২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় নতুন করে নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। দুই বছর হতে চলল, গাজায় নিহতের সংখ্যা এরই মধ্যে ৬৫ হাজার ছাড়িয়েছে। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ উপত্যকাটির ২১ লাখ বাসিন্দার প্রায় সবাই একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সম্প্রতি গাজার বৃহত্তম শহর গাজা নগরীতে সর্বাত্মক হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। উদ্দেশ্য জনবহুল এই নগরী, পুরোপুরি খালি করে দখলে নেওয়া। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধ ও জাগিত নিধন বন্ধে ইসরায়েলকে বাধ্য করতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, চাপ আরও বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি। এ পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যের মধ্যে ১৫১টি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যার মধ্যে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন ও মধ্য আমেরিকার দেশই বেশি। গত ২৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগাল এবং কানাডাও একই সিদ্ধান্ত নেয়। গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের আগেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এ ছাড়া ফ্রান্স এবং বেলজিয়াম ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী তার ঘোষণায় বলেন, ‘ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের শান্তির জন্য দ্বিরাষ্ট্র সমাধান পুনরুজ্জীবিত করতে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।’ লন্ডন থেকে রাজনৈতিক বার্তা এসেছে ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েল উভয়ের জন্যই ন্যায্য এবং স্থায়ী শান্তি অর্জন করা সম্ভব।
হামাসের হামলার পর থেকে যুক্তরাজ্য সরকার কোনো আপত্তি ছাড়াই গাজায় ইসরায়েলের পদক্ষেপকে সমর্থন করে আসছে। ঋষি সুনাকের নেতৃত্বে তৎকালীন রক্ষণশীল প্রশাসন এবং ২০২৪ সালের জুলাই থেকে স্টারমারের নেতৃত্বে লেবার সরকার উভয়ই ইসরায়েল সরকারকে সমর্থন করেছে। তারা আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক আইন এবং শক্তি প্রয়োগের আনুপাতিক নীতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে। তারা যেকোনো বিবেচনার চেয়ে ইসরায়েলের বর্ণনা এবং আত্মরক্ষার দাবির অধিকারের প্রতি জোর দিয়েছিল। ইসরায়েলের অভিযানে জাতিসংঘ এবং অন্যান্য মানবিক সংস্থার সাংবাদিক এবং কর্মীদের হত্যা করা হয়েছে। গাজার ভেতরে জনগণকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে। গাজায় মানবিক সাহায্য সরবরাহে বাধা, খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষুধার্ত মানুষকে নির্বিচারে হত্যা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পরও যুক্তরাজ্য সরকারকে তার ভয়াবহ অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। গাজায় সংঘটিত গণহত্যার অপরাধ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় এবং যুদ্ধাপরাধের জন্য ইসরায়েলের শীর্ষ নেতাদের অভিযুক্ত করায় ব্রিটেন সরকারের হিসাব-নিকাশে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জোরালো ভিত্তি রয়েছে। এরপর ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের জন্য প্রশংসা করতে হয়। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতিতে অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডা যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যোগ দিয়েছে; যা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলমান সম্পর্কের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে যুক্তরাজ্যের এ সিদ্ধান্ত বিশ্বের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দশকেরও বেশি সময় আগে, ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনকে বাগদাদে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে অনুমোদনের জন্য জাতিসংঘের প্রস্তাবের পথ অনুসরণ করতে রাজি করান। সে পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়। তারপর যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য স্নায়ুযুদ্ধ চালিয়ে যায়। অবশেষে যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
নেতানিয়াহু সরকারের জন্য এটি অত্যন্ত বিরক্তিকর একটি সিদ্ধান্ত মনে হয়েছে। কারণ ইসরায়েলপন্থি যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এখনো ওয়াশিংটনে রয়েছে। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাজ্যের ভূমিকা এবং স্বার্থকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে: তা হলো ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপ ও বিতর্কিত অবস্থানে ব্রিটেনের ভূমিকা নিতে হবে। ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্যশুল্ক প্রয়োগের বিষয়টিও ব্রিটেনকে ভাবিয়ে তুলেছে, এবং চীনের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেখানে বেইজিংয়ের রূপরেখায় সমান্তরাল বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে ভাবনা। ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে একত্রে তাদের কাজে এগিয়ে যাওয়া। গত ১ সেপ্টেম্বর চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলন তারই প্রতীক বহন করে। প্রথমটি যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সমস্যাগুলো নিজেরাই সমাধানের চেষ্টা করছে। পাশাপাশি, কয়েক দশক ধরে চলা ট্রান্স-আটলান্টিক জোটের সম্পর্কেও ব্রিটেনকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়ান আক্রমণের বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সাহায্য করার প্রচেষ্টা রয়েছে ব্রিটেনের। ইউরোপে নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে ভাবতে হচ্ছে। কারণ ইউরোপ মহাদেশের প্রতিরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি অনিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে। চীন বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্কে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ইউরোপীয় অর্থনীতির জন্য চীন একটা বিশাল বাজার।
ব্রিকস এবং এসসিও সদস্যরা যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ার চেষ্টা করছে, তা ফেলে দেওয়া যাবে না। ইউরোপের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশ অর্থাৎ চীনের সঙ্গে বিকল্প সম্পর্ক যা ইউরোপের যে কোনো মূল্যে এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ চীন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে ইউরোপ যে ব্যবসা হারাবে তা যুক্তরাষ্ট্র কখনোই পূরণ করতে পারবে না। এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্য এবং ইইউ ট্রাম্প প্রশাসনকে বিরক্ত না করার ব্যাপারে বেশ মনোযোগী। কিন্তু একইভাবে চীনের সঙ্গে প্রকাশ্যে সম্পর্ক ছিন্ন না করার ব্যাপারেও সতর্ক। এখনই সময় যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশক ধরে চলা সম্পর্কের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের সুবিধাগুলোর ব্যাপারে সচেতন হওয়া।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক
raihan567@yahoo.com