অগ্নিকান্ড এখন সাধারণ বিষয়। দীর্ঘদিনের জমে থাকা প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, হীন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং ব্যক্তি অসচেতনতা যুক্ত থাকে। গত এক সপ্তাহে একের পর এক অগ্নিকান্ড আমাদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। ভাবতে বাধ্য করছে এরপর কি আবার কোনো অগ্নিকা- বা ভয়াবহ ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে! না হলে পরপর এমন ঘটনার নেপথ্যে কী? জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, তার চেয়েও দ্রুতগতিতে বাড়ছে অগ্নিকান্ড। গত এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া একের পর এক অগ্নিকাণ্ড সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। রাজধানীর মিরপুরে কেমিক্যাল গোডাউনের আগুনে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু, চট্টগ্রামের ইপিজেডে পোশাক কারখানায় ব্যাপক ক্ষতি এবং গত শনিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণ মানুষ থেকে উদ্যোক্তা, রাজনীতিবিদসহ অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, এগুলো নিছক দুর্ঘটনা নাকি ষড়যন্ত্র? দেশের ব্যবসা খাত ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে অগ্নিকাণ্ড। ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মিরপুরের কেমিক্যাল গোডাউন, চট্টগ্রামের পোশাক কারখানা ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রত্যেকটি ঘটনা নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি, অভ্যন্তরীণ ত্রুটি এবং সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের দিকগুলো সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগুনে অনেক পণ্য পুড়ে গেছে। হয়তো বীমা কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে কিছু টাকা পাওয়া যাবে, কিন্তু যে ইমেজ সংকট তৈরি হচ্ছে সেটি পূরণ করতে অনেক সময় লাগবে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক অগ্নিকা-ের ঘটনায় নাশকতার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পেলে তাৎক্ষণিক ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে অন্তর্র্বর্তী সরকার। গত শনিবার রাতে প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদের পাঠানো অন্তর্র্বর্তী সরকারের এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়েছে। বলা হয়, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি সংঘটিত একাধিক অগ্নিকা-ের ঘটনায় জনমনে যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, অন্তর্র্বর্তী সরকার তা গভীরভাবে অবগত। আমরা সব নাগরিককে আশ্বস্ত করতে চাই, নিরাপত্তা সংস্থাগুলো প্রতিটি ঘটনা গভীরভাবে তদন্ত করছে এবং মানুষের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে।’ এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ক্ষতিগ্রস্ত সবার প্রতি আমার দোয়া রইল। আমি আন্তরিকভাবে আশা করছি, যেন সবাই নিরাপদে থাকেন। আমি ফায়ার সার্ভিস, সশস্ত্র বাহিনী ও অন্য উদ্ধারকর্মীদের প্রশংসা জানাই, যারা দ্রুত ও সাহসিকতার সঙ্গে এ দুই অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করেছেন, জনসেবার প্রতি তাদের প্রকৃত নিষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন।’ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘ছাত্র-জনতার আকাক্সক্ষার বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে এবং দেশকে অস্থিতিশীল করতেই ফ্যাসিস্টদের দোসররা জোরালোভাবে নানা ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড শুরু করেছে।’ কিছু দল প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)। অবিলম্বে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানায় তারা।
অন্যদিকে, গত শনিবার রাতেই চট্টগ্রাম বন্দরে ১২০০ টন কাঁচামাল নিয়ে জাহাজডুবির ঘটনা ঘটেছে। বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলী নদীর মোহনায় বন্দর সীমানায় যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়া জাহাজটি প্রায় ডুবে গেছে। বন্দর চ্যানেলে আসা-যাওয়ার কাছাকাছি স্থানে জাহাজটি ডুবলেও আপাতত সমস্যা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এদিকে, কার্গো ভিলেজে আগুন লাগার ঘটনাটি সরকারের শীর্ষ মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। অনেক ব্যবসায়ী ভবিষ্যতে হয়তো কার্গো সুবিধা ব্যবহার করে পণ্য পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করবেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের ঘটনায় ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগকারীর আস্থা কমে যেতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করে এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো তা গভীরভাবে ভাবতে হবে। মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে, হয়তো নিকট ভবিষ্যতে আরও অনেক কিছু ঘটতে পারে। যার জন্য সার্বিকভাবে প্রস্তুতি রাখা দরকার।