থাকছে না বিআরটিএর ড্রাইভিং লাইসেন্স কর্তৃত্ব

ড্রাইভিং লাইসেন্স পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। বর্তমানে এ লাইসেন্স ইস্যু করে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। সংস্থাটির বিরুদ্ধে চরম অদক্ষতার অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া লাইসেন্স পেতে ঘুষ ও হয়রানির শিকার হতে হয় সংশ্লিষ্টদের। এ অবস্থায় বিআরটিএর কাছ থেকে এ দায়িত্ব কেড়ে নিয়ে দেওয়া হবে সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে। এ ছাড়া সরকার মনোনীত বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকেও এ প্রশিক্ষণ নেওয়া যাবে। যেসব প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ দেবে তারাই লাইসেন্স ইস্যু করবে। লাইসেন্স পেতে ন্যূনতম ৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ নিতে হবে, যা বাধ্যতামূলক।

গতকাল বুধবার জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৫ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান লাইসেন্স ইস্যু পদ্ধতির সংস্কারের কথা জানান।

প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে, মারাত্মক আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে আরও অনেক মানুষ। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক যুগে সারা দেশে ৬৭ হাজার ৮৯০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৭২৬ জন নিহত হয়েছে। পঙ্গুত্ব বরণ করেছে আরও বেশি। এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ চালক, যাত্রী ও পথচারীদের অসচেতনতা ও চালকদের অদক্ষতা।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক এক প্রশ্নের জবাবে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের এ উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে এ দেশের মানুষ দীর্ঘদিন হয়রানির শিকার হচ্ছে। সরকার সরাসরি সেবা দিতে পারে না। সরকার পলিসি ঠিক করবে। সরাসরি সেবা দিতে গেলেই সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা দুর্নীতিতে জড়ায়। সরকারের পক্ষে অনেক বেশি লোক নিয়োগ দিয়ে সেবা সহজ করাও সহজ কাজ নয়। সরকারের আমলারা জনগণের দুর্ভোগটা বুঝতেই পারেন না। কারণ, তাদের লাইন ধরে হয়রানি ভোগ করতে হয় না। লাইসেন্সের জন্য তাদের বিআরটিএতে যেতেই হয় না। কাজেই ড্রাইভিং লাইসেন্স বিকেন্দ্রীকরণ করা দরকার। এ ক্ষেত্রে একটি ভালো মডেল অনুসরণ করা দরকার। শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া বা ভিয়েতনাম যে মডেল অনুসরণ করেছে, আমরাও সে ধরনের একটা মডেল অনুসরণ করতে পারি।’

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের অনুষ্ঠানে ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘ড্রাইভিং লাইসেন্সের কর্তৃত্ব আর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হাতে থাকবে না। সড়কে নিরাপদ ও যানজটমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক লাগবে। ৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ নিতে হবে লাইসেন্স নিতে হলে। প্রশিক্ষণ ভাতাও দেওয়া হবে। সড়কের সাইন যেন বুঝতে পারেন, গাড়ি যেন ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। শারীরিক সামর্থ্য, ডোপ টেস্ট করা হবে। সম্ভব হলে আগামী মাসের মধ্যে প্রশিক্ষণ শুরু করব।’

সড়ক উপদেষ্টা জানিয়েছেন, যেসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা রয়েছে, সেসব এলাকায় মোটরসাইকেল চালকদের ১০ হাজার হেলমেট বিতরণ করা হবে। এ ছাড়া সড়কে দুর্ঘটনাকবলিতদের পরিবারকে দ্রুত ৫ লাখ টাকা করে সহায়তা পৌঁছে দিতে বিআরটিএকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পের আওতায় সড়কে দুর্ঘটনাকবলিত যাত্রীদের দ্রুত হাসপাতালে নিতে হাইওয়েতে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান ফাওজুল কবির খান।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মো. খোদা বখস চৌধুরী। রাজধানীর হাতিরঝিলের সড়ক ভবন মিলনায়তনে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সেতু বিভাগে সচিব মো. আবদুর রউফ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান, বিআরটিএ চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলমসহ অনেকে।

অন্তর্বর্তী সরকারে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ সহকারী মোহাম্মদ খোদা বখস চৌধুরী বলেন, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, চালকদের আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী শিক্ষা দিতে পারিনি আমরা।’ আধুনিক ড্রাইভিং স্কুল তৈরি করে চালকদের আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

শোভাযাত্রা : জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৫ উদযাপন উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকাল ১০টায় হাতিরঝিল থেকে সড়ক ভবন পর্যন্ত শোভাযাত্রা বের করা হয়।