দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নগরী দামেস্ক। হাজার বছর ধরে এই নগরী ছিল সভ্যতার আঁতুড়ঘর, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রাণকেন্দ্র। ইসলামি স্থাপত্যকলার যে দীপ্তি পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে, তার সূচনা হয় এখানেই। সেই গৌরবের প্রথম প্রতীক উমাইয়া মসজিদ। এটি শুধু মুসলিম বিশ্বের স্থাপত্য গৌরব নয়, মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শনও বটে।

উমাইয়া শাসনামলের স্বর্ণযুগ শুরু হয় এই মসজিদ নির্মাণের মধ্য দিয়ে। এর আসল নাম ‘জামিয়া উমাইয়া মসজিদ আল-কাবির’। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ও প্রাচীন মসজিদগুলোর অন্যতম। উমাইয়া মসজিদটি আকারে আয়তক্ষেত্র। যার আয়তন দৈর্ঘ্যে ৯৭ মিটার (৩১৮ ফুট) এবং প্রস্থে ১৫৬ মিটার (৫১২ ফুট)।

যেখানে এ মসজিদ নির্মিত হয়েছে, সেখানে অতীতে অন্য ধর্মের উপাসনালয় ছিল। প্রথমে এটি জুপিটারদের উপাসনালয় ছিল। তারপর ঈসা (আ.)-এর আবির্ভাবের পর খ্রিস্টানরা এটিকে গির্জা হিসেবে ব্যবহার করত। ৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে মুসলিমরা সিরিয়া জয় করার পর এখানে নামাজ আদায় শুরু করে। এখানেই ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মেহরাব নির্মিত হয়। উমাইয়ার দ্বিতীয় খলিফা মুয়াবিয়ার শাসনামলে এ স্থাপনাটির একাংশ মসজিদে রূপান্তর করা হয়। বাকি অংশ গির্জা হিসেবে রাখা হয়। তারপর ষষ্ঠ খলিফা আল-ওয়ালিদ সিংহাসনে বসার পর এটির সম্পূর্ণ অংশকে মসজিদে রূপান্তর করেন।

১০৬৯ সাল থেকে ১৮৯৩ সালের মধ্যে এতে মোট ছয়বার অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ১৭৫৯ সালের ভূমিকম্পে মসজিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এরপর কয়েক দফা পুনর্নির্মাণ করা হয়। তবে এর আধুনিক রূপ দেন ফারসি ইতিহাসবিদ ইবনে আল-ফকিহ। দশম শতাব্দীর দিকে প্রায় ৬-১০ লাখ দিনার খরচ করে এটি পুনর্নির্মাণ করেন তিনি। প্রায় ১২০০ শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমে এতে ফুটিয়ে তোলা হয় রোমান শৈলী। পরে ১৮৯৩ সালে অগ্নিকাণ্ডের পর কাঠের তৈরি গম্বুজের পরিবর্তে পাথরের গম্বুজ তৈরি করা হয়, যার উচ্চতা ৩৬ মিটার।

মসজিদটি দামেস্কের পুরনো শহরে অবস্থিত। এটি মূলত পাথরের তৈরি। ষষ্ঠ উমাইয়া খলিফা আল-ওয়ালিদের শাসনামলে (৭১৫ সাল) এর মূল নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। মসজিদটি প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুট এলাকার ওপর অবস্থিত। কেন্দ্রে রয়েছে প্রায় ১৮৮ ফুট উঁচু একটি গম্বুজ। মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) কারবালার ময়দানে তার ৭২ জন সঙ্গীসহ শাহাদত বরণের পর বন্দিদের নিয়ে ইয়াজিদ এ মসজিদে আনন্দ উৎসব করে। এর পশ্চিম দিকে রয়েছে প্রবেশদ্বার, যেখানে কারবালা যুদ্ধের সৈনিকদের বন্দি করে রাখা হয়েছিল। দক্ষিণে রয়েছে প্রধান ভবন। এতে রয়েছে চারটি মেহরাব, যেগুলো ইসলাম ধর্মের প্রধান চার মাজহাব (হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি, হাম্বলি) অনুযায়ী নির্মিত। ৫১৫/৩৩০ ফুট আয়তনের বিশাল উঠানঘেরা দেয়ালে পাথরের বিন্যাস ও নিপুণ শৈলী রয়েছে, যা বিভিন্ন সংস্কারের ইতিহাসের সাক্ষী। মসজিদের মূল হলের ওপরের গম্বুজটি ‘ডোম অব ঈগল’ নামে পরিচিত। যার আসল নাম ‘কুব্বাত আন-নিসর’। সাত দরজার এ মসজিদের মূল ফটকের পুরোটাই রোমান নকশা খচিত।

ধর্মীয় দিক দিয়ে এটি মুসলিম ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ। এখানে ঈসা (আ.) তার জীবনের অনেক সময় অতিবাহিত করেছেন। এ ছাড়া আরও অন্যান্য স্মৃতিস্বরূপ এটি মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয়ের কাছে সমাদৃত। এটি সেই বিখ্যাত তিন মিনারের মসজিদ, যার সর্বোচ্চ মিনারের উচ্চতা ৭৭ মিটার। কেয়ামতের আগে ঈসা (আ.) এ মসজিদেই আসমান থেকে অবতরণ করবেন। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন।

লেখক : ইমাম ও মাদ্রাসাশিক্ষক