তিস্তার অপমৃত্যু সম্ভাবনার হত্যা

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের হতভাগ্য নদীর নাম তিস্তা। নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবনের গল্প, বেঁচে থাকার ইতিহাস, কৃষির প্রাণ, মানুষের হাসি-কান্না, আশা ও বেদনার দীর্ঘ অধ্যায়।  আজ এই নদী যেন হয়ে উঠেছে অভিশাপের প্রতীক। এক সময় যার প্রবাহে মানুষ বাঁচত, ফসল ফলত, জীবিকা চলত, সেই নদী আজ শুষ্ক মাটির মতো নিস্তেজ। তিস্তা কেবল একটি নদী নয়; এটি ছিল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের অস্তিত্ব, স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার প্রতিচ্ছবি। সেই স্বপ্ন আজ ভেঙে পড়েছে রাজনৈতিক স্বার্থ, কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং বৈষম্যের নির্মম বাস্তবতায়। এই নদী এক সময় ছিল উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র। নদীর দুই তীরে বিস্তৃত ফসলি জমি, ধান, পাট, গম, ভুট্টা সবকিছুই তিস্তার পানির কল্যাণে সমৃদ্ধ ছিল। কৃষকরা সারা বছর সেচের পানি পেতেন, মাছ ধরার মৌসুম ছিল প্রাণবন্ত, জীবিকা ছিল নির্ভরযোগ্য। তিস্তার জল তখন উত্তরবঙ্গের জনজীবনের অক্সিজেন। কিন্তু সেই তিস্তা আজ যেন এক মৃতপ্রায় স্রোতধারা। কোথাও কোথাও মাইলের পর মাইল জুড়ে শুকনো বালুচর, ভাঙা চর, ধুলা ও ধ্বংসের এক অনন্ত দিগন্ত। তিস্তা নদী নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জটিলতার নাম হলো ‘তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি’। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি হয়েছিল। তাতে বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছিল নদীর ৩৬ শতাংশ এবং ভারতকে ৩৯ শতাংশ পানি ব্যবহারের অনুমতি, বাকি ২৫ শতাংশ রাখা হয়েছিল নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায়। কিন্তু সেই চুক্তি কখনো কার্যকর হয়নি। বহুবার আলোচনা হয়েছে, বিশেষত ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকায় আসার সময় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে চুক্তিটি শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়। তারপর থেকে তিস্তা যেন কূটনীতির গোপন পৃষ্ঠায় বন্দি এক নাম।

বাংলাদেশের দৃষ্টিতে তিস্তার পানি ন্যায্য হিস্যায় পাওয়া আমাদের প্রাপ্য অধিকার। আন্তর্জাতিক নদী আইনও সেই কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের অংশে পানি আসেই না। ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ থেকে পানি আটকে দেওয়ার ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীটি প্রায় মরে যায়। ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত সময়ে তিস্তার বুক জুড়ে পড়ে থাকে ধুলাবালি। কোথাও কোথাও মানুষ হেঁটে নদী পার হয়। ফসলি জমি শুকিয়ে ফেটে যায়, পুকুর-খাল মরে যায়, কৃষকের চোখে ভেসে ওঠে অনিশ্চয়তার ছায়া। রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম জেলার লক্ষাধিক পরিবার তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এই অঞ্চলের কৃষি আজ একপ্রকার অপমৃত্যুর মুখে। যে জমিতে এক সময় বছরে তিন মৌসুমে ফসল হতো, সেখানে এখন এক মৌসুমেও ভালো ফলন পাওয়া যায় না। সেচের পানি না থাকায় কৃষকরা বিকল্প হিসেবে ডিপ টিউবওয়েল কিংবা কৃত্রিম সেচের ওপর নির্ভর করছে, কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাওয়ায় সেই পথও বন্ধ হয়ে আসছে। ফলে কৃষি উৎপাদন কমছে, কর্মসংস্থান হ্রাস পাচ্ছে, দারিদ্র্য বাড়ছে একইসঙ্গে উত্তরবঙ্গের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ক্রমে মৃতপ্রায়। তিস্তার শুষ্কতা শুধু কৃষি ধ্বংস করেনি, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলেছে। ফসল হারানো কৃষকরা শহরমুখী হচ্ছে, জমি বিক্রি করে দিচ্ছে, দিনমজুরে পরিণত হচ্ছে। পরিবারে অনটন, ঋণের বোঝা, অভাবের চক্র তাদের গ্রাস করছে। এক সময় সবুজ শস্যের ঢেউ খেলত যে অঞ্চলে, আজ সেখানে অনিশ্চয়তা আর বেকারত্বের কালো ছায়া। তিস্তার এক সময়ের প্রাণবন্ত জনপদ এখন বিষণœ বালুচরে পরিণত হয়েছে। তিস্তার নদীপথে আরও এক বড় বিপর্যয় হলো অসময়ে বন্যা। উজানে ভারত যখন ইচ্ছেমতো গজলডোবা ব্যারাজ খুলে দেয়, তখন হঠাৎ বন্যা এসে সবকিছু ভাসিয়ে নেয়। আবার যখন পানি দরকার, তখন তারা এক ফোঁটাও ছাড়ে না। এই অস্বাভাবিক ওঠানামা শুধু ফসল ধ্বংস করে না, মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে তোলে।  তিস্তা চুক্তি নিয়ে সমস্যা শুধু পানির অভাব নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে রাজনীতির জটিল সমীকরণ।

ভারত বলে, নদীর পানি ভাগাভাগির বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সম্মতি প্রয়োজন। রাজ্য সরকার বলে, তারাও কৃষির প্রয়োজনে পানি আটকে রাখতে বাধ্য। এই কেন্দ্র-রাজ্য দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের স্বার্থ বছরের পর বছর অবহেলিত। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, তিস্তা একটি আন্তঃসীমান্ত নদী তাই এর পানি উভয় দেশের ন্যায্য অধিকারের মধ্যে। কিন্তু সেই ন্যায্যতা আজও কার্যকর হয়নি। তিস্তা চুক্তির নতুন বন্দোবস্ত হওয়া উচিত বাস্তবতার ভিত্তিতে। নদীর বার্ষিক প্রবাহ, মৌসুমি পরিবর্তন, উভয় দেশের কৃষি চাহিদা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বিশ্লেষণ করে নতুন করে হিস্যা নির্ধারণ করা যেতে পারে। শুধু পানি ভাগাভাগি নয়, নদী ব্যবস্থাপনা, সেচ অবকাঠামো উন্নয়ন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণেও দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। একটি স্থায়ী যৌথ পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করে উজান-ভাটির তথ্য বিনিময়, জলবায়ু প্রভাব মূল্যায়ন এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব। সম্প্রতি তিস্তা পুনর্বাসন প্রকল্পে চীনের আগ্রহ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ অঞ্চলের মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। চীন প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে তিস্তা নদী খনন, সেচ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও বাঁধ নির্মাণে। যদি এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তাহলে উত্তরবঙ্গের কৃষি আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে। নদীর দুই তীরে আধুনিক সেচ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে, নতুন শিল্প এলাকা গড়ে উঠবে, মৎস্যচাষ ও পর্যটনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। তিস্তার পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে, দেশের সার্বিক কৃষি প্রবৃদ্ধি আরও বেড়ে যেতে পারে। কৃষকরা আত্মনির্ভর হবে, গ্রামের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হবে এবং দারিদ্র্য চক্র ভেঙে পড়বে। তিস্তা যদি আবার বয়ে চলে, তবে এ দেশের উত্তর প্রান্তে কৃষি, শিল্প ও জীবনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এই নদী শুধু পানি নয় এটি আশা, জীবন, অস্তিত্বের প্রতীক। তিস্তা বাঁচলে বাঁচবে উত্তরবঙ্গ। তিস্তা বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশের কৃষি। তিস্তা বাঁচানো মানে কোটি মানুষের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনা, মরুভূমির বুক জুড়ে আবার সবুজ তরঙ্গ তোলা।

লেখক : শিক্ষক ও কলাম

sultanmh17@gmail.com