জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওপর ‘স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত ও একরোখা মনোভাব’ প্রদর্শনের অভিযোগ এনেছে। দলটি নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে ‘শাপলা’ না পাওয়ায় এই অভিযোগ তুলেছে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম শাপলা প্রতীক না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
শুক্রবার (০৩ অক্টোবর) বিকেলে এনসিপির প্রধান সমন্বয়ক নাসিরউদ্দীন পাটোয়ারী তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে নাহিদ ইসলাম স্বাক্ষরিত ‘শাপলা প্রতীক বরাদ্দ প্রশ্নে এনসিপির ব্যাখ্যা’ শিরোনামে একটি বার্তা শেয়ার করেন। ওই বার্তায় এনসিপির পক্ষ থেকে শাপলা প্রতীক বরাদ্দের যৌক্তিকতা ও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার ইতিহাস বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়।
বার্তায় নাহিদ ইসলাম বলেন, আশা করি শাপলা প্রতীক দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন তাদের স্বেচ্ছাচারী ও একরোখা মনোভাব পরিত্যাগ করবে এবং এমনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে যাতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন ও সব দলের ক্ষেত্রে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহ জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।
এনসিপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দলটি আত্মপ্রকাশের পর থেকেই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। এপ্রিল মাস থেকে নির্বাচন-সংক্রান্ত নানা বিষয়ে আলোচনা চলে। নির্বাচনী প্রতীকের তালিকা হালনাগাদের অংশ হিসেবে গঠিত কমিটির সঙ্গে গত ৪ জুন এনসিপির একটি প্রতিনিধিদল বৈঠক করে এবং ওই বৈঠকে শাপলা প্রতীক তালিকাভুক্তির বিষয়ে আশ্বাস পাওয়া যায় বলে দলটি দাবি করে।
এরপর ২২ জুন এনসিপি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করে এবং শাপলা প্রতীক সংরক্ষণের জন্য অনুরোধ জানায়। দাবি করা হয়, আবেদনের পরপরই সারা দেশের মানুষ এনসিপির সঙ্গে শাপলা প্রতীককে চিনতে শুরু করে এবং একটি ‘আত্মিক সম্পর্ক’ গড়ে ওঠে। জুলাই মাসে ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিতে জনগণ খাল-বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে অংশ নেয় বলে বার্তায় উল্লেখ করা হয়।
গত ৯ জুলাই সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে এনসিপি জানতে পারে যে, শাপলা জাতীয় প্রতীক হওয়ায় একে নির্বাচনী প্রতীকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
১৩ জুলাই এনসিপির একটি প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করে। ওই বৈঠকে তারা যুক্তি দেখান যে, সংবিধান ও অন্যান্য বিদ্যমান আইনে শাপলাকে প্রতীক হিসেবে দিতে কোনো বাধা নেই। তারা উল্লেখ করেন, জাতীয় প্রতীকের চারটি উপাদানের মধ্যে ‘ধানের শীষ’ ইতিমধ্যে বিএনপিকে এবং ‘তারা’ জেএসডিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জাতীয় ফল ‘কাঁঠাল’ বাংলাদেশ জাতীয় পার্টিকে এবং ‘সোনালি আঁশ’ তৃণমূল বিএনপিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাই জাতীয় ফুল শাপলা দিতে কেন বাধা থাকবে-এমন প্রশ্ন তোলেন তারা।
বার্তায় আরও বলা হয়, গত ৩ আগস্ট আরেকটি বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ডিজিএফআইসহ কিছু সংস্থার লোগোতে শাপলা থাকার কথা উল্লেখ করে এনসিপিকে শাপলা না দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন বলে এনসিপির দাবি।
এনসিপির প্রতিনিধিদল ওই বৈঠকে এর জবাবে দাবি করেন, বাংলাদেশ পুলিশের লোগোতে ‘ধানের শীষ’ থাকা সত্ত্বেও বিএনপিকে, বিমান বাহিনীর লোগোতে ‘ঈগল’ থাকা সত্ত্বেও আমার বাংলাদেশ পার্টিকে এবং সুপ্রিম কোর্টের লোগোতে ‘দাঁড়িপাল্লা’ থাকা সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামীকে সেই প্রতীকগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাই শুধুমাত্র ডিজিএফআই-এর লোগোর সাদৃশ্যের অজুহাত দেখিয়ে এনসিপিকে শাপলা না দেওয়া ‘বৈষম্যমূলক ও স্বেচ্ছাচারী’।
এনসিপির বার্তায় অভিযোগ করা হয়, ‘একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল’ এনসিপিকে শাপলা প্রতীক না দেওয়ার জন্য তৎপরতা চালিয়েছে।
সম্প্রতি সব শর্ত পূরণ করে এনসিপি নির্বাচন কমিশন থেকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের স্বীকৃতি পেলেও গত ২৩ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব সংবাদমাধ্যমকে জানান, প্রতীক তালিকায় শাপলা নেই বলে এনসিপিকে তা দেওয়া যাবে না।
এনসিপির বার্তায় এই সিদ্ধান্তকে ‘অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের এহেন একরোখা কার্যকলাপে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।
সার্বিক পরিস্থিতিতে এনসিপি আশা প্রকাশ করে যে, নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে তাদের অনুকূলে ‘শাপলা’, ‘সাদা শাপলা’ বা ‘লাল শাপলা’-এই তিনটির যেকোনো একটি প্রতীক বরাদ্দ দেবে এবং তাদের ‘স্বেচ্ছাচারী ও একরোখা মনোভাব’ পরিত্যাগ করবে।