ক্ষতি পোষাতে চাই দৃঢ় পদক্ষেপ

‘জলবায়ুকেন্দ্রিক ক্ষতি প্রশমনে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। জলবায়ুর ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ খাতনির্দিষ্ট নানা পরিকল্পনা ও কর্মকৌশল নির্ধারণ করেছে। এসব বিষয় বাস্তবায়নে অর্থায়ন কীভাবে নিশ্চিত হবে সে বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনকে বাংলাদেশ কীভাবে কাজে লাগাতে পারে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’

আগামী মাসে যাচ্ছে ৩০তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন।

এই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রত্যাশা কী হতে পারে এবং সেগুলো অর্জনের জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে, সে বিষয়ে ঢাকায় ক্লাইমেট উইক ২০২৫ আয়োজন করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। এতে বক্তারা এসব কথা বলেন।

রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে গতকাল শনিবার ক্লাইমেট উইকের উদ্বোধন হয়। চার দিনের এ আয়োজনে বিশে^র বিভিন্ন দেশ থেকে গবেষকরা তাদের গবেষণালব্ধ প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন। উদ্বোধনী দিনে দেশের বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। পুরো আয়োজনে নীতিনির্ধারক, গবেষক, তরুণ প্রজন্ম, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা অংশ নেবেন। ক্লাইমেট উইকের বিভিন্ন অধিবেশনে বৈশ্বিক ও জাতীয় জলবায়ুর নানা দিক কীভাবে ন্যায্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপে রূপান্তরিত করা যায়, তার উপায় নিয়ে আলোচনা হবে। এই অনুষ্ঠানটি ডেনমার্ক দূতাবাস এবং বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় আয়োজন করা হচ্ছে।

এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘আকাক্সক্ষাকে কাজে রূপান্তর’। আয়োজনের মধ্যে রয়েছে সম্মেলন, সংলাপ, প্রতিযোগিতা এবং প্রদর্শনী, যা জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন, উদ্ভাবন এবং সহনশীলতা বিষয়ে নতুন ধারণা তৈরি করতে সহায়তা করবে।

উদ্বোধনী দিনের মূল অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করছে। যার অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অধিদপ্তরের (ইউকে মেট অফিস) রিয়েল-টাইম ডেটা ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্যোগ পূর্বাভাস ও প্রস্তুতি উন্নত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আগাম বন্যা বা বিপর্যয় পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে। আগামীকাল এ উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপূর্ণ দেশে রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি এটি আশ্চর্যের বিষয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এর পাশাপাশি সরকার বাংলাদেশ ক্লাইমেট পার্টনারশিপ কার্যক্রম শুরু করেছে, যেখানে সরকার, সুশীল সমাজ ও একাডেমিয়া যৌথভাবে কাজ করবে। যার প্রথম বোর্ড মিটিং গত মাসে হয় এবং ডিসেম্বর মাসে দ্বিতীয় বোর্ড মিটিং হবে। সুতরাং, আমাদের ক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নের এই প্রচেষ্টাকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এ ছাড়া, বাংলাদেশের জলবায়ু উন্নয়ন অংশীদারত্ব ও ওয়ার্কিং গ্রুপগুলোয় সুশীল সমাজ এবং একাডেমিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে, সরকার ব্যস্ত থাকলেও নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞরা নীতিগত আলোচনায় সহায়তা করতে পারবেন। এটি একটি অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’

উপদেষ্টা বলেন, ‘জলবায়ু প্রশমন (মিটিগেশন) শুধু আইনগত নয়, এটি নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়। আমাদের উৎপাদন এবং ভোগ দুই ক্ষেত্রেই সচেতন হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, অফিসে বৈঠকের সময় অনাবশ্যক আলো বা এয়ার কন্ডিশনার চালু রাখা এক ধরনের অপচয়। পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, যা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।’

সবুজ ভবন নির্মাণের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন স্থানে সবুজ ভবন (গ্রিন বিল্ডিং) নির্মাণ কার্যক্রম চলছে। আমরা আর্কিটেক্ট ও ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কাজ করছি, যাতে ভবিষ্যতের সরকারি স্থাপনাগুলো শক্তি-সাশ্রয়ী মডেল হিসেবে গড়ে ওঠে। বাংলাদেশ এখন সরকারি খাত থেকেই ‘গ্রিন বিল্ডিং’য়ের বাস্তব মডেল তৈরি করছে। এ ছাড়া ইটভাটা শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কার্বন দূষণকারী খাত। বর্তমানে অধিকাংশ ইট তৈরির প্রক্রিয়া বার্ন ব্রেক বা পোড়ানো ইটভিত্তিক, যা বায়ু ও কৃষিজমি উভয়ই ধ্বংস করছে। পাহাড় কাটা ও নদী ভরাটের মতো কার্যক্রমও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় সরকার বিকল্প নির্মাণ উপকরণ ব্যবহারে উৎসাহিত করছে, যাতে কৃষিজমি বা পাহাড়ের ক্ষতি না হয়। পাশাপাশি, আমাদের ভোগব্যয় প্যাটার্ন পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রশমন প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে।’

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, ‘বায়ুদূষণ এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় পরিবেশগত সমস্যা। এ সমস্যা কমাতে আমাদের পেট্রোলিয়াম মান উন্নয়ন ও শোধনাগার আধুনিকীকরণ জরুরি। একই সঙ্গে, পুরনো দূষণকারী যানবাহন পরিত্যাগ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থা চালু করতে হবে। সরকার ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সব সরকারি সংস্থা নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হবে। এটি জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমনের পথে একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে।’

উইকের উদ্বোধনী সেশনে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মঞ্জুর হোসেন, বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. সৈয়দ আমির আহমেদ, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টিয়ান ব্রিক্স মুলার ও ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত পাওলো ফার্নান্দো ডিয়েস ফেরেস।

অনুষ্ঠানের ‘রোড অব কপ-৩০ : কীভাবে জাতীয় স্বার্থকে বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যেতে পারে?’ শীর্ষক দ্বিতীয় অধিবেশনে সিপিডির বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য খুশী কবিরের সঞ্চালনায় প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফখরুদ্দিন আল কবির। প্রবন্ধে জানানো হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে যেসব দুর্যোগ হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বন্যার কারণে। ২০১৫-২০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে যেসব দুর্যোগ হয়েছে, তার মধ্যে খরায় আক্রান্ত হয়েছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ পরিবার, জলাবদ্ধতায় ১০ দশমিক ১৬, ঘূর্ণিঝড়ে ৩৪ শতাংশ, টর্নেডোতে ৫ দশমিক ২৮, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ২ দশমিক ২৬, বজ্রপাতে ১৪ দশমিক ২২, নদী ও উপকূলীয় ক্ষয় ১০ দশমিক ৪, ভূমিধসে শূন্য দশমিক ৪০, লবণাক্ততায় ৩ দশমিক ২৭, শিলাবৃষ্টিতে ১৭ দশমিক ৮৩ এবং অন্যান্য খাতে শূন্য দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন পরিবেশ ও পানিবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত, সিপিআরডি প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মকর্তা মৌসুমি পারভীন, বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শিরিন সুলতানা লিরা, জার্মান উন্নয়ন সংস্থার প্রধান উলরিখ ক্লেপম্যান, বিজিএমইএর পরিচালক মো. সোহেল, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বায়ু) জিয়াউল হক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপসচিব ড. শাহ আব্দুল সাদী ও এসডিপিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আবিদ কাইয়ুম সুলেরি প্রমুখ।