মুক্তি ও সংহতির পক্ষে নৌপথে অহিংসার যাত্রা

‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ বা ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’র মতো সামুদ্রিক মানবিক অভিযানগুলো আধুনিক মানবাধিকার আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই প্রচেষ্টাগুলোর শুরুটা ছিল ২০১০ সালের ‘মাভি মারমারা’ অভিযানের মাধ্যমে। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

গাজার ওপর ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নৌ-অবরোধকে চ্যালেঞ্জ জানানোর উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাপী নাগরিক সমাজের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি সাহসী ও অহিংস সমুদ্র অভিযান হলো গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা। আরবি শব্দ ‘সুমুদ’ (Sumud)-এর অর্থ হলো ‘ধৈর্য, স্থিরতা বা দৃঢ়তা’, যা ফিলিস্তিনিদের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার মানসিকতার প্রতীক। এই অভিযান কেবল মানবিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়াই নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখ গাজার দুরবস্থার দিকে ফেরানোর এক শক্তিশালী নৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রচেষ্টা।

ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার জন্ম ২০০৬ সাল থেকে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’ আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহন করে। ২০১০ সালের ফ্রিডম ফ্লোটিলায় ইসরায়েলি বাহিনীর আক্রমণে ১০ জন তুর্কি নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনা বিশ্ব জুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং এ ধরনের নাগরিক উদ্যোগের ঝুঁকি ও গুরুত্বকে প্রকট করে তুলেছিল। ২০২৫ সালের গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা সেই ধারারই বৃহত্তম ও সমন্বিত রূপ। এই মিশনে বিশে^র ৪৪টিরও বেশি দেশ থেকে ৫০০ জনেরও বেশি অংশগ্রহণকারী শামিল হন, যার মধ্যে মানবাধিকারকর্মী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনজীবী, শিল্পী এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ছিলেন।

মূল উদ্দেশ্য

ফ্লোটিলার প্রধান উদ্দেশ্যগুলো ছিল দুটি : ১. গাজার নৌ-অবরোধ ভেঙে খাদ্য, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামসহ জরুরি মানবিক সরবরাহ সরাসরি গাজাবাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া। ২. এই অহিংস প্রতিবাদী যাত্রার মাধ্যমে বিশে^র সামনে ইসরায়েলের অবরোধের অমানবিক দিকটি তুলে ধরা, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা এবং গাজা ওপর থেকে অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নেওয়ার জন্য বৃহত্তর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।

ফ্লোটিলার উদ্যোক্তারা বারবার জোর দিয়েছেন যে, এটি সম্পূর্ণভাবে নাগরিক সমাজ (civil society) দ্বারা পরিচালিত একটি উদ্যোগ, যার কোনো সরকারি বা রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতা নেই। এটি আন্তর্জাতিক সংহতির একটি পরিষ্কার বার্তা।

অভিযানের গতিপথ ও প্রস্তুতি

যাত্রা শুরু ও সংহতি : ফ্লোটিলাটি ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, যেমন স্পেন (বার্সেলোনা), ইতালি (জেনোয়া, ক্যাটানিয়া) এবং গ্রিস (সাইরোস) থেকে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তী পর্যায়ে তিউনিসিয়ার বন্দর থেকেও অন্যান্য নৌকা এই অভিযানে যোগ দেয়। আবহাওয়ার প্রতিকূলতা বা প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে কিছু নৌকার যাত্রা দেরিতে শুরু হলেও, তাদের লক্ষ্য ছিল ভূমধ্যসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় একত্রিত হয়ে গাজার দিকে এগিয়ে যাওয়া। বিভিন্ন আকারের ৪০টিরও বেশি ছোট-বড় নৌকা (vessels ) নিয়ে এটি ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম বেসামরিক নৌ-অভিযান হয়ে ওঠে।

ট্র্যাকিং ও যোগাযোগ

অর্গানাইজাররা একটি অনলাইন ট্র্যাকার সিস্টেম চালু রাখেন, যাতে সাধারণ মানুষ রিয়েল-টাইমে নৌকাগুলোর অবস্থান জানতে পারে। এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যম এবং লাইভ-স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে যাত্রাপথের প্রতিটি মুহূর্ত, ইসরায়েলি বাহিনীর বাধা দেওয়ার ঘটনা ও কর্মীদের বার্তা বিশে^র সামনে তুলে ধরা হয়। এই কৌশলটি অভিযানের দৃশ্যমানতা (visibility) এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। 

ইসরায়েলি নৌবাহিনীর বাধা

জলসীমায় প্রতিবন্ধকতা : ফ্লোটিলা গাজার উপকূলের দিকে যত এগোতে থাকে, ইসরায়েলি নৌবাহিনী ততই সক্রিয় হয়ে ওঠে। ইসরায়েল ফ্লোটিলাকে বারবার সতর্ক করে যে তারা একটি ‘সক্রিয় যুদ্ধাঞ্চলে’ প্রবেশ করছে এবং অবরোধ ভঙ্গ করতে দেওয়া হবে না। শেষ পর্যন্ত, আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকাকালীনই ইসরায়েলি বাহিনী ফ্লোটিলার বেশিরভাগ নৌকাকে ঘিরে ফেলে এবং অভিযান শুরু করে।

সংবাদ অনুসারে, ইসরায়েলি নৌ-সেনারা নৌকাগুলোতে করে জল কামান ব্যবহার করে এবং কিছু নৌকার গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করে। এই প্রক্রিয়ায় ফ্লোটিলার শেষ নৌকা ‘মারিনেট’সহ বেশিরভাগ নৌকাকে আটক করা হয়। সব অংশগ্রহণকারীকে গ্রেপ্তার করে ইসরায়েলের আশদোদ বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর (deportation) প্রক্রিয়া শুরু হয়। আটককৃতদের মধ্যে সুইডিশ জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থুনবার্গ বা গ্রেটা থুনবেরি (Greta Thunberg )-এর মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিত্বরাও ছিলেন।

গাজামুখী আন্তর্জাতিক মিশন ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’র অন্যতম জাহাজ ‘কনশানস’-এ রয়েছেন বাংলাদেশের আলোকচিত্রী ও দৃকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল আলম। দমন-পীড়ন কখনো জনগণের শক্তিকে পরাজিত করতে পারেনি, ইসরায়েলও পারবে না, মুক্ত হবে ফিলিস্তিন।’ বর্তমানে কনশানস নৌযানটিতে ২৫টি দেশের সাংবাদিক ও চিকিৎসক আছেন, যারা গাজার মানবিক সংকট ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে একযোগে এগিয়ে চলেছেন।

‘মিকেনো’ নৌকার রহস্য

ফ্লোটিলার একটি ছোট নৌকা ‘মিকেনো’কে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ওঠে। সংগঠকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি ইসরায়েলি অবরোধ এড়িয়ে গাজার আঞ্চলিক জলসীমায় (territorial waters) প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। এই দাবি যদি সত্যি হয়, তবে এটি অবরোধকে বাস্তবিকভাবে ভেঙে দেওয়ার একটি প্রতীকী বিজয় হিসেবে গণ্য হতে পারত। তবে গাজার উপকূল থেকে সামান্য দূরে এটির ট্র্যাকিং সিগন্যাল হারিয়ে যায় এবং ইসরায়েল দৃঢ়ভাবে দাবি করে যে, কোনো নৌকাই গাজায় পৌঁছাতে পারেনি। ‘মিকেনো’-এর চূড়ান্ত পরিণতি এখনো পর্যন্ত অনিশ্চিত এবং এটি পুরো অভিযানের একটি অমীমাংসিত অধ্যায়।

অভিযানের সাফল্য বনাম ব্যর্থতা

ফ্লোটিলার ফলাফলকে শুধু ‘সাফল্য’ বা ‘ব্যর্থতা’র সরল মানদণ্ডে বিচার করা কঠিন। এর ফলস্বরূপ একটি মিশ্র চিত্র উঠে আসে। বিশাল প্রচার ও মনোযোগ : GSF একটি অসাধারণ মিডিয়া কভারেজ (media coverage) অর্জন করে। বিশে^র লাখ লাখ মানুষ গাজার অবরোধ ও মানবিক সংকট সম্পর্কে নতুন করে জানতে পারে। এই বিপুল দৃশ্যমানতা এই অভিযানের সবচেয়ে বড় প্রতীকী সাফল্য।

আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ : ফ্লোটিলা আটক হওয়ার পর বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ইউরোপে (ইতালি, স্পেন, গ্রিস) ব্যাপক বিক্ষোভ এবং প্রতিবাদ শুরু হয়। ইতালির শ্রমিক ইউনিয়নগুলো প্রতিবাদে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়, যা আন্তর্জাতিক সংহতির এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। কলম্বিয়ার মতো কিছু দেশ ইসরায়েলের আচরণের প্রতিবাদে কূটনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়।

কার্যগত ব্যর্থতা : ‘মিকেনো’-এর ব্যতিক্রমী দাবিটি বাদ দিলে, ফ্লোটিলার বেশিরভাগ নৌকাকেই ইসরায়েলি বাহিনী আটক করে। এর অর্থ হলো, কার্যত বা বৃহৎ পরিসরে গাজার নৌ-অবরোধ ভাঙা সম্ভব হয়নি এবং মানবিক সাহায্য সরাসরি পৌঁছানো যায়নি। আটক ও বাধা : কর্মীদের গ্রেপ্তার, নৌকাগুলো আটক করা এবং যোগাযোগে বাধা দেওয়ায় এই অভিযানটি তার মূল উদ্দেশ্য পূরণে সরাসরি ব্যর্থ হয়।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

এই অভিযানটি ইসরায়েলের অবরোধের নৈতিক ও আইনি বৈধতা নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা করেছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন তুলেছে। GSF হয়তো দ্রুত কোনো নীতিগত পরিবর্তন আনতে পারেনি, কিন্তু এটি আন্তর্জাতিক সংহতিকে সুসংহত করে এবং গাজার ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবিকে বিশ্বমঞ্চে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের নাগরিক-নেতৃত্বাধীন উদ্যোগের জন্য এটি একটি নতুন ভিত্তি স্থাপন করে গেল।

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা দেখিয়ে দিয়েছে যে, অহিংস প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক সংহতি, সামরিক শক্তির সামনেও, মানবতা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হতে পারে।

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা বা ফ্রিডম ফ্লোটিলার মতো সামুদ্রিক মানবিক অভিযানগুলোর একটি স্পষ্ট ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, যার নিকটতম গুরুত্বপূর্ণ নজির হলো ২০১০ সালের ‘মাভি মারমারা’ ফ্লোটিলা। তুরস্কের নেতৃত্বে গঠিত সেই প্রথম প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি বাহিনীর আক্রমণে ১০ জন কর্মীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিশ্ব জুড়ে তীব্র নিন্দার জন্ম দেয় এবং মানবাধিকার আন্দোলনের এক মোড় ফেরানো মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়। পরবর্তীকালে, ২০১৬ সালের ‘গাজামুখী নারীদের নৌকা’ এবং অন্যান্য ছোট ছোট অভিযান (২০১২, ২০১৮) এই মানবিক প্রতিরোধের ধারা বজায় রাখে, যদিও তারা গাজায় পৌঁছাতে পারেনি। এই পূর্ববর্তী প্রচেষ্টাগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল শুধু অবরোধ ভাঙা নয়, বরং গাজাবাসীর পক্ষে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও মানবিক অবস্থান ঘোষণা করা। এই প্রেক্ষাপটেই ২০২৫ সালের ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ ইতিহাসে বৃহত্তম ও সবচেয়ে সমন্বিত অহিংস সামুদ্রিক প্রতিরোধ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ২৫টির বেশি দেশ এবং দুই ডজনেরও বেশি নৌযানের এই উদ্যোগে সাংবাদিক, চিকিৎসক ও মানবাধিকার কর্মীরা অংশ নিচ্ছেন, যার মধ্যে বাংলাদেশের শহিদুল আলমও অন্যতম, যা এটিকে একটি বৈশ্বিক শিল্প-রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত করেছে। এই অভিযান শুধু গাজার অবরোধকে চ্যালেঞ্জ করছে না, বরং আন্তর্জাতিক জলসীমায় বহু দেশের মানুষের অংশগ্রহণে মানবতার পক্ষে এক অভূতপূর্ব আন্তর্জাতিক নাগরিক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে, যা ১৯৬০-এর দশকের আমেরিকার মুক্তির যাত্রী আন্দোলন বা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী বয়কট (Anti-Apartheid Boycott) আন্দোলনের মতো ঐতিহাসিক ঐক্যের সমান্তরাল।