পুষ্টি নিরাপত্তার কেন্দ্রে ‘ডিম’

নিত্যপণ্যের বাজার এখন উচ্চমূল্যের। চাল, তেল, মাছ, গরুর মাংস থেকে শুরু করে সবকিছুর দামই চড়া। এ অবস্থায় নিম্ন আয়ের মানুষের বড় আস্থার জায়গা এখন ডিমে। ডিম শুধু নিম্ন আয়ের মানুষের জন্যই নয়, সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্যই এখন সস্তা প্রোটিনের বড় ভিত্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। পোলট্রি খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশে ডিম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই ভূমিকা রাখার পেছনের অবদান সারা দেশের ছোট-বড় উদ্যোক্তাদের। নানা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও এই ব্যবসায় টিকে রয়েছেন এবং ডিমের সরবরাহ ব্যবস্থাকে একটি স্থিতিশীলতার বলয়ে রেখেছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে শাকসবজির দাম বেড়ে গেলে তখন ডিমের চাহিদা বেড়ে যায়। বর্তমানে বাজারে আলু আর পেঁপে ছাড়া ১০০ টাকার কমে সবজি মেলা ভার। প্রতিবছরই এ সময়টায় সবজির দাম চড়লেও এবার তা আরও একটু বেশি চড়া। এ অবস্থায় কয়েক মাস ধরেই স্থিতিশীল রয়েছে ব্রয়লার মুরগির ডিম। প্রতি ডজন ব্রয়লার মুরগির ডিম এখন ঢাকায় বাজারভেদে ১৩৫-১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সে হিসেবে প্রতিটি ডিম ১১.২৫-১১.৬৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদিও সরকারি হিসাবে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচই রয়েছে সাড়ে ১০ টাকা।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, যে খামারিরা সারা দেশে ডিমের স্থিতিশীল সরবরাহ ধরে রাখতে কাজ করছেন, তারাই অনেক সময় ঠিকঠাক দাম পান না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করতে হয়। তবে এখন পরিস্থিতি একটু উন্নতির দিকে। খামারিরা বলছেন, বাজারে ডিমের দামটা একটু সহনীয় পর্যায়ে থাকায় ভোক্তা, খামারি উভয়েই ভালো অবস্থানে রয়েছেন। গাজীপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের খামারিরা বলছেন, প্রতিটি ডিম এখন পাইকারিতে ১০.২০-১০.৬০ টাকার মধ্যে বিক্রি করছেন।

জানতে চাইলে ভালুকার খামারি আমিনুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বছরের শুরুর দিকে দাম একেবারেই কম ছিল। এখন কিছুটা ভালো।’ তিনি বলেন, ‘ডিমের যে মুরগি, সেগুলো একটা নির্দিষ্ট সময় থেকে ডিম দেওয়া শুরু করে। ডিম দেওয়ারও একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে। এখানে লোকসান হলেও উৎপাদন বন্ধ করার সুযোগ থাকে না। যে কারণে সরকারকে খামারিদের দিকে খেয়াল রাখা উচিত, যাতে করে ডিমের বাজারটা একটি জায়গায় স্থিতিশীল থাকে। দাম পড়ে গেলে ক্রেতার লাভ হয়; কিন্তু উৎপাদনকারী ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশ এগ প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি তাহের আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ‘ডিম উৎপাদন বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু খামারিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ফিডের দাম অনেক বেশি, এ কারণে অনেকে ছিটকে পড়ছেন। এ খাতে অনেক কর্মসংস্থান রয়েছে। সরকারের নীতি সহায়তা ছাড়া খামারিরা টিকে থাকতে পারবেন না।’

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় ডিম একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সে হিসেবে এ খাতের খামারিদের সুরক্ষায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। যে কারণে খামারিরা ক্ষতির মুখে পড়ে এবং উৎপাদনবিমুখ হয়, যা মাঝেমধ্যে সরবরাহ পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। এই পরিস্থিতি সামলানোর জন্য প্রথমেই মুরগির খাদ্যে নজর দেওয়ার দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা। গবেষণা করে ফিডের দাম কমানো গেলে প্রোটিনের এই সহজ উৎসকে আরও বেশি সস্তা করা সম্ভব।

১০ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে ডিমের উৎপাদন

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর প্রতিবছর ডিমের উৎপাদনের তথ্য প্রকাশ করে থাকে। সংস্থাটির সবশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছর জুড়ে ২ হাজার ৪৪০ কোটি পিসের বেশি ডিম উৎপাদন হয়েছে। প্রতিদিন বাংলাদেশে প্রায় চার কোটি পিস ডিম উৎপাদন হচ্ছে। যেটি ১০ বছর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ১৯১ কোটি পিস।

ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দাম সহনীয় হওয়ায় দেশের ডিমের চাহিদাও এখন বেশি। প্রতিটি পরিবারেই ডিম খাওয়ার বিষয়ে বাড়তি সচেতনতা তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিটি মানুষের বছরে ন্যূনতম ১০৪টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, এখন গড়ে প্রতিটি মানুষের জন্য ১৩৭টি ডিমের সহজলভ্য রয়েছে।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিমের এখন বহুবিধ ব্যবহার রয়েছে। এ কারণে প্রতিনিয়তই চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডিমের সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩১ সাল নাগাদ ডিমের মাথাপিছু ভোগ ১৬৫টি এবং ২০৪১ সাল নাগাদ ২০৮টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া রয়েছে।

এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলাদেশে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডিম দিবস। দেশের পোলট্রি খাতের বৃহৎ উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিপিআইসিসি এবং ওয়াপসা-বাংলাদেশ শাখার যৌথ আয়োজনে আজ বিশ্ব-ডিম দিবস-২০২৫ উদযাপন করা হবে।

১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত আইইসি ভিয়েনা কনফারেন্স থেকেই এই ডিম দিবস পালন করা হচ্ছে। এই দিবসকে ঘিরে বিশ্বব্যাপী চলছে একটি ইতিবাচক ক্যাম্পেইন। যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে ডিমের প্রয়োজনীয়তার বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবছর অক্টোবরের দ্বিতীয় শুক্রবারে বিশ্ব জুড়ে উদযাপিত হয় ‘বিশ্ব ডিম দিবস’।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিমকে বলা হয়ে থাকে পরিপূর্ণ খাদ্য। সারা পৃথিবীতে মাত্র কয়েকটি খাদ্যকে সুপার ফুড হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়, যার মধ্যে ডিম অন্যতম। ভিটামিন ও মিনারেলে সমৃদ্ধ এমন একটি প্রাকৃতিক আদর্শ খাবার পৃথিবীতে খুব কমই আছে। বাজারে এখন বিভিন্ন ধরনের ভ্যালু-অ্যাডেড ডিম পাওয়া যাচ্ছে, যেমন ওমেগা-থ্রি ডিম, কিডস এড, সেলেনিয়াম-সমৃদ্ধ ডিম, ফোলেট এগ ইত্যাদি। কয়েক বছর আগে জাপানের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এআইএসটি) গবেষকরা এমন একটি মুরগির জাত উদ্ভাবন করেছেন যে মুরগির ডিম ক্যানসার প্রতিরোধে সক্ষম হবে। 

বড় করপোরেটরাও এখন নিরাপদ ডিম উৎপাদনে

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ডিমের বাজার ছিল প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার। যেটি ২০২৪-২৫ সালে এসে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায় বলে জানা গেছে। এই যে ডিমের বেশি উৎপাদন এবং বড় বাজার তৈরি হয়েছে, এখানে ছোট ছোট খামারির সঙ্গে বড় একটি হিস্যা রয়েছে করপোরেট উৎপাদনকারীদের। এর জন্য বড় এসব উৎপাদনকারী হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, বাজারে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ২০ শতাংশের আশপাশে।

জানা গেছে, কাজী ফার্মস, ডায়মন্ড এগ, প্যারাগন পোলট্রি, নর্থ এগ, সিপি বাংলাদেশ, আফিল এগ্রো, পিপলস পোলট্রি, নবিল এগ্রো, ভিআইপি শাহাদত, রানা পোলট্রি, ওয়েস্টার পোলট্রিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে উৎপাদনের শীর্ষে। এর মধ্যে কিছু কোম্পানি রয়েছে, যাদের দৈনিক ডিম উৎপাদন ১৫ লাখ পিসের কাছাকাছি। অনেকগুলো কোম্পানি প্রতিদিন প্রায় ৪-৫ লাখ পিস ডিম উৎপাদন করছে।

এর মধ্যে এখন সাধারণ ডিমের পাশাপাশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ওমেগা-থ্রি ডিম, কিডস এড, সেলেনিয়ামসমৃদ্ধ ডিম, ফোলেট এগ।

এ নিয়ে অবশ্য সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও মানুষের মধ্যে একটা ধারণা রয়েছে যে, ডিমের বাজারে বিভিন্ন সময় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সিন্ডিকেট তৈরি করে বাড়তি মুনাফা করে। কিন্তু বড় উৎপাদনকারীরা এই অভিযোগ মানতে নারাজ।

কাজী ফার্মসের পরিচালক কাজী জাহিন হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর আন্তর্জাতিক বাজারে মুরগির খাবারের (ফিড) মূল উপাদানগুলোর দাম হঠাৎ করে বেড়ে যায়। এটি দেশের কোনো খাতের নিয়ন্ত্রণে ছিল না না পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রির, না সরকারের।

দ্বিতীয়ত, টাকার মূল্য কমে যায় ডলারের তুলনায়। ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা লাগে ১ ডলার কিনতে। টাকার এই পতনের পেছনে ছিল পূর্ববর্তী সরকারের ভুল অর্থনৈতিক নীতিমালা। তিনি বলেন, যখন সরকার নিজেই বাজারে অতিরিক্ত টাকা ঢুকিয়ে মূল্যস্ফীতি ঘটায়, তখন একে প্রচলিত অর্থে বলা হয়, ‘মানি প্রিন্টিং’ বা কাগজে টাকা ছাপা। কিন্তু সরকার স্বীকার করতে চায়নি যে মূল্যস্ফীতির জন্য তারা দায়ী। তাই তারা কল্পিত কিছু ‘সিন্ডিকেট’ বানিয়ে দোষ চাপাতে শুরু করে বেসরকারি খাতের ঘাড়ে।

করপোরেট ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রতিদিন হাজার হাজার খামারি ডিম আর মুরগি বিক্রি করেন। এত বিক্রেতার বাজারে একজনের পক্ষে দাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এটিই প্রতিযোগিতামূলক বাজারের উদাহরণ। এই বাজারে দাম ওঠানামা করে মৌসুমি চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে। শীতে ডিমের চাহিদা কমে যায়, কারণ মানুষ শীতকালীন শাকসবজির দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর গরমে মুরগি কম ডিম পাড়ে, ফলে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বেড়ে যায়। এই ওঠানামা পোলট্রি খাতের ‘সিন্ডিকেট’ নয়, বরং স্বাভাবিক কৃষিভিত্তিক মৌসুমি পরিবর্তন।

২০২৩ সালে বেশ কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট তৈরির অভিযোগ তুলে মামলা করে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। যে মামলাগুলোর বেশিরভাগেরই বিচারকাজ এখনো চলমান। 