বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ খ্যাত ১১ শিক্ষকের অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আগামী রবিবার বোর্ড বসতে যাচ্ছে। এ খবর ছড়িয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনের সময়ে তৎকালীন সরকারের পক্ষে সাফাই গাওয়া এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া এই শিক্ষকদের বিচার না করে পদোন্নতির মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এর প্রতিবাদে ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষার্থী ব্যানারে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলমের কাছে পদোন্নতি বোর্ড স্থগিতের দাবিতে আবেদনপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯ থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিদিন দুটি করে পদোন্নতি বোর্ড বসানোর প্রস্তুতি চলছে। মেয়াদোত্তীর্ণ বোর্ড নবায়ন না করে আগের আওয়ামী লীগ আমলে গঠিত বোর্ডের মাধ্যমেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। বোর্ডে রয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. সাদেকা হালিম, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এম. রোস্তম আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিনসহ তৎকালীন সরকারনিযুক্ত সদস্যরা। এই বোর্ডের মাধ্যমে ১৩টি বিভাগের ২৪ জন শিক্ষককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া চলছে।
গত ১১ অক্টোবরের সিন্ডিকেট সভায় অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা থাকলেও তা হয়নি। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, অভিযুক্ত শিক্ষকরা উপাচার্যের ওপর চাপ প্রয়োগ করে পদোন্নতির চেষ্টা চালাচ্ছেন। উপাচার্য যোগদানের পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সাড়া দেননি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বোর্ড পরিবর্তনের উদ্যোগ নেননি। বরং এই বোর্ডের মাধ্যমে পদোন্নতির জন্য ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ অনুমোদন করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, পদোন্নতির জন্য ছয়টি অধ্যাপক পদকে প্রভাষক পদে রূপান্তর করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কাছে অনাপত্তির জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। কারণ, ইউজিসির অনাপত্তি ছাড়া পদোন্নতি অবৈধ হবে।
এদিকে, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সাদমান সাকিব বিন রহমান গত এপ্রিলে অব্যাহতি চাইলেও তাকে এখনো মঞ্জুর করা হয়নি, কারণ, তার অব্যাহতিতে পদ শূন্য হলে কয়েকজনের পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০টি প্রভাষক পদ শূন্য রয়েছে, কিন্তু নিয়োগের পরিবর্তে পদোন্নতিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, অভিযুক্ত ১১ শিক্ষক শূন্য পদে নিয়োগ না দিতে এবং পদোন্নতির জন্য উপাচার্যকে চাপ দিচ্ছেন। তারা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন ও অনশনের হুমকিও দিয়েছেন। মৃত্তিকা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. জামাল উদ্দিন ফেসবুকে অনশনের ঘোষণা দিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের দাবি, নতুন শিক্ষক নিয়োগ হলে এই হুমকি সম্ভব হতো না। ববি শাখা শিবির নেতা মোকাব্বেল শেখ বলেন, ‘উপাচার্য ফ্যাসিস্টদের বিচারের আশ্বাস দিলেও তাদের পদোন্নতির মাধ্যমে সুবিধা দিচ্ছেন। এটি শিক্ষার্থীদের প্রতি দ্বিচারিতা।’
ছাত্রদল নেতা মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘প্রশাসন শিক্ষার্থীদের চাহিদার পরিবর্তে ফ্যাসিস্ট শিক্ষকদের পুনর্বাসন করছে। আমরা কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলব।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, ‘উপাচার্য শিক্ষার্থীদের দাবি উপেক্ষা করে ফ্যাসিস্ট শিক্ষকদের পদোন্নতি দিচ্ছেন। বিচারের আগে পদোন্নতি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ক্ষতিকর।’
রেজিস্ট্রার ড. মো. মুহসিন উদ্দিন বলেন, ‘এটি সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত, আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না।’ উপাচার্য বলেন, ‘বিচারের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে, বিস্তারিত জানতে প্রক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’
প্রক্টর ড. রাহাত হোসাইন ফয়সাল বলেন, ‘অপরাধ ও পদোন্নতি ভিন্ন বিষয়। অ্যাকাডেমিক কাজ চলবে, বিচার শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী হবে।’