শিক্ষা শুধু পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ নয়

পরিবারের প্রয়োজনে বছরের একটা সময় অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের রাজধানী ব্রিজবেনে থাকতে হয়। প্রথমবার ব্রিজবেনে গিয়েছিলাম জুলাই মাসে। তখন সেখানে বেশ শীত, আবার মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে শীত কমে যায়। সেই সময়টা ব্রিজবেনে বসন্তকাল। চকচকে নীল আকাশের সঙ্গে এ সময় ব্রিজবেনের প্রকৃতিতে এক অপার সৌন্দর্যের ডালি ছড়িয়ে ধরে এক ধরনের বিশেষ ফুল গাছ। যার নাম জাকারান্ডা। একটু জানিয়ে রাখি, অনেকেই ব্রিজবেনকে অস্ট্রেলিয়ার প্রকৃত জাকারান্ডা রাজধানী বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। অস্ট্রেলিয়ার নামকরা ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের থিম কালার বেগুনি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা প্রকাশনা, বোর্ড, প্রচারণা উপকরণ, শিক্ষার্থীদের টি-শার্ট, কলম, আইডি কার্ডের রিবন, ওয়েবসাইট  বিভিন্ন জায়গায় বেগুনি রঙ ব্যবহার করা হয়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভবন ফরগন স্মিথ বিল্ডিংয়ের নিচতলায় যে বিশাল দুটি পেইন্টিং রয়েছে, সেগুলোর একটি এ গাইডেন্স থ্রো টাইম (A Guidance Through Time) বেগুনি রঙে আঁকা। আদিবাসী শিল্পী কেসি কলওয়েল ও কাইরা ম্যানকটেলো উজ্জ্বল বেগুনি রঙ ব্যবহার করে এ ছবিটি আঁকছেন। যাতে উঠে এসেছে হাজার বছর ধরে ব্রিজবেন নদী তীরে গড়ে ওঠা এক সভ্যতার ইতিহাস। বেগুনি রঙের এই ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকা যায় দীর্ঘক্ষণ। কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় কেন বেগুনিকে তাদের থিম কালার করেছে, কেন বিভিন্ন ধরনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বেগুনি রঙ ব্যবহার করেছেন, তা বুঝতে পেরেছিলাম অক্টোবরের শেষ দিকে।  

কুইন্সল্যান্ডে সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর বসন্তকাল। এ সময় আবহাওয়া খুবই চমৎকার। গড় তাপমাত্রা ১৫-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আকাশ দেখতে একেবারে ছবির মতো। একটু জানিয়ে রাখি, ব্রিজবেনকে বলা হয় সানসাইন স্টেট বা রৌদ্র উজ্জ্বল রাজ্য। এখানকার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। নীল ও সাদা মেঘের আকাশকে মাঝে মধ্যেই মনে হয় শিল্পীর ক্যানভাস। বসন্তকালে এই ক্যানভাস নতুন মাধুর্য নিয়ে হাজির হয়। এ সময় সমুদ্র উপকূল, পার্ক, বিনোদনকেন্দ্র, বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়ানোর উৎকৃষ্ট সময়। বছরের শেষ ভাগের এ সময়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিজবেনবাসীর জীবনে আরেক ধরনের নতুন রঙ নিয়ে হাজির হয় জাকারান্ডা। এটি অতি উজ্জ্বল বেগুনি ফুলের গাছ। যা শহরটির রাস্তার ধার, পার্ক, বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্যান, নদীর তীর বলা যায় যেখানে, সেখানে এক স্বর্গীয় শোভা ছড়িয়ে দেয়। মাতিয়ে রাখে ব্রিজবেনের বাসিন্দাদের। 

জাকারান্ডা মাঝারি মাপের বৃক্ষ। বাংলাদেশের মাঝারি আকারের পেয়ারা বা জাম্বুরা গাছের মতো আকার। পাতা সবুজ। ছোট গোটা গোটা এক ধরনের ফল হয়। ফলগুলো পাখিদের প্রিয় খাদ্য। কিন্তু ফুল অতি উজ্জ্বল বেগুনি। বসন্তকালে যখন ফুল ফোটে তখন পুরো গাছটিই বেগুনি আকার ধারণ করে। এর মধ্যে হালকা সবুজ রঙের কিছু পাতা ও ফল থাকে, যা খুব একটা চোখে পড়ে না। বরং উজ্জ্বল চোখে ধাঁধা লাগানো বেগুনি রঙ পথিকের পথ আগলে দাঁড়ায়। জানায় অপার সৌন্দর্যের আহ্বান। কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচে কানাচে এই গাছ। সিটি সেন্টার থেকে সেন্ট লুসিয়া হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভবন ফরগন স্মিথ বিল্ডিং-এ যেতে স্পোর্টস গ্রাউন্ডের পাশে যে সড়ক দ্বীপ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাঝারি জাকারান্ডা গাছ। একটু দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পুরো গাছটিতে কেউ যেন উজ্জ্বল বেগুনি রঙের আগুন লাগিয়ে দিয়ে গেছে। যে আগুন লাগা সৌন্দর্য থেকে চোখ ফেরানো কঠিন। এখান থেকে হাঁটা দূরতে মনরো স্ট্রিটে উইলিয়াম ডার্ট পার্ক। এই পার্কের পশ্চিম প্রান্তে টানা এক সারিতে দাঁড়িয়ে জাকারান্ডা গাছ। একটু দূর থেকে দেখলে বেগুনি বন বলে মনে হয়। বসন্তকালে এই জায়গাটি সারা দিনই ব্যস্ত। বলতে পারেন বিশেষ দর্শনীয় স্থান। দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই জাকারান্ডা শোভায় মুগ্ধ হতে এখানে আসেন। সপ্তাহের শেষ দিনগুলোতে চলে পারিবারিক ও কমিউনিটির পিকনিক বা মিলনমেলার আয়োজন।

অনেক পরিবার বাচ্চাদের নিয়ে জাকারান্ডা গাছতলায় ঠাঁই খুঁজে নেন শুধুই অবসর কাটানোর জন্য। বসন্তের হালকা হিমেল বাতাস ও হালকা মিষ্টি গন্ধ এক স্বর্গীয় পরিবেশ তৈরি করে। এ ছাড়া গাছের নিচে যখন মখমলের মতো নরম ফুলগুলো ঝরে পড়ে তখন গাছের নিচের জায়গাকে অনেকটা বেগুনি আচ্ছদনের মতো মনে হয়। মনে হয় কে যেন খেয়ালি মনে এক বেগুনি কার্পেট বিছিয়ে রেখে আহ্বান জানাচ্ছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, পাখির পাশাপাশি মৌমাছিদের জন্য জাকারান্ডা গাছগুলো এক বিশেষ আশ্রয়স্থল। মিষ্টি গন্ধ ছড়ায় বলে সব সময়ই মৌমাছির দল বাস করে জাকারান্ডা গাছগুলোতে। একটু জানিয়ে রাখি, অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড ও হাইয়াই দ্বীপে জাকারান্ডা জন্মে। এই বৃক্ষটির বিকাশের জন্য সমুদ্রতট থেকে একটু দূরের লোকালয় বেশ উপযোগী স্থান। অস্ট্রেলিয়াতে কুইন্সল্যান্ড ছাড়াও, নিউ সাউথ ওয়েলস, ভিক্টোরিয়া, নর্দান টেরিটোরি ও তাসমানিয়াতে এই বাহারি বৃক্ষের দেখা মেলে। তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে দেখা যায়, ব্রিজবেনে প্রথম সিটি কাউন্সিলের তরফ থেকে জাকারান্ডা লাগানো ও পরিচর্যা শুরু হয় ১৯৮৭ সালে। এরপর এটি দ্রুত উদ্যান, বনাঞ্চল ও জলাভূমির পাশে লাগানো হয়। উপযুক্ত পরিবেশে এই গাছগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। একবার চারা রোপণ করা হলে সাধারণত প্রাকৃতিকভাবেই এই বৃক্ষের বিস্তার হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কুইন্সল্যান্ডের অন্যতম উদ্ভিদ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে জাকারান্ডা। ব্রিজবেন সিটি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী জাকারান্ডা হলো ২০০ উদ্ভিদের মধ্যে কুইন্সল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অন্যতম বৃক্ষ। জাকারান্ডার জীবনচক্রের সঙ্গে মানুষের জীবন দর্শনের একটি মিল আছে। মানুষের জীবন যেমন ছোট ও বর্ণময়, ঠিক তেমনি জাকারান্ডাও প্রকৃতিতে শোভা ছড়ায় খুবই অল্প সময়ের জন্য। প্রতি মৌসুমে জাকারান্ডা শোভা ছড়ায় মাত্র দুই থেকে আড়াই সপ্তাহ। প্রকৃতিতে এক অপরূপ শোভা ছড়িয়ে ঝরিয়ে পড়ে মাটিতে। নতুন করে প্রস্তুতি শুরু হয় নতুন মৌসুমে নতুন করে এই পৃথিবীকে আরও রূপবান করে সাজানোর। কোন বসন্তে অস্ট্রেলিয়া বিশেষ করে ব্রিজবেন যাওয়ার সুযোগ হলে একবার গভীর দৃষ্টি ফেলতে পারেন বেগুনি রঙের আগুন লাগা এই বৃক্ষের দিকে। নিঃসন্দেহে বলতে পারি, আপনার হৃদয়ে কিছুটা হলেও বেগুনি রঙ ছড়িয়ে দেবে জাকারান্ডা, যা সতেজ থাকবে দীর্ঘদিন।

এখানেই টের পাওয়া যায় শিক্ষার সঙ্গে প্রকৃতির কী গভীর সম্পর্ক।  শিক্ষাগ্রহণ শুধুই পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ করা নয়। এখানে জীবনবোধের শিক্ষা থাকতে হয়। জীবনকে উপলব্ধি করতে হয়। মানুষ ও প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হয়। তা না হলে চিন্তার দুয়ার খোলে না। এর শূন্যতা থাকলে, প্রকৃত আলোকিত মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা অসম্ভব।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক. জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

minhazjtv1987@gmail.com