রাজধানীতে একের পর এক রাসায়নিক কারখানা ও গুদামে আগুনে প্রাণহানি সত্ত্বেও ৬ বছরেও মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক আলোর মুখ দেখেনি। দুই দফা মেয়াদ বাড়িয়েও ৩১০ একর জায়গা জুড়ে নির্মাণাধীন এ পার্কের ভেতর এখন কেবল কাশবানের রাজ্য। পুরান ঢাকাসহ রাজধানী ও আশপাশে ছড়িয়ে থাকা রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম একত্র করতে জেলার সিরাজদীখান উপজেলার চিত্রকোট ইউনিয়নের তুলসীখালি ও কামারকান্দা গ্রামে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। নির্মাণ শুরুর পর ৬ বছর পেরিয়ে প্রকল্প এলাকায় বালু ভরাট কাজ শেষে এখন সেখানে প্রশাসনিক ভবন, পুলিশ ফাঁড়ি ও ফায়ার সার্ভিস ভবন নির্মাণকাজ এখনো চলমান রয়েছে। চলছে চারপাশের প্রাচীর নির্মাণকাজ। এর বাইরে প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। কাজেই কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের কাজ চলছে ঢিমেতালে। আবার প্লট বরাদ্দের জন্য এখনো আবেদন পর্যন্ত চাওয়া হয়নি। তবু সেখানে ৭৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা বলছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রাসায়নিক পণ্যের ছোট-বড় অসংখ্য কারখানা ও গুদাম রয়েছে। ঢাকার কেরানীগঞ্জেও গড়ে উঠছে এমন অনেক গুদাম। এসব গুদামে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। এতে ২০১০ সালে লোকালয় থেকে এসব কারখানা ও গুদাম সরিয়ে আলাদাভাবে কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণের আলাপ চলতে থাকে। সে সময় পুরান ঢাকার নিমতলীতে কেমিক্যালের একটি গুদামে অগ্নিকান্ডে পুড়ে ১২৪ জনের মৃত্যু হয়। এরপর ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় রাসায়নিক থেকে অগ্নিকা-ে ৭১ জনের মৃত্যুর পর কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণের বিষয়টি চূড়ান্ত করে সরকার। এতে ওই বছরেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নিতে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণে উদ্যোগী হয় সরকার। এতে ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৬১৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। সেখানে রাসায়নিক কারখানার জন্য থাকবে প্রায় ১ হাজার ৯০০টি প্লট। কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০২২ সালে। কিন্তু জমি অধিগ্রহণে নানা সমস্যায় সে সময় প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। বর্ধিত এ সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ না হওয়ায় আবারও এক বছর সময় বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে মেয়াদ।
এদিকে, সর্বশেষ চলতি বছরের ১৪ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুরের শিয়ালবাড়ির ৩ নম্বর সড়কে কারখানা ভবন এবং রাসায়নিকের গুদামে অগ্নিকা-ের ঘটনায় ১৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় সিরাজদীখানের কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। অথচ সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নৌপথে মালামাল আনা-নেওয়ার জন্য প্রকল্প সংলগ্ন ধলেশ্বরী নদীতে দুটি জেটি নির্মাণকাজ এখনো ধরাই হয়নি। এ জন্য প্রায় দেড়-কিলোমিটার এলাকার নদীশাসনের কাজও বাকি রয়েছে। এছাড়া কঠিন ও তরল বর্জ্যরে জন্য পৃথক শোধনাগার, নিজস্ব পাওয়ার স্টেশন, গবেষণা কেন্দ্র, ডে-কেয়ার সেন্টার, চিকিৎসা কেন্দ্র, শিল্প মালিক সমিতির জন্য কার্যালয়ের ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। পাশাপাশি প্রকল্পের ভেতরে ১০ ফুট প্রশস্ত সড়ক ও প্রায় ১০ একর জায়গায় সবুজ বনানী গড়ে তোলার কথা থাকলেও তা কবে হবে কেউ জানে না।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মোট ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৭৮ ভাগ। মাটি ভরাট কাজ শেষ হয়েছে ৯৬ ভাগ। সীমানা প্রাচীর দেয়ালের কাজ হয়েছে ৮০ ভাগ। ২ হাজার ৮০০টি বাউন্ডারি পাইলের কাজ শেষ হয়েছে। ফায়ার স্টেশন, পুলিশ ফাঁড়ি, প্রকল্পের প্রশাসনিক ভবনের কাজ চলমান আছে। অবকাঠামোগত কাজ শেষ হয়েছে ৬৫-৬৮ ভাগ।
জেলার সিরাজদীখান উপজেলার চিত্রকোট ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শহীদুল ইসলাম জানান, রাজধানীতে একের পর এক কেমিক্যাল-রাসায়নিক কারখানা ও গুদামে আগুনের ঘটনা ঘটেই চলছে। এতে প্রাণহানি বাড়ছে। যখন একটা ঘটনা ঘটে, তখনই সরকার ও কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের সংশ্লিষ্টরা কাজের ব্যাপারে তদারকি শুরু করেন। শুরু হয় তাদের দৌড়ঝাঁপ। আর কয়েকদিন কেটে গেলে সবাই ভুলে যায় সব। আর এগোয় না কেমিক্যাল পার্কের কাজ।
উপজেলার গোয়ালখালী গ্রামের বাসিন্দা আজিম হালদার বলেন, রাসায়নিক পার্কের জন্য আমাদের এলাকার মানুষ বাপ-দাদার জমি দিয়েছি। ৬ বছর পার হয়ে গেল। এখনো দৃশ্যমান তেমন কোনো কাজ দেখছি না। ব্যবসায়িক ও জনবসতিপূর্ণ এলাকার কেমিক্যাল কারখানায় অগ্নিকান্ডের ঘটনায় মানুষ পুড়ছে। এভাবে আর কতদিন চলবে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে কেমিক্যাল পার্কের কাজ শেষ করে কারখানা স্থানান্তর হোক।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শরিফুল ইসলাম শরীফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাননীয় শিল্প উপদেষ্টার সঙ্গে সম্প্রতি আমরা ওই প্রকল্প এলাকা ঘুরে এসেছি। সেখানে প্রশাসনিক ভবন নির্মাণকাজ চলছে। বাউন্ডারি দেয়াল করার কথা তাও হচ্ছে। উপদেষ্টা মহোদয়কে দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য অনুরোধ করেছি। কাজ শেষ হলে আমাদের কারখানাগুলো সেখানে স্থানান্তর করতে পারব।
কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, জমি অধিগ্রহণে সময় বেশি লেগেছে। কাক্সিক্ষত ঠিকাদার না পাওয়ায় কাজ শুরু করতে হয় ২০২১ সালে। এ জন্য কাজ শেষ করতে কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয়েছে। চলতি বছরে প্রকল্পের ৭৮ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট কাজ চলমান রয়েছে। কাজ শেষ হলে আগামী বছরের জানুয়ারিতে প্লট বরাদ্দের জন্য আবেদন চাওয়া হবে। প্রকল্প পরিচালকের দাবি, অন্য যে সব কাজ রয়েছে রাস্তা বাদে সেগুলো ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে।