নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আনা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভুত আপিল আবেদনের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত ৭ বিচারকের আপিল বিভাগে এ শুনানি শুরু হয়। এদিন আপিলের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া।
শুনানিতে তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়ে আইনের ব্যাখ্যায় ভুল করেছেন বিচারপতি খায়রুল হক (তখন প্রধান বিচারপতি)। তিনি ভুল রায় দিয়ে গণতন্ত্রের কাঠামোগুলো ধ্বংস করেছিলেন।
এ আইনজীবী আরও বলেন, ‘গণতন্ত্র থাকলে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার, জনগণের সার্বভৌমত্ব থাকবে। আয়নাঘর, ডামি ইলেকশন, রাতের ভোট আর হবে না- এই যুক্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া প্রয়োজন।’
এর আগে আপিল বিভাগের দেওয়ার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে করা রিভিউ (রায় পুনর্বিচেনা) আবেদনের ওপর গত ২৭ আগস্ট শুনানি শুরু হয়। ওইদিন রিভিউ’র শুনানিকালে আপিলের অনুমতি মঞ্জুর করে আপিল শুনানি, নাকি রিভিউ’র ওপর শুনানি নিয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে, এমন প্রসঙ্গ ওঠে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের বক্তব্য শুনে প্রধান বিচারপতি আপিলের অনুমতি দিয়ে ২১ অক্টোবর আপিল শুনানির জন্য দিন ধার্য করে। এর ধারাবাহিকতায় এ মামলাটি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ৬ নম্বর ক্রমিকে ছিল। সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে শুনানি শুরু করেন আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। মাঝখানে আধঘন্টা বিরতি শেষে দুপুর ১টা ২০ মিনিটে প্রথম কার্যদিবসের শুনানি শেষ করেন তিনি। বুধবার পর্যন্ত শুনানি মূলতবি করে সর্বোচ্চ আদালত।
শুনানির পর ড. শরীফ ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাংবিধানিক বিষয় ব্যাখ্যা করার কিছু রীতি ও পদ্ধতি আছে। বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বে যে রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে সেখানে বিচারকেরা এই রীতিনীতি প্রয়োগ করতে ভুল করেছেন। এরই অংশ হিসেবে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধানের ব্যাখ্যা করতে গেলে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, এর ফলাফল কি দাঁড়াবে এগুলো বিবেচনায় নিতে হয়। কিন্তু ত্রয়োদশ সংশোধনীর মামলায় বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চ এগুলো বিবেচনায় নেননি। কাজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়টা আইনগত ও কাঠামোগতভাবে দুর্বল।’
আপিল বিভাগের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে এলে আগামী জাতীয় নির্বাচন কি প্রক্রিয়ায় হবে- এমন প্রশ্নে ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ‘রায়ের মাধ্যমে যদি তত্ত্বাবধায়ক ফিরে আসে, আমার ধারণা এখন যে নির্বাচন হবে তার পরের নির্বাচনে এটি কার্যকর হবে এবং আদালতে আমি এটাই শুনানিতে বলব।’
১৯৯৬ সালের ২৭ মার্চ ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভূক্ত করে তখনকার বিএনপি সরকার। এ সংশোধনীর বৈধতা প্রশ্নে ১৯৯৮ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন এম সলিম উল্লাহসহ তিন আইনজীবী। শুনানি নিয়ে রুল দেয় হাইকোর্ট। ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বৈধ ঘোষণা রায় দেয় হাইকোর্ট। পরে হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে আপিল বিভাগে আপিল করে রিটকারীপক্ষ।
২০১০ সালের ১০ মে আপিল মঞ্জুর করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় তখনকার প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ। গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ২৫ আগস্ট সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষে বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করেন। এরপর পৃথক সময়ে একই বিষয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এ মামলায় পক্ষভুক্ত হয়।