ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় শহরগুলোয় সরকারের আবাসন প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ দেওয়া ‘বন্ধ করা উচিত’। একই সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে সরকারি উদ্যোগে আধুনিক আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাছাড়া আবাসনকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা।
সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৫ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তারা এসব কথা বলেন। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়— ‘পরিকল্পিত উন্নয়নের ধারা, নগর সমস্যায় সাড়া’। এ উপলক্ষে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের লবিতে দুই দিনব্যাপী বসতি মেলা চলছে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর ডেপুটি আবাসিক সমন্বয়কারী সোনালী দয়ারত্নে, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মতিন, রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. শামীম আখতার, স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি মো. আসিফুর রহমান ভূঁইয়া, বিআইপির সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান, রিহ্যাব সভাপতি ওয়াহিদুজ্জামান, রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুল, কো-চেয়ারম্যান মাহির আলী খান রাতুল, ভাইস চেয়ারম্যান সাইফ আলী খান অতুলসহ আবাসন খাতের বিশিষ্ট ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, উপকূলীয় শহরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত তীব্র আকারে প্রকাশ পাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা জনজীবন, কৃষি এবং নগর অবকাঠামোকে গভীর সংকটে ফেলে দিচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলা।
তিনি বলেন, পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলার জন্য আমাদের ভূমির সঠিক ব্যবহার, গণপরিবহন ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করা এবং নগর সেবায় আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যবহার বাড়ানো দরকার।
গণপূর্ত উপদেষ্টা বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ন শুধু অবকাঠামোর উন্নয়ন নয়—এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। আমরা যদি সমন্বিতভাবে ও পরিকল্পিতভাবে কাজ করি, তবে বাংলাদেশের নগরগুলোর বর্তমান সংকট মোকাবিলা করে এগুলোকে আধুনিক, টেকসই ও বসবাসযোগ্য নগর রূপে গড়ে তুলতে পারব বলে আমি বিশ্বাস করি।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “বসতি কোনো বিলাসিতা নয়, এটিকে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। শুধু শহরাঞ্চলে নয়, গ্রামাঞ্চলেও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক আধুনিক আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, বরং বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, পরিবহনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করেই বসতি গড়ে তুলতে হবে।”
তিনি বলেন, “সবার জন্য দুর্যোগ-সহনশীল, পরিবেশবান্ধব ও বিকেন্দ্রীকৃত আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূমি পানির নিচে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই বাস্তবতায় এখন থেকেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে বিপুল সংখ্যক মানুষের পুনর্বাসন একটি ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।”
তিনি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) এবং করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) মাধ্যমে নিম্নবিত্ত ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাছাড়া জলবায়ু সহনশীল আবাসন নির্মাণে মডেল প্রকল্প গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডে প্রকল্প প্রস্তাব দাখিলের জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করেন পরিবেশ উপদেষ্টা।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আরও বলেন, “রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকারের মধ্যে আমরা বসতিকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করব, তার একটি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কেউ ছয়-সাতটা প্লটের মালিক, অন্যদিকে একজন মধ্যবিত্ত কী করছে—তাই বসতিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার।”
তিনি বলেন, “ফ্ল্যাটের পাশাপাশি দুর্যোগ-সহনশীল বসতির কথা ভাবতে হবে। বন্যা, নদীভাঙন অঞ্চলে এসব বসতির কথা ভাবা জরুরি হয়ে পড়েছে। যা টেকসই হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সহনশীল হবে। বিকেন্দ্রীকরণ, পার্টনারশিপ, সবুজায়ন ও দুর্যোগ-সহনশীলতার মাধ্যমে আমরা নিরাপদ বসতি গড়তে পারি।”
বস্তি কোনো বসতি নয় উল্লেখ করে পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, “নিতান্ত বাধ্য না হলে কেউ বস্তিতে থাকে না। বস্তিবাসীর পুনর্বাসন না করে মানুষ যেন বস্তির শরণাপন্ন না হয়, সে রকমভাবে পরিকল্পনা নিতে হবে।”
সভাপতির বক্তব্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের আবাসনে। তারা যেন সঠিক সেবা পায়, দুর্নীতিকে পেছনে ফেলে আমরা যেন তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি—এটাই আমাদের অঙ্গীকার।”
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম জানান, সবার জন্য বাসস্থান নিশ্চিত করতে নতুন কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে ঢাকার চেহারা বদলে যাবে। তিনি বলেন, “আমরা পাঁচ বছরের পরিকল্পনা করি কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে লাগে ৫০ বছর—এই চর্চা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।”
উত্তরায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “অনেকে বলেন রাজউক কেবল বড়লোকদের জন্য, এ তকমা থেকে সরে আসতে চাই।”
বসতি নির্মাণ করতে গিয়ে পরিবেশকে কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সভায় অভিযোগ করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, “আবাসনের নামে জলাশয়গুলো ভরাট করা হচ্ছে। জলাশয় ভরাট করে আবাসন যেন করা না হয়, সে দিকে নজর দেওয়া দরকার। এসব ক্ষেত্রে সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।”
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, “পরিকল্পিত নগরায়ন দরকার। এ জন্য ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।”
অনুষ্ঠানে অতিথিরা বিশ্ব বসতি দিবসের স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন এবং পরে তিন দিনব্যাপী বসতি মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। এর আগে বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে শেরেবাংলা নগর এলাকায় এক র্যালির আয়োজন করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ সংস্থাগুলো।