অগ্নিকান্ড হচ্ছেই বদলায় না কিছু

ঢাকার রূপনগরে কেমিক্যাল গোডাউন ও পোশাক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কমপক্ষে ১৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আমরা যেন এমন মৃত্যুর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কারখানায় অগ্নিকাণ্ড যেন এখন আর খবর নয়, অনেকটা রুটিন ঘটনা। বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান, রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও মর্যাদা রক্ষা করবে। প্রশ্ন হলো, এই শ্রমিকরা কি সত্যিই সমান নাগরিক? তাদের কর্মস্থলে কোথায় নিরাপত্তা, মর্যাদা? কেন বারবার পুড়ে মরতে হয় তাদের? কেন প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর আমরা দেখি, একই অবহেলা, অজুহাত ও বিচারহীনতা? ২০১০ সালের ঢাকার নিমতলী ট্র্যাজেডি এখনো স্মৃতিতে গেঁথে আছে। ঘিঞ্জি এলাকায় রাসায়নিক গুদামে বিস্ফোরণ ও আগুনে ১২৪ জন নাগরিকের মৃত্যু। ২০১৯ সালে চুড়িহাট্টা অগ্নিকা-ে ৭১ জনের মৃত্যু। সেই ঘটনার পর বহু প্রতিশ্রুতি এসেছিল। যেমন পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গুদাম সরানো হবে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কড়াকড়ি করা হবে। কিন্তু দেখা যায়, ওসব গুদাম এখনো মানুষের বসতবাড়িতে। ২০১২ সালে আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশন কারখানায় আগুনে প্রাণ হারান কমপক্ষে ১১৭ শ্রমিক। প্রকাশিত সংবাদে বেরিয়ে আসে কারখানার দরজা তালাবদ্ধ ছিল, শ্রমিকদের বের হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। অগ্নিনিরাপত্তা ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা সব মিলিয়ে এক ভয়ংকর মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছিল সেই ভবন। কিন্তু এত প্রাণহানির পরও দায়ীদের কেউ প্রকৃত শাস্তি পায়নি।

২০২১ সালে নারায়ণগঞ্জের হাশেম ফুড কারখানায় আগুন, যেখানে ৫৪ জন শ্রমিকের জীবন শেষ হয়। তাদের মধ্যে ছিল শিশুশ্রমিকও। বের হওয়ার পথ বন্ধ, জানালা-দরজায় লোহার গ্রিল, ফায়ার এক্সিটহীন ভবন সবকিছু জানিয়ে দিয়েছিল এই মৃত্যু ছিল সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। মালিক গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, পরে জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু বিচার ঝুলে আছে। এই ঘটনাগুলোর পর কয়েকটি মানবাধিকার ও শ্রমিক সংগঠন জনস্বার্থে মামলা করেছিল। তাজরীন, নিমতলী ও হাশেম ফুড ট্র্যাজেডির ঘটনায় সংগঠনগুলোর দায়েরকৃত মামলাগুলোতে মহামান্য হাইকোর্ট  রুল  জারি করেছিল। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে, সেসব মামলার রায় কি হয়েছে? যদি সেগুলোর নিষ্পত্তি হতো, তাহলে অন্তত ক্ষতিপূরণ কিংবা কারখানার নিরাপত্তা নীতিমালায় কিছু অগ্রগতি হতো। অগ্নিকান্ডের ধারাবাহিক ঘটনাগুলো শুধু শ্রমিকদের মৃত্যু নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি। এগুলো শুধু দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি পরিকল্পিত অবহেলা। কারণ একই ভুল, একই অনিয়ম, একই অমানবিকতা বছরের পর বছর ধরে চলতে পারে না।

রূপনগরের আগুনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তারা কারও বাবা, কারও মা, কারও সন্তান। তাদের মৃত্যু যেন কেবল পরিসংখ্যানের খাতায় একটি সংখ্যা। সব দুর্ঘটনার পরই গঠিত হয় তদন্ত কমিটি, আসে কিছু আশ্বাস, তারপর সব আগের জায়গায় ফিরে যায়। পরেরবার আবার নতুন আগুন, নতুন মৃত্যু, নতুন কমিটি। এভাবেই চলছে বছরের পর বছর। রূপনগরসহ সাম্প্রতিক বেশ কিছু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের দায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটি শ্রমিক নিরাপত্তা তদারকির জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত  হলেও, বাস্তবে এর কার্যক্রম সন্তোষজনক বলা যায় না। তাই এই সংস্থাকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক রূপে গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের বিভিন্ন  আবাসিক এলাকায় কলকারখানা গড়ে ওঠা। যেখানে মানুষের বসবাস, শিশুদের স্কুল, হাসপাতাল সেখানে রাসায়নিক বা দাহ্য পদার্থের গুদাম ও উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে এগুলো নিয়মিত মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে এসব স্থাপনায় যাতে, শিল্প স্থাপন অনুমতি ও পরিদর্শনের মধ্যে দৃশ্যমান সমন্বয় তৈরি হয়, সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে। একটি কার্যকর ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে হলে, ‘নিরাপত্তা’কে মূল ভিত্তি হিসেবে নিতে হবে। নতুন কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার আগে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করা উচিত।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক, যারা এসব শিল্পে বিনিয়োগ করে তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। বিনিয়োগের আগে নিশ্চিত হতে হবে যে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সেফটি মেজারস বজায় রাখার যথাযথ পদক্ষেপ রয়েছে কিনা। নইলে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানও এক অর্থে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনৈতিক বিনিয়োগে অংশ নিচ্ছে বলে দায় নিতে হবে। বীমা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করছে। বর্তমানে বেশিরভাগ বীমা শুধু কারখানার মেশিন ও পণ্যের ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। শ্রমিকের জীবন, অঙ্গহানি বা চিকিৎসা খরচ বীমার আওতায় আনার নজির দেশে এখনো কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি। অথচ এই কাঠামো গড়ে উঠলে, দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবারে অন্তত কিছু আর্থিক  অধিকার  প্রতিষ্ঠা  পেত।  কারখানা মালিকদের উদ্যোগ ও বিনিয়োগকে আমরা সম্মান জানাই। তারা দেশের অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি। তবে তাদের সেই সম্মান রক্ষা করতে হলে, শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না। মালিকদের কাছে আমাদের চাওয়া একটাই, তাদের কারখানায় যেন কোনো শ্রমিকের জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে আর এমন মৃত্যুর পরিণতি যেন কখনো ‘দুর্ভাগ্য’ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে না হয়।

আমাদের সমাজের বড় ব্যর্থতা হলো, আমরা শ্রমিককে মানুষ হিসেবে নয় শ্রমের যন্ত্র হিসেবে দেখি। যতক্ষণ তারা কাজ করে, ততক্ষণ তাদের প্রয়োজন আছে। তারা পুড়ে মরলে সেটা হয় ‘দুঃখজনক’ খবর মাত্র। অথচ এই শ্রমিকরাই দেশের শিল্প ও অর্থনীতির প্রাণ, পোশাক শিল্প থেকে খাদ্যপ্রসেসিং সব খাতে তাদের ঘাম ও শ্রমেই দাঁড়িয়ে আছে আমাদের উন্নয়ন। কিন্তু উন্নয়নের সুফল তাদের ভাগ্যে জোটে না, বরং ঝুঁকি ও মৃত্যু তাদের সঙ্গী থেকে যাচ্ছে।  কালবিলম্ব না করে রাষ্ট্রের উচিত, প্রতিটি কারখানায় নিরাপত্তাব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক করা, অগ্নিনিরাপত্তা নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। আমাদের মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। এই বিষয়টিকে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারলে, রূপনগরের মতো ঘটনা ভবিষ্যতে নতুন কোনো এলাকায় পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।  

লেখক : মানবাধিকারকর্মী

  aafk76@yahoo.com