নারীরা স্বামীর পাঁজরের হাড় দিয়ে তৈরি ইসলাম কী বলে

প্রচলিত আছে প্রত্যেক স্ত্রীকেই তার স্বামীর পাঁজরের হাড় থেকে তৈরি করা হয়েছে। তাহলে যে সব নারীর বিয়ে হয়নি কিংবা যে নারীর একাধিক বিয়ে হয় তাদের ক্ষেত্রে এর হুকুম কী কোন স্বামীর হাড় থেকে তাদের তৈরি করা হয়েছে? উত্তর: না, প্রত্যেক স্ত্রীকে তার স্বামীর পাঁজরের হাড় থেকে তৈরি করা হয়েছে এমন কোনো কথা কুরআন বা হাদিসে নেই।

তবে হাদিসের মধ্যে যেটা আছে সেটা হলো, পৃথিবীর প্রথম নারী হাওয়াকে আদমের বাম পাঁজরের হাড় থেকে আল্লাহতায়ালা সৃষ্টি করেছেন। শুধু মাত্র ওনাকেই আর কেউকে না।

প্রথমে এ সংক্রান্ত হাদীসটি হলো

ﻋَﻦْ ﺃَﺑِﻲ ﻫُﺮَﻳْﺮَﺓَ، ﻗَﺎﻝَ : ﻗَﺎﻝَ ﺭَﺳُﻮﻝُ ﺍﻟﻠﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ : ‏« ﺇِﻥَّ ﺍﻟْﻤَﺮْﺃَﺓَ ﺧُﻠِﻘَﺖْ ﻣِﻦْ ﺿِﻠَﻊٍ ﻟَﻦْ ﺗَﺴْﺘَﻘِﻴﻢَ ﻟَﻚَ ﻋَﻠَﻰ ﻃَﺮِﻳﻘَﺔٍ، ﻓَﺈِﻥِ ﺍﺳْﺘَﻤْﺘَﻌْﺖَ ﺑِﻬَﺎ ﺍﺳْﺘَﻤْﺘَﻌْﺖَ ﺑِﻬَﺎ ﻭَﺑِﻬَﺎ ﻋِﻮَﺝٌ، ﻭَﺇِﻥْ ﺫَﻫَﺒْﺖَ ﺗُﻘِﻴﻤُﻬَﺎ، ﻛَﺴَﺮْﺗَﻬَﺎ ﻭَﻛَﺴْﺮُﻫَﺎ ﻃَﻠَﺎﻗُﻬَﺎ

হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, নারীকে পাঁজরের হাড় দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। সে তোমার জন্য কখনোই সোজা হবে না। তার দ্বারা কাজ আদায় করতে হলে এই বাঁকা অবস্থায়ই আদায় করতে হবে। এটি সোজা করতে গেলে ভেঙে যাবে। ভাঙার অর্থ হলো তালাক ঘটে যাওয়া। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৬৮]

হাদীসে নারীদের পাজরের হাড় দ্বারা তৈরির কথা এসেছে। কিন্তু কার পাজরের হাড় দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে? তা হাদীসে বর্ণিত হয়নি। সুতরাং না বুঝার কারণে অনেকে মনে করেন, স্বামীর পাজরের হাড় দিয়ে স্ত্রীকে তৈরি করা হয়েছে। একথাটি সম্পূর্ণ ভুল। একথায় এর কথার কোনো ভিত্তি নেই। তবে হ্যাঁ, হযরত হাওয়া আলাইহিস সালামকে হযরত আদম আ.এর পাজরের হাড় দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। একথা সত্য। কিন্তু এর মানে সকল স্ত্রীলোককে তার স্বামীর পাজরের হাড় দিয়ে তৈরি করার দাবিটি অযৌক্তিক ও বানোয়াট। তাছাড়া এর পক্ষে কোন দলীল নেই। দ্বিতীয়ত এটি যুক্তিহীন কথা। কারণ, যে সকল মেয়ে বাচ্চা শিশুকালেই মারা গেছে, বা বিবাহ ছাড়াই মারা গেছে, তাদের কার হাড় দিয়ে তৈরি করা হল? তাদেরতো স্বামীই ছিল না দুনিয়াতে। তাহলে?

সুতরাং স্বামীর পাজরের হাড় দিয়ে তৈরী করা হয়েছে স্ত্রীদের এ দাবীটিই যেহেতু ভুল। তাই আপনার উপরোক্ত প্রশ্নেরই আর কোন যৌক্তিকতা বাকি থাকে না।

হাদীসটির ব্যাখ্যা কী?

হাদীসে যে পাজরের হাড় দিয়ে তৈরির যে কথা বলা হয়েছে। এর দ্বারা দু’টি উদ্দেশ্য হতে পারে। যথা-

১. এটি কেবলি একটি উপমা। সত্যিই পাজরের হাড় দ্বারা তৈরী হওয়া উদ্দেশ্য নয়। নারীদের একটি সৌন্দর্য হল, তারা সাধারণতঃ একটু কথায় আচরণে বাঁকা স্বভাবের হয়ে থাকে। এটি সর্বক্ষেত্রে তাদের দোষ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই সৌন্দর্য।

২. নারীরা বাবা আদম আ. এর পাজরের হাড় দ্বারা তৈরি। স্বামীর পাজরের হাড় দ্বারা নয়। [তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম-১/১৩৭-১৩৮]

ﻗﻮﻟﻪ : ‏« ﺧُﻠِﻘَﺖ ﻣِﻦ ﺿِﻠﻊ ‏» ﻫﺬﺍ ﻳﺤﺘﻤﻞ ﺃﻥ ﻳﻜﻮﻥ ﺗﺸﺒﻴﻬﺎ، ﻭﻳﺆﻳﺪﻩ ﻣﺎ ﻣﺮ ﻓﻲ ﺍﻟﺮﻭﺍﻳﺔ ﺍﻟﺴﺎﺑﻘﺔ ﻣﻦ ﺍﻟﺘﺼﺮﻳﺢ

আবু হুরায়রা সূত্রে ইমাম বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

ﺍﻟْﻴُﺴْﺮَﻯ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻞ ﺃَﻥْ ﻳَﺪْﺧُﻞ ﺍﻟْﺠَﻨَّﺔ ، ﻭَﺟُﻌِﻞَ ﻣَﻜَﺎﻧﻪ ﻟَﺤْﻢ

জান্নাতে প্রবেশ করানোর পূর্বে বাম পাঁজর থেকে (তাকে সৃষ্টি করা হয়), অতঃপর তার জায়গায় গোস্ত তৈরি করা হয়। বুখারি: (৩৩৩১), মুসলিম: (১৪৭০), ফাতহুল বারি: (৬/৩৬৮)

তাহলে কি প্রতিটি পুরুষের স্ত্রীকে তাদের পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। নাকি শুধু হাওয়া (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয়েছিল।

সূরা আন নিসা'র ১নং আয়াতে আল্লাহপাক উল্লেখ করেছেন:

ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟﻨَّﺎﺱُ ﺍﺗَّﻘُﻮﺍْ ﺭَﺑَّﻜُﻢُ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺧَﻠَﻘَﻜُﻢ ﻣِّﻦ ﻧَّﻔْﺲٍ ﻭَﺍﺣِﺪَﺓٍ ﻭَﺧَﻠَﻖَ ﻣِﻨْﻬَﺎ ﺯَﻭْﺟَﻬَﺎ ﻭَﺑَﺚَّ ﻣِﻨْﻬُﻤَﺎ ﺭِﺟَﺎﻻً ﻛَﺜِﻴﺮًﺍ ﻭَﻧِﺴَﺎﺀ ﻭَﺍﺗَّﻘُﻮﺍْ ﺍﻟﻠّﻪَ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺗَﺴَﺎﺀﻟُﻮﻥَ ﺑِﻪِ ﻭَﺍﻷَﺭْﺣَﺎﻡَ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠّﻪَ ﻛَﺎﻥَ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﺭَﻗِﻴﺒًﺎ

হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন ; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী । আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞ্ঝা করে থাক এবং আত্নীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন।

আবার অন্য এক জায়গায় আল্লাহপাক বলেছেন:

ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺧَﻠَﻘَﻜُﻢ ﻣِّﻦ ﻧَّﻔْﺲٍ ﻭَﺍﺣِﺪَﺓٍ ﻭَﺟَﻌَﻞَ ﻣِﻨْﻬَﺎ ﺯَﻭْﺟَﻬَﺎ ﻟِﻴَﺴْﻜُﻦَ ﺇِﻟَﻴْﻬَﺎ ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺗَﻐَﺸَّﺎﻫَﺎ ﺣَﻤَﻠَﺖْ ﺣَﻤْﻼً ﺧَﻔِﻴﻔًﺎ ﻓَﻤَﺮَّﺕْ ﺑِﻪِ ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺃَﺛْﻘَﻠَﺖ ﺩَّﻋَﻮَﺍ ﺍﻟﻠّﻪَ ﺭَﺑَّﻬُﻤَﺎ ﻟَﺌِﻦْ ﺁﺗَﻴْﺘَﻨَﺎ ﺻَﺎﻟِﺤﺎً ﻟَّﻨَﻜُﻮﻧَﻦَّ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺸَّﺎﻛِﺮِﻳﻦَ

তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদিগকে সৃষ্টি করেছেন একটি মাত্র সত্তা থেকে ; আর "তার থেকেই তৈরি করেছেন তার জোড়া", যাতে তার কাছে স্বস্তি পেতে পারে। অতঃপর পুরুষ যখন নারীকে আবৃত করল, তখন, সে গর্ভবতী হল। অতি হালকা গর্ভ। সে তাই নিয়ে চলাফেরা করতে থাকল। তারপর যখন বোঝা হয়ে গেল, তখন উভয়েই আল্লাহকে ডাকল যিনি তাদের পালনকর্তা যে, তুমি যদি আমাদিগকে সুস্থ ও ভালো দান কর তবে আমরা তোমার শুকরিয়া আদায় করব। (সূরা: আল আ’রাফ | আয়াত: ১৮৯)

উপরের আয়াত দুটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে বা একটি মাত্র সত্তা থেকে"। এখানে তোমাদেরকে বলতে সমগ্র মানবজাতিকে বুঝিয়েছেন। কেবলমাত্র পুরুষজাতিকে নয়। তাহলে সমগ্র মানবজাতিকে তিনি একটি মাত্র সত্তা বা ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী।  এই কথাটি দ্বারা তো পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন যে সমগ্র পুরুষ ও নারী সৃষ্টি করে বিস্তার করেছেন অর্থাৎ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি একথা বলেননি যে প্রত্যেক পুরুষ থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন। কাজেই ধর্মীয় দিক থেকে এব্যাপারটি পরিষ্কার যে আল্লাহ হযরত আদম (আ:) কে সৃষ্টির পর তার পাঁজরের হাড় থেকে হযরত হাওয়া (আ:) কে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের থেকে পর্যায়ক্রমে সকল পুরুষ-নারী সৃষ্টি করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন।