আইসিডিডিআর,বি-র একটি গবেষণার প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী মেডিকেল অক্সিজেনের প্রাপ্যতা ও ঘাটতি নিয়ে বিস্তৃত বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত হয়, ‘দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশন অন মেডিকেল অক্সিজেন সিকিউরিটি’। ১৮ জন সদস্য বিশিষ্ট এই কমিশনটি তৈরি হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চিকিৎসা, অর্থনীতি, প্রকৌশল, মহামারীবিদ্যা ও জনস্বাস্থ্য নীতির মতো নানা বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে। এই কমিশন বিশ্বব্যাপী মেডিকেল অক্সিজেনের প্রাপ্যতা ও ঘাটতি নিয়ে বিস্তৃত বিশ্লেষণ করেছে। এই কমিশনের মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মাঝে বিরাজমান অক্সিজেনের বৈষম্যতা রোধ করে এর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, যেন ভবিষ্যতে কেউ অক্সিজেনের অভাবে মারা না যায়। এমনকি কোভিড-১৯ এর মতো জরুরি স্বাস্থ্য সংকটেও নয় সে লক্ষ্যেই এই সুপারিশ । প্রথমবারের মতো ল্যানসেটের কোন কমিশনে কো-চেয়ার হিসেবে রয়েছেন আইসিডিডিআর,বি-র সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ড. শামস এল আরেফিন। সেইসাথে নির্বাহী সদস্য হিসেবে রয়েছেন আইসিডিডিআর,বি-র আরেক বিজ্ঞানী ড. আহমেদ এহসানূর রহমান।
মেডিকেল অক্সিজেন একটি অপরিহার্য ঔষধ, যা গত দেড় শতাব্দীর বেশি সময় ধরে চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে। এটি একটি অত্যাবশ্যকীয় সেবা, যা স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি স্তরেই প্রয়োজন। সঠিক সময়ে অক্সিজেন পাওয়া না গেলে মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে, আর তা হতে পারে বিশ্বের যেকোনো বয়সের, যেকোনো দেশের মানুষের ক্ষেত্রে। কিন্তু জীবন বাঁচানোর এই অপরিহার্য উপাদানটি এখনো সহজলভ্য করে তোলা যায় নি এবং এর প্রাপ্যতায় বৈষম্য প্রকট। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ সংকট প্রবল। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে আইসিডিডিআর,বি রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের রূপসী বাংলা গ্র্যান্ড বলরুমে আয়োজন করে বাংলাদেশ অক্সিজেন সামিট ২০২৫। যার শিরোনাম ছিল ‘ন্যাশনাল রোডম্যাপ টু সেইফ, অ্যাফর্ডেবল অ্যান্ড রিলেবল মেডিকেল অক্সিজেন ফর অল’। অর্থাৎ সবার জন্য নিরাপদ ও সহজে পাওয়া যায় এমন মেডিকেল অক্সিজেন নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা।
বাংলাদেশ অক্সিজেন সামিটে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী) প্রফেসর ডা. মো. সায়েদুর রহমান। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন আইসিডিডিআর,বি-এর জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী (ইমেরিটাস) ও ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশনের কমিশনার ড. শামস এল আরেফিন।
সামিটে বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৩৭৪ মিলিয়ন মানুষের একিউট মেডিকেল কন্ডিশনে ও অস্ত্রোপচারের সময় অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। যার জন্য প্রতি বছর বিশ্বে ন্যূনতম ১.২ বিলিয়ন কিউবিক মিটার মেডিকেল অক্সিজেনের দরকার হয়। এদের মধ্যে যাদের মেডিকেল অক্সিজেনের দরকার হয় তাদের মধ্যে প্রায় ৩০৬ মিলিয়ন বা ৮২ শতাংশ মানুষ-ই বসবাস করেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। তাৎক্ষণিক বা জরুরি প্রয়োজন (যেমন- অ্যাজমা, অ্যানিমিয়া, ডায়েরিয়া ইত্যাদি ) ও অস্ত্রোপচারের সময় বিপুল পরিমাণ মেডিকেল অক্সিজেন দরকার হয় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। সে হিসেবে বাংলাদেশেও অক্সিজেনের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান বিদ্যমান, বিশেষ করে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে যেমন জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে। এছাড়াও, জরুরি পরিস্থিতিতে অক্সিজেনের চাহিদা অনেক বৃদ্ধি পায়, যেমন কোভিড-১৯ এর সময় রোগিদের জন্য অতিরিক্ত মেডিকেল অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়, যা অনেক দেশে সংকট তৈরি করে। মেডিকেল অক্সিজেনের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা ও বিনিয়োগ করার সুফল অনেক। কেননা এর মাধ্যমে হাজার হাজার জীবন বাচানো সম্ভব।
বাংলাদেশের মেডিকেল অক্সিজেনের প্রেক্ষিতে আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ সরকার এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের যৌথ অর্থায়নে প্রেশার সুইং অ্যাডজর্পশন (পিএসএ) এবং ভ্যাকুয়াম সুইং অ্যাডজর্পশন (ভিএসএ) প্ল্যান্ট এবং ভ্যাকুয়াম ইন্সুলেটেড ইভাপরেটর (ভিআইই) ট্যাঙ্ক সহ অত্যাবশ্যকীয় অক্সিজেন অবকাঠামো স্থাপনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে, এই ব্যাপক অগ্রগতি সত্ত্বেও, ১০১টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্থাপিত অক্সিজেন প্ল্যান্ট, ভিআইই ট্যাঙ্ক এবং ম্যানিফোল্ড সিস্টেমের কার্যকারিতা খতিয়ে দেখার জন্য একটি জরিপ করা হয়। এই জরিপে এসকল সিস্টেমের গুরুতর পদ্ধতিগত দুর্বলতা উঠে এসেছে। এই দুর্বলতা রোগীর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
আইসিডিডিআর,বি-র একটি গবেষণায় জানা যায়, দেশে অক্সিজেন ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণে দুর্বলতা রয়ে গেছে। প্রশিক্ষিত বায়োমেডিক্যাল কর্মী বা ইঞ্জিনিয়ারের অভাবে এবং অনিয়মিত প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণের কারণে স্থাপিত অনেক পিএসএ প্ল্যান্ট অব্যবহৃত বা অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে, ভিআইই ট্যাঙ্কগুলি রিফিলিংয়ে ঘন ঘন বাধা এবং অপর্যাপ্ত ব্যাকআপ সিস্টেমের কারণে জরুরি চাহিদা বৃদ্ধির সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য নীতি নির্ধারকদের পাঁচটি অগ্রাধিকারের উপর দ্রুত মনোযোগ দিতে হবে। এর মধ্যে প্রধান হলো - বিদ্যমান অন-সাইট প্ল্যান্টের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কর্মী প্রশিক্ষণ ও স্থানীয় বিতরণ নেটওয়ার্ক তৈরি করা; রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিশিয়ানদের ডেডিকেটেড ক্যাডার তৈরি এবং মেরামত কেন্দ্রগুলোকে বিকেন্দ্রীভূত করা; অক্সিজেনকে অপরিহার্য জনস্বাস্থ্য পরিষেবা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া; একটি জাতীয় অক্সিজেন রোডম্যাপ তৈরি করা; এবং একটি স্থিতিস্থাপক মিশ্র-সরবরাহ মডেল তৈরি করা
জরিপের সুপারিশ অনুযায়ী, বিদ্যমান পিএসএ/ভিএসএ প্ল্যান্টগুলোর সক্ষমতা সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে আসার জন্য একটি সুস্পষ্ট এবং সময়াবদ্ধ পর্যায়ক্রমিক কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন। এই কৌশলটি স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে প্ল্যান্টগুলির দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিশ্চিত করবে।
এবারের সামিটে মোট চারটি বৈজ্ঞানিক সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এর মাঝে ছিল মেডিকেল অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা; সরবরাহ ও প্রাপ্যতা; উৎপাদন, নীতি ও বিনিয়োগ; ও গবেষণা ও উদ্ভাবন। প্রতিটি সেশনে দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশন রিপোর্ট অন মেডিকেল অক্সিজেন সিকিউরিটি থেকে প্রাপ্ত একাধিক বিষয়ে তথ্য ও উপাত্ত উপস্থাপন করা হয় এবং তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করেন, এবং সংকট উত্তরণের উপায় নিয়ে কথা বলেন।
সামিটের প্রথম সেশনে মেডিকেল অক্সিজেন নিয়ে দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশন রিপোর্ট অন মেডিকেল অক্সিজেন সিকিউরিটি-এর প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত বৈশ্বিক তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেন আইসিডিডিআর,বি-র বিজ্ঞানী ড. আহমেদ এহসানূর রহমান। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের আকস্মিক শ্বাসকষ্ট, অস্ত্রোপচার ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগের ক্ষেত্রে অক্সিজেন কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বের ৯ মিলিয়ন রোগী দীর্ঘমেয়াদে (যেমন, সিওপিডি রোগে) মেডিকেল অক্সিজেন ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ৮২% মানুষ দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকার মতো অঞ্চলগুলোতে বাস করেন। বিশ্বের অনেক দেশেই মেডিকেল অক্সিজেনের সরবরাহ বেশ অপ্রতুল। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে শুধুমাত্র ৩০% রোগী জরুরি মেডিকেল অক্সিজেন পান। সাব-সাহারান আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। এসব দেশের হাসপাতালে অক্সিজেন সরঞ্জামেরও অপ্রতুলতা রয়েছে। সাধারণ হাসপাতালে মাত্র ৫৪% ক্ষেত্রে পালস অক্সিমিটার ও ৫৮% ক্ষেত্রে অক্সিজেন পাওয়া যায়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এগুলো প্রায় নেই বললেই চলে। অনেক সময় অক্সিজেন থাকলেও তা ঠিকমতো ব্যবহার হয় না। অনেক রোগীর অক্সিজেন প্রয়োজন হলেও তারা তা পান না।
উপস্থাপনা শেষে আলোচনায় অংশ নেন, ড. জাকারিয়া আল আজিজ , শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা, প্রফেসর ডা রফিকুস সালেহীন, ডা কাজী সালাউদ্দিন বেন্নূর। বক্তারা স্বাস্থ্যসেবা খাতে ক্লিনিক্যাল সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেন। তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের পালস অক্সিমিটারের মাধ্যমে রোগীর অক্সিজেন স্যাচুরেশন সঠিকভাবে মূল্যায়ন এবং গুরুতর অসুস্থ শিশুদের দ্রুত ও কার্যকরভাবে অক্সিজেন সরবরাহের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ নিতে হবে। পাশাপাশি, দেশের সব স্তরের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে অক্সিজেন ও সংশ্লিষ্ট সরবরাহ ব্যবস্থার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে, যেন প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর ঘটনা রোধ করা যায়।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী) প্রফেসর ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে অক্সিজেন উৎপাদনের জন্য ২৯ টি পিএসএ প্ল্যান্ট কার্যকর রয়েছে তবে এখনো ৭০ টি নন-ফাংশনাল বা অকার্যকর অবস্থায় আছে। এগুলো চালু করা দরকার এবং রিলোকেট করাও প্রয়োজন আছে। আমরা একটি ‘ন্যাশনাল অক্সিজেন নেটওয়ার্ক’ দাড় করানোর চেষ্টা করছি। অক্সিজেন অ্যাক্সেসের ক্ষেত্রে এখনো গ্যাপ আছে কিন্তু আমরা এ নিয়ে কাজ করছি। বর্তমান সরকার অক্সিজেনকে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ’ হিসেবে ঘোষণা করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে মেডিকেল অক্সিজেনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন অনেকটা জাতীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত। একটা স্বাধীন দেশ হিসেবে আমরা তখনই গর্ব করতে পারবো যখন আমরা প্রত্যেক নাগরিকের কাছে অক্সিজেন পৌছে দিতে পারবো।’
এই সেশনে সভাপতিত্ব করেন, আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘মেডিকেল অক্সিজেনের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে আমরা হাজার হাজার জীবন বাঁচাতে সক্ষম হবো। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে আমরা অক্সিজেন উৎপাদনে অনেকখানি এগিয়েছি। তবে তা পর্যাপ্ত না। মানুষের দীর্ঘ মেয়াদী অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা দিনদিন বাড়ছে। সরকারের পাশাপাশি আমাদের সবার একযোগে কাজ করার মধ্যদিয়ে এ সমস্যা মোকাবেলা করতে পারি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. আবু জাফর বলেন, ‘অক্সিজেন কেবল একটি পণ্য নয়, এটি একটি পাবলিক সার্ভিস।’ তিনি গবেষণা ও উদ্ভাবনে আইসিডিডিআর,বি-র বিজ্ঞানীদের সাফল্যের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘এসব আবিস্কার ও উদ্ভাবন বিশ্বের স্বাস্থ্য নীতি পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’
‘হোয়াট ইজ দ্য ডেলিভারি ম্যাকানিজম অ্যান্ড হু হ্যাজ অ্যাক্সেস’-শিরোনামে সামিটের দ্বিতীয় সেশনে বাংলাদেশে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিনিধিরা দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। ইউনিসেফ ও ইউএনওপিএস বাংলাদেশে অক্সিজেন উৎপাদন ও বিতরণব্যবস্থা শক্তিশালী করার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে।
দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশন রিপোর্ট অন মেডিকেল অক্সিজেন সিকিউরিটি - এর প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত বৈশ্বিক তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেন ড. শামস এল আরেফিন। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে মেডিকেল অক্সিজেন সেবার কভারেজে বড় ধরনের ঘাটতি ও বৈষম্য বিদ্যমান। এসব দেশে, তীব্র অসুস্থতা বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তায় অক্সিজেন দরকার এমন প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে মাত্র ৮৯ মিলিয়ন অর্থাৎ ৩০% এর কম মানুষই পর্যাপ্ত অক্সিজেন থেরাপি পাচ্ছেন। অর্থাৎ এখনো প্রায় ৭০% মানুষ প্রয়োজনীয় অক্সিজেন চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। এই ঘাটতি এইচআইভি/এইডস (২৩%) এবং যক্ষ্মা (২৫%) চিকিৎসার ঘাটতির তুলনায় অনেক বেশি। তীব্র অসুস্থ রোগীদের মধ্যে অক্সিজেন প্রাপ্যতার দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে সাব সাহারান আফ্রিকা, যেখানে মাত্র ৯% (১.৮ মিলিয়ন) মানুষ অক্সিজেন পাচ্ছেন, যদিও প্রয়োজন রয়েছে ২০.৬ মিলিয়ন মানুষের। এরপর রয়েছে দক্ষিণ এশিয়া-এখানে ৩২.১ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে মাত্র ২২% (৭ মিলিয়ন) অক্সিজেন সেবা পাচ্ছেন।
এই সেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডা. মো. মইনুল আহসান, ইঞ্জিনিয়ার নাশিদ রহমান, ইউনিসেফের হেলথ অফিসার ডা পায়ি ফো থান চো, বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. তারিক আরাফাত।
তৃতীয় সেশনে অক্সিজেন উৎপাদন ও বিনিয়োগ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিগণ। কিভাবে বেসরকারি খাত অক্সিজেন উৎপাদনে ভূমিকা রাখতে পারে এ নিয়ে আলোচনা হয় এ সেশনে।
বাংলাদেশ অক্সিজেন সামিট ২০২৫-এর চতুর্থ সেশনে আলোচনা হয় ‘গবেষণা ও উদ্ভাবন’ নিয়ে। স্বাস্থ্যসেবায় অক্সিজেন সরবরাহ ও ব্যবহারের টেকসই সমাধান বের করতে এসব স্থানীয় উদ্ভাবন ও গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা সামনে এসেছে। সেশনে একাধিক প্রযুক্তি উপস্থাপন করা হয়। এখানে উঠে এসছে বাবল সিপ্যাপ এর মতো উদ্ভাবনের বিষয়ে, যা ২ ডলারেরও কম খরচে তৈরি করা যায়।শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত নবজাতক ও শিশুদের জন্য এটি বিশেষ কার্যকর। এসেছে, অক্সিজেট ডিভাইস যা বিদ্যুৎ ছাড়াই ব্যবহারযোগ্য একটি সিপ্যাপ ব্যবস্থা। উঠে এসেছে বুয়েটের বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৈরিকৃত ‘নিশ্বাস’ ভেন্টিলেটর এবং স্বল্পমূল্যের অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর।
বাংলাদেশ অক্সিজেন সামিট ২০২৫ সমাপ্ত হয়েছে সবার জন্য ন্যায্য ও সমঅধিকারভিত্তিক মেডিকেল অক্সিজেন প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার একটি সম্মিলিত আহ্বানের মাধ্যমে। আলোচনায় বক্তারা তুলে ধরেন যে, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মেডিকেল অক্সিজেনের প্রাপ্যতা শুধু স্বাস্থ্যসেবার বিষয় নয়, এটি মানবাধিকার ও জাতীয় প্রস্তুতিরও অংশ।