ক্ষুধা অর্থনৈতিক কাঠামোর ব্যর্থতা

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষের কারণে অসংখ্য মানুষ মারা যায়। সে বছর ভয়াবহ বন্যার ফলে ফসলহানি ঘটে। ১৯৭১ সালে দেশের খাদ্যগুদামগুলো ধ্বংস করে যায় হানাদার পাকসেনারা। ফলে প্রয়োজনীয় খাদ্য সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবাতে পাট রপ্তানির অজুহাতে বা ভিন্ন কারণে বাংলাদেশে খাদ্য সহায়তা বন্ধ করে দেয়। মার্কিন খাদ্যভর্তি জাহাজ বঙ্গোপসাগর থেকে ফিরে যায়। সরকার দেশের ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে লঙ্গরখানা খুলেও দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে পারেনি। ওই সময় রফিক আজাদ ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতায় লিখেন‘আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ/ ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাবো।’ কবিতাটি তার কাব্যগ্রন্থ ‘সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে’ অন্তর্ভুক্ত। কবিতাটি প্রকাশের পর গুঞ্জন উঠেছিল যে, এটি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে উদ্দেশ্য করে লেখা। সরকার কাব্যগ্রন্থটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং বাংলদেশ পুলিশের বিশেষ শাখার কাছে কবিকে লিখিত জবাবদিহি করতে হয়। ব্রিটিশ আমল থেকে পূর্ববাংলা ছিল খাদ্য ঘাটতি অঞ্চল। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর সর্বাপেক্ষা দুর্ভিক্ষ নামে পরিচিত। এই দুর্ভিক্ষে এক কোটি লোক মারা যায়। জনসংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। ব্রিটিশ সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণে এই দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি। অন্যদিকে ১৯৪৩ সালে অর্থাৎ ১৩৫০ বঙ্গাব্দে বাংলায় যে দুর্ভিক্ষ হয়, সেটি পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বর্তমান বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতে এই দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। বাংলা প্রদেশে ৬ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে আনুমানিক ৩০ লাখ মানুষ অপুষ্টি, স্থানচ্যুতি, অস্বাস্থ্যকর অবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবা অভাবের কারণে অনাহার, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য রোগে মারা যায়। এই সংকটে সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। পুরুষরা তাদের খণ্ড খণ্ড জমি বিক্রি করে এবং কাজ খুঁজতে বা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।

মহিলা ও শিশুরা গৃহহীন অভিবাসী হয়ে ত্রাণের সন্ধানে কলকাতা বা অন্যান্য শহরে আশ্রয় নেয়। জাপান প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার দখল করে নেওয়ার ফলে এই মন্বন্তর শুরু হয়। ওই সময় বার্মা ছিল চাল আমদানির বড় উৎস। ভারতবর্ষে তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক সেনা ও যুদ্ধে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য বিপুল পরিমাণ খাদ্য মজুদ করায় এই দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। বাঙালির প্রধান খাদ্য চালের আকাল দেখা দেওয়ায়, ভাতের জন্য সারা বাংলায় হাহাকার পড়ে যায়। গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে দুর্ভিক্ষ। এখানে-ওখানে পড়ে থাকতে দেখা য়ায় হাড্ডিসার মানুষের মৃতদেহ। এ সময় জরুরি খাদ্য সরবরাহের জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের কাছে আবেদন করেও বারবার প্রত্যাখ্যাত হয় ভারতের ব্রিটিশ কর্মকর্তারা। বিভিন্ন গ্রাম থেকে বুভুক্ষু হাজার হাজার মানুষ তখন এক মুঠ অন্নের আশায়,  স্রোতের মতো ধাবিত হয় কলকাতার দিকে। এ সময় আবর্জনার পাশে উচ্ছিষ্টের ভাগ বসাতে মানুষ-কুকুর চলে লড়াই। চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদীনের বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের চিত্রগুলো একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে যা তাকে অনন্য খ্যাতির আসনে অধিষ্ঠিত করে। এই চিত্রগুলোতে তিনি বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং মানুষের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরেন। ‘ক্ষুধা কোনো অভাবের কারণে নয়, এটি আমাদের তৈরি করা অর্থনৈতিক কাঠামোর ব্যর্থতা। আমাদের এই ব্যবস্থা বদলাতে হবে।’ গত ১৩ অক্টোবর, ২০২৫ প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইতালির রোমে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক আয়োজিত ‘বিশ্ব খাদ্য ফোরাম-২০২৫’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্যে এসব কথা বলেন।

প্রধান উপদেষ্টা বৈশ্বিক খাদ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পূর্ণ সংস্কারের মাধ্যমে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গঠনের জন্য ছয় দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তার ছয় দফা প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে এক. যুদ্ধ বন্ধ করে, সংলাপ শুরু এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে খাদ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে ক্ষুধা ও সংঘাতের দুষ্টচক্র ভাঙতে হবে। দুই. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে অর্থায়নের অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে টিকে থাকার সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা করতে হবে। তিন. আঞ্চলিক খাদ্য ব্যাংক গঠন করে খাদ্য সরবরাহ চেইন স্থিতিশীল রাখতে হবে। চার. তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অর্থায়ন, অবকাঠামো ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে সহায়তা দিতে হবে। পাঁচ. বাধা নয়, রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারপূর্বক বাণিজ্যনীতিকে খাদ্যনিরাপত্তার সহায়ক হতে হবে। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের তরুণ

কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বিশ্ব বিবেকের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, ২০২৪ সালে ৬৭৩ মিলিয়ন মানুষ ক্ষুধার্ত ছিল, অথচ আমরা যথেষ্ট খাদ্য উৎপাদন করেছি। এটি উৎপাদনের ব্যর্থতা নয়, এটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা, নৈতিক ব্যর্থতা। ক্ষুধা দূর করতে যেখানে কয়েক বিলিয়ন ডলার জোগাড় করা যায়নি, সেখানে অস্ত্র কিনতে বিশ্ব ব্যয় করেছে ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। একে কি আমরা অগ্রগতি বলব?’ তার বক্তব্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে স্বাবলম্বী হয়েছে। ভাত বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য। বাংলাদেশ চাল, শাকসবজি এবং স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশের কৃষকরা ফসলের উৎপাদন ২১৪ শতাংশে উন্নীত করেছেন। দেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা ১৩৩টি জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। বাংলাদেশ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকিতে কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করেছে। দেশটি একটি শক্তিশালী খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা তৈরি করেছে এবং খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্য আনতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষিকে সবুজ করছে।  মাটি, জল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করেছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। পুরনো মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা পদ্ধতি কোটি কোটি মানুষকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। আমাদের এমন সামাজিক ব্যবসা পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে, যা ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য নয়, বরং সমাজের সমস্যা সমাধানের জন্য।’ অপরদিকে তিনি ‘তিন-শূন্য বিশ্ব’ (শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ) ধারণার ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এটি কোনো কল্পনা নয়, এটি অপরিহার্য বিশ^ বাঁচানোর একমাত্র পথ। বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবসার সাফল্য দেখেছে। গ্রামীণ ব্যাংক দেখিয়েছে দরিদ্র নারীরাও উদ্যোক্তা হতে পারেন।

বিশ্ব জুড়ে বহু সামাজিক ব্যবসা মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে। গ্রামীণ ডানোন হলো একটি যৌথ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি গ্রামীণ ব্যাংক এবং ডানোর সম্মিলিত উদ্যোগে গঠিত, যার লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের শিশুদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা। এটি একটি লাভ-ক্ষতিহীন ব্যবসায়িক মডেল অনুসরণ করে, যেখান মুনাফা পুনরায় ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়, কিন্তু মালিকরা কোনো মুনাফা গ্রহণ করেন না। এর প্রধান কাজ হলো ‘শক্তি দই’ নামের একটি পুষ্টিকর শিশুখাদ্য তৈরি করা। এই প্রতিষ্ঠানটি ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের শিশুদের পুষ্টির অভাব দূর করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। ‘শক্তি দইয়ে’ শিশুদের পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য প্রোটিন, ভিটামিন, লৌহ, ক্যালসিয়াম, জিংক ও অন্যান্য অণুখাদ্য থাকার কথা বলা হয়েছে। তার কথা ‘তরুণ, নারী, কৃষক, কৃষি উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবকদের সহায়তায় সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগের জন্য আইনি ও আর্থিক কাঠামো তৈরি করতে হবে। আজকের তরুণ প্রজন্ম আগের তুলনায় অনেক বেশি সংযুক্ত, সৃজনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর। তাদের চাকরি খোঁজার কথা না বলে, বরং চাকরি সৃষ্টির ক্ষমতায়ন করতে হবে। তরুণ বিনিয়োগ তহবিল ও সামাজিক ব্যবসা তহবিলের মাধ্যমে মূলধনে প্রবেশাধিকার দিতে হবে। কৃষি উদ্ভাবন কেন্দ্র কৃষি প্রযুক্তি, চক্রাকার খাদ্যব্যবস্থা ও জলবায়ু স্মার্ট উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা দিতে হবে। যুবসমাজের ওপর বিনিয়োগ করলে শুধু বিশ্বকে খাদ্য নয়, পুরো বিশ্বকেই বদলে দিতে পারবে। বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক জোটের (গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার অ্যান্ড প্রভার্টি) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। দেশটি এফএও ও জি ২০-এর সঙ্গে প্রযুক্তিগত, আর্থিক ও নৈতিক সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিশ্বে শুধু খাদ্যের অভাবেই প্রতি ৪ সেকেন্ডে একজন মানুষ মৃত্যুবরণ করছে বলে জাতিসংঘের কাছে একটি প্রতিবেদন পেশ করেছে ৭৫টি দেশের ২৩৮টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিদিন ১৯ হাজার ৭০০ মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় মারা যাচ্ছে। এই মুহূর্তে বিশ্বের ৩৪ দশমিক ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছেন। খাদ্য সংকটের কাছাকাছি আছে আরও ৪৫টি দেশের ৫ কোটি মানুষ। ২০১৯ সালের পর খাদ্য সংকটে ভুগতে থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একবিংশ শতকের সব রাষ্ট্রনায়করা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, এ বিশ্বকে আর দুর্ভিক্ষ দেখতে হবে না। দুর্ভিক্ষ একটি কারণে হয় না। মানুষের প্রতি মানুষের অবিচার এর প্রকৃত কারণ। এক দল মানুষ যখন খাদ্য অপচয়ে ব্যস্ত, তখন অন্য দলের কাছে প্রাণ বাঁচানোর মতো খাদ্যটুকু নেই। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সমস্যার শিকড়ে গেলে খাদ্য সংকটের হয়তো হাজারটা কারণ পাওয়া যাবে। তবে দারিদ্র্য, সামাজিক অবিচার, লিঙ্গবৈষম্য, আঞ্চলিক বৈষম্য, জাতিগত বৈষম্য, কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জাতিগত দাঙ্গা, মহামারী, গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিশ্বের বেশিরভাগ সচেতন ও বিবেকবান মানুষ।

লেখক; সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন

netairoy18@gmail.com