সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ বাঘাবাড়ী নদী বন্দরে আশংকাজনক হারে পণ্যবাহী জাহাজ আসা কমে যাওয়ায় এ বন্দরটি এখন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে দু’একটি জাহাজ ভিড়লেও বন্দরটিতে আগেরমত কর্মচাঞ্চল্য আর নেই। এক সময় প্রায় ৭০০ শ্রমিক এ বন্দরে মাল উঠানামার কাজে নিয়োজিত থাকলেও সেটি এখন কমে দাঁড়িয়েছে একশত থেকে একশত পঞ্চাশ জন। স্বাভাবিক ভাবেই কর্মহীন হয়েছে কয়েকশত শ্রমিক। বন্দরটি হারাচ্ছে তার নিজস্ব ঐতিহ্য। এই বন্দর থেকে বিপুল পরিমাণ সরকারের রাজস্ব আয় হতো। সেটিও এখন কমতে শুরু করেছে। গত অর্থ বছরের তুলনায় চলতি বছরে এক কোটি টাকা রাজস্ব আয় কমার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে বাঘাবাড়ী নৌবন্দরের একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌ-কর্তৃপক্ষ (বি আই ডাব্লিউ টি এ) সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া ইউনিয়নের বাঘাবাড়ী বড়াল নদীর তীরে প্রায় ৩৬ একর জমির উপর ১৯৮৩ সালে এই ২য় শ্রেণির অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরটি স্থাপন করে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বন্দরটি আধুনিকায়ন করে এর সক্ষমতা না বাড়ানোর ফলে বন্দরটিতে অধিক ধারণ ক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে না পারায় বন্দরটি গুরুত্ব হারাচ্ছে। ফলে ক্রমেই বন্দরটিতে পণ্যবাহী জাহাজ কমে আসছে।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিকপর্যায়ে এ বন্দরে ৩টি স্টিল গ্যাংওয়ে, ৩টি কার্গো পল্টুন, এছাড়া বন্দরের অভ্যন্তরে ৬২৫ মিটার পাকা সড়ক, এক হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতার পাকা গোডাউন ১টি স্থাপন, ২ একর ভূমির উপর বিএডিসি খাদ্য গুদাম, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) কে জ্বালানী তেলে ডিপো গড়ে তোলার জন্য ৩.৩৯ একর ভূমি প্রদান, ৭টি সরকারি খাদ্য গুদামের জন্য ৩ একর ও আবহাওয়া অফিসের জন্য ০.৭৬ একর ভূমি (লিজ) প্রদান, বিসিআইসি ৪৫০০ মে. টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন সারের বাফার গুদাম তৈরীর জন্য জায়গা বরাদ্দের মধ্য দিয়ে এ বন্দরের প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয়। বন্দরটির যাত্রা শুরুর পর থেকেই চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর থেকে নদী পথে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় রাসায়নিক সারসহ উত্তরাঞ্চলের শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন পণ্য উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাঘাবাড়ী নদী বন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে যাত্রা শুরু থেকেই।
তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বন্দরটি ১ম শ্রেণিতে রূপান্তরিত ও আধুনিকায়ন করে সক্ষমতা না বাড়ানোর ফলে শিল্প কলকারখানা স্থাপনের জন্য ভারী যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন পণ্যসহ সব ধরনের মালামাল পরিবহনে পিছিয়ে পড়ে। ফলে বন্দরটিতে এখন অচল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে নদীর নাব্যতা সংকট এ বন্দরটির অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে বাঘাবাড়ী নৌবন্দরে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার মো. আলম প্রামাণিক ক্ষোভের সংগে বলেন, এই বন্দরে এক সময় প্রায় হাজারখানেক শ্রমিক দিনরাত কাজ করতো। বর্তমানে জাহাজ না আসায় শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দেড় থেকে ২০০ জন শ্রমিক থাকলেও যে দু একটি বন্দরে জাহাজ ভিড়ছে তার মাল খালাস করে তাদের সংসার চলে না।
এ বন্দরের ইজারাদার মেসার্স সরকার ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী মো. আনিছুর রহমান জানান, মান্ধাতার আমলের হেড লোডে সবধরনের মালামাল জাহাজ থেকে উঠানামা করায় পণ্য পরিবহনকারী ঠিকাদরদের সময় ও অর্থ ব্যয় দুটোই বেড়ে গেছে। ফলে পণ্য পরিবহনে ইজারাদাররা এ বন্দর থেকে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তিনি জানান, বন্দরটি দ্রুত সময়ের মধ্যে ১ম শ্রেণিতে উন্নত করা ও মালামাল উঠানামায় আধুনিক জেটি ও ক্রেনের ব্যবস্থা করা জরুরী হয়ে পরেছে।
তিনি আরো জানান, এবারের ২০২৫ ও ২০২৬ অর্থ বছরের জন্য তাকে তিন কোটি টাকা দিয়ে বাঘাবাড়ী বন্দরটি ইজারা নিতে হয়েছে। বছর শেষে তার বিনিয়োগের টাকা উঠবে কিনা তার সন্দেহ রয়েছে। পরবর্তীতে বিপুল টাকা বিনিয়োগ করে কেউ বন্দরটি ইজারা নেবেন কিনা সন্দেহ রয়েছে। এজন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে বন্দর উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে হবে।
এদিকে বাঘাবাড়ী নৌবন্দরের কর্মকর্তা মো. মাহবুব আলম তায়েফ জানান, এ বন্দর থেকে খালাসকৃত মালামাল উত্তরবঙ্গে ট্রাকযোগে বিভিন্ন জেলায় মালামাল পরিবহনের জন্য এখানে শতশত ট্রাক ভিড় করতো কিন্তু এখন সে দৃশ্য কেবলই স্মৃতি। এদিকে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় দ্রুত সময়ের মধ্যে কম খরচে দেশি-বিদেশি পণ্য আমদানি ও রপ্তানির জন্য বাঘাবাড়ী নৌ বন্দর সবসময়ই গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করছে। তবে এই বন্দরটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে আধুনিকায়ন করে এর সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বন্দরটি আগের জৌলুস ও গুরুত্ব ফিরে পাবে।
তিনি জানান, এরই মধ্যেই বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বাঘাবাড়ী নৌবন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বাড়াতে এ নৌ-বন্দর ঘুরে তারা ফিজিবিলিটি স্টাডি করেছেন। এজন্য একনেকে এই প্রকল্পটির অর্থায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার ফিজিবিলিটি স্টাডি করেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বন্দরটির আধুনিকায়ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।