ধামরাইয়ে বংশী নদীর ওপর ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতুতে উঠতে মই ব্যবহার করতে হচ্ছে। ছয় কোটি টাকার আরেকটি সেতুর নির্মাণকাজ ৬ বছরেও অর্ধেক শেষ হয়নি। এই দুটি সেতুর কাজ ফেলে ঠিকাদার উধাও হয়েছে। পরে নতুন ঠিকাদার এলেও কাজ শেষ করতে পারেনি। এলাকাবাসী ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হচ্ছেন।
সেতু নির্মাণে বিলম্বের কারণ হিসেবে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সিন্ডিকেট, সাব-ঠিকাদারদের পাওনা বিল পরিশোধ না করা, মাটি না পাওয়ার অজুহাত এবং নকশার ত্রুটির অভিযোগ উঠেছে।
সেতু দুটির একটি হচ্ছে উপজেলার সোমভাগ ইউনিয়নের দক্ষিণ দেপাশাই মাঝিপাড়া এবং অন্যটি ফুকুটিয়া এলাকায়। দুটি সেতুই বংশী নদীর ওপর নির্মিত হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, দক্ষিণ দেপাশাই মাঝিপাড়ায় ৬৫০ মিটার চেইনেজে ৯৬ মিটার পিএসসি গার্ডার সেতুর নির্মাণকাজ ২০২০-২১ অর্থবছরে শুরু হয়। সেতুর নির্মাণ ব্যয় ৯ কোটি ৬৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালের ১৮ মার্চ। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘কামারজানী-আনোয়ারা (জেবি)’ সংযোগ সড়ক না করে উধাও হয়েছে। সংযোগ সড়ক না থাকায় শিক্ষার্থী, কৃষক, বৃদ্ধসহ সব বয়সের মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। প্রতিদিন হাজারো মানুষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন শিশু ও বয়স্করা। সোমভাগ ইউনিয়ন পরিষদের ৫নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল হক বলেন, ‘সেতুটি নিয়ে আমরা বিপাকে পড়েছি। প্রতিদিন ৪-৫ হাজার মানুষ এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করেন। সংযোগ সড়ক না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটছে। শিশু ও বয়স্করা ভয়ে থাকেন। উপজেলা প্রকৌশলীর কাছে গিয়েছিলাম, তিনি বলেছেন ঠিকাদার আসবে, কিন্তু এখনো আসেনি। আমার দাবি, দ্রুত কাজ শেষ করা হোক।’
অন্যদিকে, ফুকুটিয়া এলাকায় বংশী নদীর ওপর ৯০ মিটার পিএসসি গার্ডার সেতুর কাজ ২০১৯ সালে শুরু হয়। ‘সুরমা অ্যান্ড খোদেজা এন্টারপ্রাইজ’ নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়। ২০২০ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ৬ বছরে মাত্র ৫০ শতাংশ কাজ হয়েছে। তিন ঠিকাদার একের পর এক পালিয়েছে। বর্তমান ঠিকাদার বিপ্লব নকশার ত্রুটি ও করোনার কারণে দেরির অজুহাত দিয়েছে। শ্রমিকদের বিল পরিশোধ না করায় তারা কাজ ছেড়ে চলে গেছে।
ঠিকাদার বিপ্লব ও প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মনির হোসেন সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য প্রতিবেদককে অনুরোধ করেন।
স্থানীয়রা জানান, সেতুর কাজ অসমাপ্ত থাকায় বর্ষায় নৌকা আর শুকনো মৌসুমে বাঁশের সাঁকোই ভরসা। শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হয়। নৌকা ডুবে দুর্ঘটনা ঘটছে।
স্থানীয় মালেকা বেগম বলেন, ‘বারবার ঠিকাদার পালিয়েছে। নৌকায় নদী পার হতে হয়, বিকল্প পথ নেই। দ্রুত সেতু নির্মাণ জরুরি।’
ভালুম আতাউর রহমান খান কলেজের ছাত্রী ফাহিমা আক্তার বলেন, ‘নৌকায় যাতায়াত কষ্টকর। রাতে অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার জন্য নদী পার হতে সমস্যা হয়।’
ফুকুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মা তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘গত বছর নৌকা ডুবে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা নষ্ট হয়েছে। শুকনো মৌসুমে বাঁশের সাঁকোতে পা পিছলে দুর্ঘটনা ঘটে।’
সোমভাগ ইউনিয়ন পরিষদের ৩নং ওয়ার্ডের সদস্য আবুল কালাম বলেন, ‘ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজ না করে চলে গেছে। সাবেক এমপি বেনজীর আহমদকে জানানো হয়েছে, কিন্তু সমাধান হয়নি। দ্রুত কাজ শেষ করা দরকার।’
ধামরাই উপজেলা প্রকৌশলী মিনারুল ইসলাম বলেন, ‘ঠিকাদারদের বারবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে নতুন টেন্ডার দেওয়া হবে।’ তবে নকশার ত্রুটির বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।