই জমিটুকু বিক্রি করে সব ঋণ শোধ করতে উদ্যত, ঠিক তখন এক প্রভাবশালী নানা বাহানায় জমিটির মালিকানা নিয়ে গণ্ডগোল বাঁধিয়ে বিক্রয়লব্ধ অর্থের একটা বড় অংশ দাবি করে বসল। প্রভাবশালী বলে কথা একটা মিথ্যা মামলা দিয়ে সে অসুস্থ মা ও বড় মেয়েকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। রাতবিরাতে এখানে-সেখানে অতি বেশি সুদে ধার করে পুলিশকে পঁচিশ হাজার টাকা দিয়ে মা আপাতত ঘরে ফিরতে পারলেও ‘আইনের’ বাধ্যবাধকতা দেখিয়ে পুলিশ বড় মেয়েটিকে আদালতে চালান করে দেয়। গল্পটি এখানেই শেষ হতে পারত, কিন্তু গরিবের গল্প যে শেষ হওয়ার নয়।

গোদের উপর বিষফোড়া। প্রথম দফায় জামিনের জন্য দরকার ছিল পঞ্চাশ হাজার টাকা উকিল, মোক্তার ইত্যাদি ব্যয় বাবদ। বিনিময়ে কথা ছিল নো চিন্তা, ডু ফুর্তি। কিন্তু বিধি বাম সেই শয়তান প্রভাবশালী উক্ত পরিবারটির চেয়েও বেশি টাকা ব্যয় করে আরও পাঁচজন উকিল ভাড়া করে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হৈচৈ বাধালে মেয়েটির জামিন রহিত হয়। এবার জামিন পাইয়ে দেওয়া এবং পরবর্তী সময় মামলা লড়ার খরচসহ বাঘা উকিল নিয়োগে লাগবে দেড় লাখ টাকা। এনজিও এবং বিভিন্ন উৎস থেকে চড়া সুদে ধার করে দেড় লাখ টাকা দিয়ে মেয়েটি এখন মায়ের কোলে ফিরতে পেরেছে। আলোচিত এই পরিবারটি স্বাধীনভাবে কর্মকাণ্ড করতে পারল না, কদিন উৎপাদনে অংশগ্রহণে ব্যর্থ হলো (যা জাতীয় আয়ের অংশ) এবং ন্যায়বিচার থেকেও বঞ্চিত থাকল। অথচ বাংলাদেশের তিপ্পান্ন বছরের উন্নয়নের গল্প শুনতে শুনতে আমাদের সবার কান ঝালাপালা। আমাদের সমাজে প্রথাগত অর্থে উন্নয়ন আছে ঠিকই, কিন্তু বিশেষভাবে গরিবদের জন্য নেই ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতা। এখন মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন উন্নয়ন আগে, না ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতা আগে? দুই. সন্দেহ নেই, যেসব সমাজেরই লক্ষ্য হওয়া উচিত, পারতপক্ষে, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতা যুগপৎ নিশ্চিত করা। ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতা বিভিন্ন পথে একটা দেশের উন্নয়নকে প্রভাবিত করতে পারে এবং এই তিন লক্ষ্যের কোনো একটি বাদ পড়া মানে সমাজটি সর্বোত্তম ফলাফল থেকে বঞ্চিত হবে। যদি কোনো সরকারের লক্ষ্য হয় জনগণের সার্বিক মঙ্গল সাধন করা, তাহলে সেই সরকারের উচিত হবে উন্নয়ন কৌশলে তিনটি উপাদানই অন্তর্ভুক্ত করা। বিশেষত এটা হওয়ার নয় যে, উন্নয়ন আগে আসবে আর ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতা পরে পাবে। এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে মানুষ প্রহর গুনবে কথিত গল্পে গাধার সামনে মুলা ঝোলানোর মতো। এটা ঠিক যে, বিভিন্ন দেশে এমনকি বাংলাদেশে, বিভিন্নকালে এ রকমটি হয়ে আসছে বটে, তবে এ ধরনের প্রত্যাশার পরিণতি কী হতে পারে সে আলোচনা না হয় আপাতত শিকেয় তুলে রাখছি।

তিন. প্রশ্ন থেকে যায়, এই তিনটি অভীষ্ট লক্ষ্য কি একই সঙ্গে অর্জন সম্ভব? হলে তো কথাই নেই, এক ঢিলে তিন পাখি মারা। কিন্তু সীমিত সম্পদ, সময়, সক্ষমতা ইত্যাদির কারণে যুগপৎ ঘটনার সম্ভাবনা কিঞ্চিত কুঞ্চিত হয়ে অগ্রগণ্যতার, কোনটা আগে কোনটা পরে প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে। সহজ কথায়, নীতিনির্ধারকদের জন্য সময়, দক্ষতা, যোগ্যতা এবং অন্যান্য সম্পদ সীমিত থাকার সুবাদে তিনটি লক্ষ্য অর্জনে সম্পদের সর্বাধিক বরাদ্দ সম্ভব নাও হতে পারে। অর্থনীতির ভাষায়, স্বল্পতা (স্কারসিটি) যেখানে, ট্রেড অব বা একটি ছেড়ে অন্যটি নেওয়ার প্রশ্ন সেখানে। বর্তমান ক্ষেত্রেও তাই। এটা আজ সুবিদিত যে, নীতিনির্ধারকরাও ট্রেড অব বা পছন্দের মুখোমুখি হয়ে থাকেন এই অর্থে যে, কিছু লক্ষ্যে বেশি মনোযোগ দিলে অন্যান্য লক্ষ্যে তেমন মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। অর্থাৎ এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার থাকতে হবে এবং এই অগ্রাধিকার নির্বাচনের জন্য ভিত্তি নির্ধারণ করতে হবে। তিনটি লক্ষ্যের পেছনে একই সময় ছুটলেও এদের প্রত্যেকের প্রতি গুরুত্ব প্রদানে কমবেশি হতে পারে। তাহলে তখন কী করা? এমনতর পরিস্থিতির আলোকে আলসটার ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক এস আর ওসমানীর উপদেশ নিম্নরূপ : নীতিনির্ধারকদের যদি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয় তাহলে তাদের উচিত হবে ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব বেশি দিয়ে প্রথাগত উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব প্রদান করা। তার অর্থ এই নয় যে, তিনি ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার চেয়ে প্রথাগত উন্নয়নকে খাটো করে দেখছেন। আফটার অল, দিন শেষে আমরা সবাই ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতা হৃদয়ে লালন করতে পারি, কিন্তু এটাও তো সত্যি কথা যে, বেশিরভাগ মানুষ ঐশ্বর্যের মধ্যেও থাকতে চায়। তার এহেন যুক্তির পেছনে ক্রিয়াশীল থাকছে ‘দক্ষতার রাজ্য’ ধারণা (ডোমেইন অব কম্পিটেনস), যা কিনা বহুল প্রচারিত আপেক্ষিক সুবিধার কাছাকাছি। একদিকে আছে গণরাজ্য (পাবলিক ডোমেইন) যেখানে সরকার ও তার নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকে। অন্যদিকে রয়েছে ব্যক্তি-রাজ্য  (প্রাইভেট ডোমেইন) যেখানে একক বা যৌথ ব্যবস্থাপনায় সরাসরি যুক্ত রয়েছে জনগণ। কিছু নির্দিষ্ট কাজে গণরাজ্য অধিকতর পারদর্শী, কিছু কাজে ব্যক্তি-রাজ্য অধিকতর পারঙ্গম হতে পারে। ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতা অর্জনের কাজটি একচেটিয়া না হলেও মুখ্যত গণরাজ্যের দক্ষতার প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে উন্নয়নের ব্যাপার-স্যাপার দুই রাজ্যেরই কারবার, তবে প্রয়োজন সাপেক্ষে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের একটা বিরাট অংশ ব্যাক্তি-রাজ্যে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতা কখনো ব্যক্তি-রাজ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া সমীচীন নয়। আর তাই বলতে হয় অগ্রাধিকার নিয়ে আদৌ যদি কথা ওঠে, তখন সরকারের উচিত হবে উন্নয়নকে প্রধানত ব্যক্তি-রাজ্যে ন্যস্ত করে ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতা দেওয়ার পথটি প্রশস্ত করার প্রত্যয় বেছে নেওয়া। চার. এমনতর হাইপোথেসিস দুটো প্রশ্নের জন্ম দেয়। প্রথম, কেন ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতা প্রদান মুখ্যত গণরাজ্যের কর্তব্য বলে ধরে নেব? এর প্রধান কারণ এই যে, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে সঠিকভাবে গড়া প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানগুলোর সৃষ্টি, রক্ষণ এবং এদের সঙ্গে সুষ্ঠু পরিচালনের জন্য যে সমন্বয় সাধন দরকার তা একমাত্র সরকারের পক্ষেই সম্ভব, ব্যক্তি-রাজ্যের দ্বারা তা সম্ভব নয়। ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার দাবি ব্যক্তি ব্যবহারের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে যাতে করে সবাই ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারে। আর মানুষ যেহেতু অন্যের কথা কম বিবেচনা করে নিজের স্বার্থেই বেশি পরিচালিত হয়, সে ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধগুলো স্বভাবতই ব্যক্তিক সুবিবেচিত ব্যবহার এবং সামাজিকভাবে সর্বাধিক ব্যবহারের মধ্যে দেয়াল নির্মাণ করতে পারে। বস্তুত ব্যক্তি-রাজ্যে সমন্বয়হীনতার শেকড়ে রয়েছে এই সমস্যা। নীতিগতভাবে ব্যক্তিস্বার্থের ওপরে উঠে একমাত্র কিছু আধি রাষ্ট্রীক কর্র্তৃত্ব (সুপ্রা- অথরিটি) থাকলে নিশ্চিত করা যায় যে, টেকসই সর্বোচ্চ সামাজিক মঙ্গল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব।

দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, কেন মনে করা হচ্ছে যে, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের একটা বড় অংশ ব্যক্তি-রাজ্যের ওপর ন্যস্ত করা যেতে পারে? এর উত্তর খুব সোজা এমনিতেই বাজার অর্থনীতিতে সংগঠিত অধিকাংশ কর্মকাণ্ডের বড় একটা অংশ ব্যক্তি-রাজ্যে অবস্থান করে। ধরা যাক প্রথাগত উন্নয়নের কথা যার কেন্দ্রে আছে, জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি। এই উৎপাদন সৃষ্টি করছে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিপুল সংখ্যক ব্যক্তি হয় এককভাবে নয়তো ছোট ছোট দলবদ্ধ হয়ে। সুতরাং ধরে নেওয়া যায় যে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন যদি ঘটে থাকে, তবে তা মূলত জনগণের শ্রম ও মেধার ওপর ভর করে ঘটছে। সাধারণ যে দাবির কথা আমরা প্রায় শুনে থাকি তাহলো সরকার, বিশেষত সমগ্রতাবাদী (টোটালেটেরিয়ান) সরকার নাকি উন্নয়ন উপহার দেয়, কিন্তু বাস্তবে ঘটে উল্টোটা জনগণ উন্নয়ন ঘটায়, সরকার নয়। সরকার যদি সবচেয়ে ভালো কৃতিত্ব দেখাতে চায় তবে তা হবে জনগণকে উন্নয়ন ঘটাতে বা উন্নয়নে উদ্বুদ্ধ হতে সাহায্য করা আর সবচেয়ে খারাপ দৃষ্টান্ত হচ্ছে উন্নয়ন নষ্ট করা। সরকারের ভূমিকা এতটুকুই। মোট কথা, উন্নয়ন এমন এক কর্মযজ্ঞ, যা মূলত ব্যক্তি-রাজ্যে বিচরণ করে থাকে। প্রসঙ্গত না বললেই নয় যে, উন্নয়নে সরকারের কিছু ন্যায্য ভূমিকা আছে, যেমন গণ-পণ্য প্রদান করা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমন্বয়হীনতা দূর করা, বহিঃপ্রভাব সৃষ্ট বিকৃতি প্রতিরোধ, সামাজিক নিরাপত্তা জাল কর্মসূচি প্রবর্তন এবং স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার ছাড়াও একটা স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিনির্মাণ করা, যাতে করে জনগণ অবাধে কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড করবে জনগণ, সরকার দেবে স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার এর বিপরীত কখনো সুফল বয়ে আনে না। অতএব কোনটা আগে কোনটা পরে এমন অগ্রাধিকারের প্রশ্ন উঠলে সরকারের উচিত হবে উন্নয়নের ওপরে ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেওয়া, যদিও দুঃখজনকভাবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ঠিক বিপরীত অবস্থানটি আলিঙ্গন করে থাকে অর্থাৎ উন্নয়নের চিন্তা আগে করা হয়, বাকি দুটো পরে করার ভাবনা নিন্দুকের ভাষায় ভান। অধিকাংশ দেশ ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতাকে পাশ কাটিয়ে প্রথাগত উন্নয়ন মোহে আচ্ছন্ন থাকছে। অথচ যদি আবিষ্ট থাকতেই হয় তবে তা উন্নয়নের পরিবর্তে ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতাকে ঘিরে আবিষ্ট থাকা উচিত।

পাঁচ. প্রান্তিক অতিরঞ্জন নিয়ে উপরোক্ত যুক্তির সারমর্ম দাঁড়ায় নিম্নরূপ : সরকার যদি ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতা দেখভাল করে, জনগণই উন্নয়ন দেখভাল করবে। একটু ভিন্ন সুরে একই কথা বলা চলে সরকার যদি একান্তই ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতার প্রতি যত্নবান হয়, উন্নয়নই উন্নয়নের প্রতি খেয়াল রাখবে। পাদটীকা : কথিত পরিবারটি মুখিয়ে আছে, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার দিকে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত থেকেছে এবং থাকছে। লালন কী তাই বলেছেন ‘আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময়, পারে লয়ে যাও আমায়’।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও সাবেক উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

abdulbayes@yahoo.com