বাংলাদেশের সেবাধর্মী ও মানবিক সংগঠনগুলোর মধ্যে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন (জেডআরএফ) একটি উজ্জ্বল নাম। প্রয়াত শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিকে ধারণ এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য টেকসই সহায়তা নিশ্চিত করার মহৎ উদ্দেশ্যে ১৯৯৯ সালের ১৮ অক্টোবর এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নে, কয়েকজন তরুণ চিকিৎসক সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এই সংগঠনের সাথে পথচলা শুরু করেন; তাদের মধ্যে অধ্যাপক অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা সহায়তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জেডআরএফ-এর কার্যক্রম স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, ত্রাণ, সচেতনতা এবং সামাজিক উন্নয়নের অঙ্গনে বহুমুখী প্রসারিত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পরেই ফাউন্ডেশনটি সুসংহত কাঠামো ও নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিচালিত হতে থাকে। বর্তমানে সংগঠনটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তারেক রহমান, ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন জনাবা ডা. জুবায়েদা রহমান এবং নির্বাহী পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত আছেন অধ্যাপক ডা. আব্দুল হালিম ডোনার। তাদের দক্ষ তত্ত্বাবধানে বর্তমানে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় পরিচালনা পর্ষদ এবং বিভাগীয় মনিটর, সমন্বয়ক ও সদস্যবৃন্দ মাঠপর্যায়ের সকল কর্মসূচি পরিচালনা করছেন। চিকিৎসক, কৃষিবিদ, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, আইনজীবী ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর সক্রিয় অংশগ্রহণে আজ জেডআরএফ দেশের সব বিভাগে সেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে এবং একটি বহুমাত্রিক কার্যকরী জাতীয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘ যাত্রাপথে জেডআরএফ ধারাবাহিকভাবে মানবিক সেবার এক নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। কভিড-১৯ মহামারির সময় সংগঠনটি জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি মাস্ক, গ্লাভস, স্যানিটাইজার, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অক্সিজেন সিলিন্ডার বিতরণ করে এবং বিভিন্ন স্থানে হাত ধোয়ার বেসিন স্থাপন করে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে। স্বেচ্ছাসেবীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে সাধারণ মানুষকে বিনামূল্যে করোনার চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন। বর্তমানে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচালিত মশকী নিধন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম নগর স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ অবদান রাখছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও সংগঠনটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে—ফেনী ও উত্তরবঙ্গে বন্যাকবলিত অঞ্চলে জরুরী চিকিৎসাসেবা, ওষুধ ও খাদ্য বিতরণ, পাশাপাশি হাঁস-মুরগি, মাছের পোনা এবং গাছের চারা সরবরাহের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক ও খামারিদের ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করছে। এসব উদ্যোগে গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতি ফিরে এসেছে এবং কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষা পেয়েছে।
সংগঠনটির কর্মযজ্ঞ কেবল স্বাস্থ্য ও ত্রাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও তাদের অবদান সুস্পষ্ট। সারা দেশে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা সভা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, শিশুদের বিজ্ঞান চর্চার উদ্বুদ্ধকরণ, বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজনের মাধ্যমে তারা গড়ে তুলছে সচেতন নাগরিকসমাজ। জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে অনুদান, শুভেচ্ছা উপহার ও সম্মাননা স্মারক প্রদান এবং একইসাথে আহতদের চিকিৎসাসেবা প্রদান সংগঠনটির মানবিক সহমর্মিতার এক উজ্জ্বল প্রমাণ।
এই ধারাবাহিক সেবাযাত্রার একটি বিশেষ অধ্যায় হলো জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন এগ্রি চট্টগ্রাম চ্যাপ্টার। চট্টগ্রাম অঞ্চলের কৃষি ও পশুপালন খাতে উন্নয়ন এবং প্রান্তিক কৃষকদের সহায়তায় এই চ্যাপ্টার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কোরবানির পশুর হাটে বিনামূল্যে ভেটেরিনারি চিকিৎসা সেবা এবং ভেটেরিনারি ও মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন, খামারিদের পশুপালন সুরক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। পাশাপাশি নিমগাছ রোপণ, গরিব, পথচারী ও এতিম মাদরাসা শিক্ষার্থীদের মাঝে ইফতার বিতরণ এবং “নগরফুল”–এর মতো ছিন্নমূল ও দারিদ্র্যপীড়িত শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি স্বেচ্ছাসেবী দ্বারা পরিচালিত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম এই চ্যাপ্টারের সামাজিক দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। এ ছাড়া স্থানীয়দের মধ্যে বিভিন্ন দেশীয় মাছ ও ফলমূলের উপকারিতা ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের খোঁজ নেওয়া, সহায়তা ও সম্মাননা স্মারক প্রদানও এই শাখার কার্যক্রমে মানবিকতার স্পর্শ নিয়ে আসে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা জেডআরএফের প্রায় সব প্রকল্পে এবং বিশেষ করে এগ্রি চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের প্রতিটি কর্মসূচিতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অংশ নিচ্ছে। তারা শুধু সেবার মানসিকতাই গড়ে তুলছে না, বরং নেতৃত্ব, সংগঠন দক্ষতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধেও নিজেদের সমৃদ্ধ করছে। এই সম্পৃক্ততা নতুন প্রজন্মের মধ্যে মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল চর্চা তৈরি করছে, যা সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে।
জেডআরএফের কর্মকাণ্ড দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে সুদৃঢ় প্রভাব বিস্তার করছে। স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিসমূহ একদিকে যেমন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সেবা প্রাপ্তিকে সহজসাধ্য করছে এবং অন্যদিকে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম মহামারী ও সংক্রামক রোগের ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক হচ্ছে। কৃষি ও পশুপালন সংক্রান্ত সহায়তা ও পরামর্শ, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং একই সাথে পশুসম্পদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। জাতীয় দিবসসমূহ উদযাপন, ইতিহাসের চর্চা এবং সর্বসাধারণের কাছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন তুলে ধরার মতো উদ্যোগসমূহ একটি ইতিবাচক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে ঐক্য, মানবিকতা এবং সম্মিলিত অংশগ্রহণের মূল্যবোধ শক্তিশালী হচ্ছে।
১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন আজ দেশের মানবকল্যাণ, কৃষি ও পশুপালন উন্নয়ন, শিক্ষা এবং সামাজিক সংহতির নির্ভরযোগ্য অগ্রদূত হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, ত্রাণ, কৃষি সহায়তা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ—সকল ক্ষেত্রে তাদের ধারাবাহিক অবদান টেকসই উন্নয়ন ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী কার্যক্রমের পরিধি বিস্তৃত করার যে আন্তরিক প্রয়াস ফাউন্ডেশনটি চালিয়ে যাচ্ছে, তা বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
লেখকঃ অধ্যাপক মো. আহসানুল হক (রোকন)
পরিচালক, ওয়ান হেলথ্ ইন্সটিটিউট, সিভাসু
মনিটর, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশান (কৃষি, চট্টগ্রাম)