বাংলাদেশের সর্বনাশের শুরু যেখান থেকে

আফগানিস্তানের কাছে ওয়ানডে সিরিজ হারের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সরাসরি খেলা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করা প্রতিবেদন দেখে, একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। বিশ্বকাপে খেলতে না পারার আশঙ্কা প্রসঙ্গে বিসিবির বক্তব্য হচ্ছে, ‘এখনো ২৬টি ওয়ানডে ম্যাচ রয়েছে বাংলাদেশের সামনে এবং এই ম্যাচগুলোতে ভালো করে বাংলাদেশের সামনে পর্যাপ্ত সুযোগ আছে সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার।’ কোনো সন্দেহ নেই, গাণিতিক হিসেবে এই ২৪টি ম্যাচের প্রতিটিতেই জিতে আইসিসি ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ের ওপরের দিকে থেকে কোনো রকম সংশয় না জাগিয়েই বাংলাদেশের জন্য সরাসরি বিশ্বকাপে খেলা সম্ভব। আবার অঙ্কের হিসেবে সব ম্যাচ হেরে যাওয়াও অসম্ভব নয়। কাগজ-কলমের অঙ্ক বাদ দিয়ে বাস্তবের পৃথিবীতে এলে হিসাবটা হচ্ছে সরাসরি বিশ্বকাপে খেলতে হলে বাংলাদেশকে পাড়ি দিতে হবে কঠিন পথ। সেইসঙ্গে অনেক কিছু ঘটতে হবে বাংলাদেশের পক্ষে। এভাবে ত্রিভুজের দুই বাহু ও এক কোণ মিললেই বিশ্বকাপে সরাসরি খেলাটা সম্ভব হবে বাংলাদেশের।

অক্টোবরের ১৪ থেকে ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ২৪টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ। ৩১ মার্চ ২০২৭ তারিখে আইসিসি র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ আট দল সরাসরি সুযোগ পাবে বিশ্বকাপে। দক্ষিণ আফ্রিকা স্বাগতিক হিসেবে খেলবে, যদি প্রোটিয়ারা শীর্ষ আট দলে থাকে তাহলে নবম দলের মিলবে সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার টিকিট। দক্ষিণ আফ্রিকা আছে ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ের ৬ নম্বরে, খুব খারাপ না খেললে তারা শীর্ষ ৮-এর মধ্যেই থাকবে, আর বাংলাদেশ আছে ১০ নম্বরে। তাই এক ধাপ উত্তীর্ণ হয়ে ২০২৭-এর মার্চ পর্যন্ত অবস্থানটা ধরে রাখলেই বিশ্বকাপ খেলতে পারবে বাংলাদেশ, না হয় খেলতে হবে বাছাইপর্ব এই হচ্ছে সমীকরণ।

আফগান সিরিজের শেষ ম্যাচের পর দেশের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে তিন ওয়ানডে ও পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন ওয়ানডে খেলবে বাংলাদেশ। এরপর তিন ওয়ানডে খেলবে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। জিম্বাবুয়ে ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দুটো সিরিজ পাঁচটি এবং তিনটি ওয়ানডে বাংলাদেশ খেলবে প্রতিপক্ষের মাটিতে। এরপর ভারতের বিপক্ষে সিরিজ দেশের মাটিতে। এই প্রতিপক্ষগুলোর মধ্যে একমাত্র অস্ট্রেলিয়া বাদে বাকি সব দলের বিপক্ষেই সিরিজ জয়ের কৃতিত্ব অতীতে দেখিয়েছে বাংলাদেশ। তাই আশাবাদী হওয়া যায়। আবার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স হতাশা জাগায়, কারণ ২০২৪-এর মার্চের পর কোনো ওয়ানডে সিরিজই জেতেনি বাংলাদেশ, এ বছর সাত ওয়ানডে খেলে মাত্র এক জয়। হিসাবটা সবশেষ ১২ মাসের করলে ১৩ ম্যাচে মাত্র দুই জয়।

২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা বাংলাদেশ, ২০১৭ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেমিফাইনালে খেলা বাংলাদেশ দলের এমন অধঃপতনের শুরুটা দেশের মাটিতে আফগানিস্তান সিরিজে। চট্টগ্রামে আফগানদের সঙ্গে সিরিজের প্রথম ওয়ানডের পর আকস্মিক অবসরের ঘোষণা দেন তামিম ইকবাল। সামনে আসে সে সময়কার কোচ চন্ডিকা হাতুরুসিংহে, বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন এবং তামিমের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব। সাকিব আল হাসানের সঙ্গে তামিমের সম্পর্কে চিড় ধরার ব্যাপারটিও আসে প্রকাশ্যে। এরপর অধিনায়কত্ব নিয়ে চলে মিউজিক্যাল চেয়ার। আফগানদের বিপক্ষে পরের দুই ওয়ানডেতে অধিনায়ক ছিলেন লিটন দাস। এরপর বিশ্বকাপের আগে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড সিরিজে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, বিশ্বকাপে আবার সাকিব অধিনায়ক, শান্ত ছিলেন তার ডেপুটি। ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শান্ত অধিনায়ক, সাকিব দলে সাধারণ সদস্য। সেই বছরের ফেব্রুয়ারিতেই তাকে তিন সংস্করণের অধিনায়ক করে বিসিবি, পরের বছরের মে মাসে লিটন দাসকে করা হয় টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক। জুনে মেহেদী হাসান মিরাজকে করা হয় ওয়ানডে অধিনায়ক। শান্ত যখন শ্রীলঙ্কায় টেস্ট সফরে যাওয়ার আগে সংবাদ সম্মেলন করছেন, তখন তাকে না জানিয়েই মিরাজকে করা হয় ওয়ানডে অধিনায়ক। শান্ত শ্রীলঙ্কা সফরের পর টেস্ট অধিনায়কের দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়ান। এশিয়া কাপে আবার লিটনের অবর্তমানে অধিনায়ক জাকের আলি অনিক। এক বছরের কিছু বেশি সময়ের ভেতর তিন সংস্করণের অধিনায়ক থেকে কোনো সংস্করণেই আর অধিনায়ক নেই শান্ত, টি-টোয়েন্টির দলেও নেই। দলের নেতৃত্ব নিয়ে সার্বিক অস্থিরতা প্রভাব ফেলেছে সার্বিক পারফরম্যান্স এবং পরিকল্পনায়। যে কারণে ২০২৭ বিশ্বকাপ ভাবনায় রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলিকে বাদ দিয়ে আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সফরে শুবমান গিলকেই অধিনায়ক করেছে বিসিসিআই, কারণ কোচ গৌতম গম্ভীর অতিরিক্ত নেতৃত্বের বদল তার দলীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা মনে করেন, সেখানে বাংলাদেশ দলে ঘন ঘন বদল এসেছে নেতৃত্বে। নুরুল হাসান সোহান অতীতে অধিনায়ক ছিলেন, অথচ দলে তার উপস্থিতির পরেও অধিনায়ক জাকের। আরব আমিরাতের বিপক্ষে সিরিজে সহঅধিনায়ক ছিলেন শেখ মেহেদি, অথচ এরপর তাকে আর কোনো ভূমিকাতেই দেখা গেল না।

নেতৃত্বে ঘন ঘন পরিবর্তনের সঙ্গে এক সংস্করণে ভালো করা ক্রিকেটারকে আরেক সংস্করণে খেলিয়ে দেওয়ার দৃষ্টান্ত নিয়মিতই গড়ছেন নির্বাচকরা। এনামুল হক বিজয়কে টেস্ট দলে ফিরিয়ে আনা, নাঈম শেখকে ওয়ানডেতে ফেরানো, টি-টোয়েন্টি দলে নিয়ে চারে ব্যাট করতে পাঠানো, নাহিদ রানাকে একটি টি-টোয়েন্টিতে খেলিয়ে ফের বাইরে রাখা, এমন অনেক ব্যাখ্যাহীন সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছেন। সেইসঙ্গে একাদশ নির্বাচনেও দেখা গেছে উদ্ভট সব সিদ্ধান্ত। একাদশে উইকেটরক্ষক তিনজন, টপ অর্ডারের পর কোনো মিডল অর্ডার নেই, অথচ ফিনিশার রোলে তিনজন! তাসকিন আহমেদ কেন্দ্রীয় চুক্তিতে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত ক্রিকেটার, অথচ তাকে খেলাতে হয় এক ম্যাচ বিশ্রাম দিয়ে দিয়ে। সাকিব অবসর না নিলেও খেলতে পারছেন না জাতীয় দলে, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের অবসরজনিত অনুপস্থিতিতে মিডল অর্ডারে হাল ধরার কেউ নেই। যার প্রমাণ গত এক বছরে বাংলাদেশের একজন মাত্র ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করেছেন, সবশেষ ১৩ ম্যাচের ৮ ম্যাচে বাংলাদেশ ৫০ ওভার পুরোটা ব্যাটিংই করতে পারেনি, অলআউট হয়ে গেছে তার আগেই। এই পরিসংখ্যান ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতোই।

দলের ভেতর নেতৃত্ব নিয়ে অস্থিরতা, দিনের পর দিন গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহের সময় প্রিমিয়ার লিগের আয়োজন, বিদেশি ক্রিকেটার খেলানো বন্ধ রাখা এবং বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত দলে সব তারকাদের ঠাঁই পাওয়ার কারণে লিগটা একপেশে হয়ে পড়া, সব কিছুর যোগফল হচ্ছে ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ের দশে নেমে আসা এবং আফগানদের কাছে সিরিজ হারের হ্যাটট্রিক করা। বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতিতে ৫০ ওভারের ক্রিকেটই ছিল মেরুদ-, নামি বিদেশি ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ঢাকা লিগ খেলেই বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েছিল বাংলাদেশ। গোষ্ঠীস্বার্থের নীলনকশায় সেই ঢাকা লিগই যখন স্রেফ নির্বাচনে জিতে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার, তখন এমন পরিণতি অনেকটাই অবধারিত।