মানবজাতির ইতিহাস যত পুরনো, শয়তানের শত্রুতা ততই প্রাচীন। আল্লাহতায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন শ্রেষ্ঠ রূপে, তাকে দিয়েছেন বিবেক-বুদ্ধি, নেক আমলের যোগ্যতা ও জান্নাতের পুঁজি সংগ্রহের অবকাশ। কিন্তু মানুষের এ সৎযাত্রার শুরু থেকেই শয়তান তাকে পথভ্রষ্ট করার চক্রান্তে লিপ্ত। শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্রতারণায় সহজেই মানুষ আল্লাহর আনুগত্য থেকে ছিটকে গিয়ে জাহান্নামের পথে চলে যায়। তাই এই শয়তানের পরিচয়, কার্যকলাপ এবং তার ক্ষতি থেকে বাঁচার উপায় বা সেটার প্রতিকার জানা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য।
শয়তানের পরিচয় : শয়তান শব্দটি আরবি ‘শাতানুন’ থেকে এসেছে। এর অর্থ দূরে অবস্থান করা বা দূরবর্তী হওয়া। যেহেতু শয়তান কল্যাণ ও আল্লাহর রহমত থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে, তাই তাকে শয়তান বলা হয়। (তাকরিরুল হাবি ১৫৩)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘ইবলিসের নাম ছিল আজাজিল। সে ছিল ফেরেশতাদের মধ্যেও সম্মানিত। তার চারটি পাখা।’ তিনি অপর বর্ণনায় বলেন, ‘ইবলিস ছিল ফেরেশতাদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর নাফরমানি করার কারণে তার ক্রোধে পরে শয়তান হয়ে যায়।’ আবু জায়েদ, হাসান, কাতাদাহ প্রমুখ বলেন, ইবলিস জিন জাতির আদি পিতা, যেমন আদম (আ.) মানবজাতির আদি পিতা। তবে সে ফেরেশতা নয়। গ্রিক ভাষায় তার নাম আজাজিল, আর আরবি ভাষায় হারিস। (তাফসিরে কুরতুবি ১/২৩৬)
কোরআনে শয়তানের বর্ণনা : পবিত্র কোরআনে শয়তানকে মানবজাতির শত্রু হিসেবে উল্লেখ করে তার ব্যাপারে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোরআনে শয়তানকে ইবলিস নামে ৯ স্থানে ১১ বার উল্লেখ করা হয়েছে। আর কোরআনের প্রায় ৮৮টি আয়াতে শয়তান শব্দটি এক ও বহু বচনে ব্যবহৃত হয়েছে। শয়তানের ব্যাপারে কোরআনের মৌলিক বক্তব্য উল্লেখ করা হলো।
জিনদের অন্তর্ভুক্ত : শয়তান জিনদের অন্তর্ভুক্ত। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তখন তারা সবাই সিজদা করল ইবলিস ছাড়া। সে জিনদের একজন, সে তার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল।’ (সুরা কাহাফ ৫০)
মানবজাতির চিরশত্রু : পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল, উৎকৃষ্ট বস্তু আছে তা খাও এবং শয়তানের পদচিহ্ন ধরে চলো না। নিশ্চয় সে তোমাদের এক প্রকাশ্য শত্রু। সে তো তোমাদের অন্যায় ও অশ্লীল কাজ করতে এবং আল্লাহ সম্পর্কে এমন কথা বলতে আদেশ করে, যা তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা ১৬৮-১৬৯)
মানুষকে জাহান্নামি বানাতে চায় : আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাকে শত্রুই গণ্য করো। সে তার অনুসারীদের দাওয়াত দেয় কেবল এ জন্যই, যাতে তারা জাহান্নামবাসী হয়ে যায়।’ (সুরা ফাতির ৬) অপর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি তোমার দ্বারা আর তাদের মধ্যে যারা তোমার অনুগামী হবে তাদের সবার দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করব।’ (সুরা সোয়াদ ৮৫)
প্রতারণা করে : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আদম সন্তান! শয়তান যেন কিছুতেই তোমাদের প্রতারিত করতে না পারে, যেমন সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল। সে তাদের পরস্পরের লজ্জাস্থান দেখানোর উদ্দেশে তাদের দেহ থেকে তাদের পোশাক অপসারণ করিয়েছিল। সে ও তার দল এমন স্থান থেকে তোমাদের দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদের দেখতে পাও না। যারা ইমান আনে না, আমি শয়তানকে তাদের বন্ধু বানিয়ে দিয়েছি।’ (সুরা আরাফ ২৭)
বিপথগামী করে : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সে বলল, তবে আপনার ক্ষমতার শপথ! আমি তাদের সবাইকে বিপথগামী করে ছাড়ব। তবে তাদের মধ্যকার আপনার মনোনীত বান্দাদের ছাড়া।’ (সুরা সোয়াদ ৮২-৮৩)
আল্লাহর লানত : পবিত্র কোরআন ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চিতভাবে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তোমার প্রতি থাকল আমার অভিশাপ।’ (সুরা সোয়াদ ৭৮)
জিকিরে বাধা দেয় : শয়তান মানুষকে গাফেল করার জন্য সর্বপ্রথম জিকিরে বাধা দেয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষের বীজই বপন করতে চায় এবং চায় তোমাদের আল্লাহর জিকির ও নামাজ থেকে বিরত রাখতে। সুতরাং তোমরা কি (ওসব জিনিস থেকে) নিবৃত্ত হবে?’ (সুরা মায়েদা ৯১)
নামাজে কুমন্ত্রণা দেয় : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয়, তখন শয়তান পিঠ ফিরিয়ে পালায়, যাতে আজান শুনতে না পায়। আর তার পশ্চাৎ-বায়ু সশব্দে নির্গত হতে থাকে। আজান শেষ হয়ে গেলে সে এগিয়ে আসে। আবার নামাজের জন্য ইকামত দেওয়া হলে সে পিঠ ফিরিয়ে পালায়। ইকামত শেষ হয়ে গেলে আবার ফিরে আসে। এমনকি সে নামাজ আদায়রত ব্যক্তির মনে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করে এবং বলতে থাকে, অমুক অমুক বিষয় স্মরণ করো, যা তার স্মরণে ছিল না। এভাবে সে ব্যক্তি কত রাকাত নামাজ আদায় করেছে, তা স্মরণ করতে পারে না। তাই তোমাদের কেউ তিন রাকাত বা চার রাকাত নামাজ আদায় করেছে, তা মনে রাখতে না পারলে বসা অবস্থায় দুটি সিজদা করবে।’ (সহিহ বুখারি ১২১৯)
শয়তান থেকে বাঁচার উপায় : শয়তান ও তার কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য কোরআন ও হাদিসে বিভিন্ন উপায়ের কথা বর্ণিত হয়েছে। তা উল্লেখ করা হলো।
আউজুবিল্লাহ বলা : শয়তানের কুপ্ররোচনা থেকে বাঁচার জন্য ‘আউজুবিল্লাহ মিনাস শাইতানির রাজিম’-এর আমল করা যায়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি শয়তানের পক্ষ থেকে তোমাকে কোনো কুমন্ত্রণা দেওয়া হয়, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আরাফ ২০০)
এ আয়াতে সব মুসলিমকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, শয়তান মনে কখনো মন্দ ভাবনার প্রতি প্ররোচনা দিলে, সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত। আরেক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘সুতরাং আপনি যখন কোরআন পড়বেন, তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করবেন।’ (সুরা নাহল ৯৮)
নামাজ আদায় করা : শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে যথাযথভাবে খুশু-খুজুর সঙ্গে নামাজ আদায় করা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহর জিকিরই তো সর্বাপেক্ষা বড় বিষয়। তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ তা জানেন।’ (সুরা আনকাবুত ৪৫) অর্থাৎ মানুষ যদি যথাযথভাবে খুশু-খুজুর সঙ্গে নামাজ আদায় করে এবং নামাজের উদ্দেশ্যের প্রতি মনোযোগী থাকে, তবে অবশ্যই নামাজ তাকে অন্যায়, অশ্লীল ও শয়তান থেকে বাঁচিয়ে রাখবে।
জিকির : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে তাদের যখন শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে ফলে, তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়।’ (সুরা আরাফ ২০১) অর্থাৎ নফস ও শয়তানের প্ররোচনায় বড় বড় মুত্তাকিদেরও গুনাহের ইচ্ছা জাগে, কিন্তু তারা তা প্রশমিত করে এভাবে যে, তারা অবিলম্বে আল্লাহর জিকিরে লিপ্ত হয়ে যায়।
কোরআন তিলাওয়াত : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের ঘরকে কবর বানিয়ো না (অর্থাৎ কবরে যেমন নামাজ বা তিলাওয়াত হয় না তেমনি বিনা নামাজ ও তিলাওয়াতে ঘরকেও সেটার মতো কোরো না, বরং তাতে নামাজ ও তিলাওয়াত করতে থাকো।) অবশ্যই শয়তান সেই ঘর থেকে পলায়ন করে যে ঘরে সুরা বাকারা পাঠ করা হয়।’ (সহিহ মুসলিম ১৮৬০)
সৎসঙ্গ : শয়তান থেকে বাঁচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী এক উপায় হচ্ছে সৎসঙ্গ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি দৃঢ়চিত্ত হয়ে তাদের সঙ্গে অবস্থান করো যারা সকাল-সন্ধ্যা তাদের প্রতিপালককে আহ্বান করে তার সন্তুষ্টি লাভের সন্ধানে। পার্থিব জীবনের শোভা ও চাকচিক্য কামনায় তুমি তাদের থেকে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ো না। তুমি তার আনুগত্য কোরো না যার অন্তরকে আমি আমার স্মরণ থেকে উদাসীন করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির আনুগত্য করে আর যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমালঙ্ঘনমূলক।’ (সুরা কাহাফ ২৮)
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া কাশেফুল উলুম মাদ্রাসা, মধুপুর, টাঙ্গাইল