ঢাকায় মাথাপিছু আয় জাতীয় গড়ের দ্বিগুণ

বর্তমানে ঢাকা জেলার মানুষের মাথাপিছু আয় ৫ হাজার ১৬৩ ডলার। যা জাতীয় পর্যায়ে মাথাপিছু আয়ের প্রায় দ্বিগুণ। জাতীয় পর্যায়ে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২০ ডলার। এ ছাড়া দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৪০ শতাংশই ঢাকায়। আর দেশের মোট রপ্তানিরও ৪০ শতাংশ সম্পন্ন হয় ঢাকা থেকে। দেশে যতসংখ্যক মানুষ শহরে বাস করে তাদের ৩২ শতাংশ ঢাকা জেলায় বসবাস করেন এবং দেশের মোট জনসংখ্যার ১১ দশমিক ২ শতাংশ ঢাকা জেলায় বসবাস করে। এটি একটি অর্থনৈতিক হাব। দেশের ৭৫০টি নিবন্ধিত কোম্পানির প্রধান কার্যালয় ঢাকায়। জিডিপিতে ঢাকার অবদান ৪৬ শতাংশ।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্র্রিজের (ডিসিসিআই) এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা থেকে জানা যায়, ঢাকার জেলার অর্থনীতির সামগ্রিক সূচক অনুযায়ী উৎপাদন খাতের অবদান ৫৬ শতাংশ এবং সেবা খাতের অবদান ৪৪ শতাংশ। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি গবেষণার মাধ্যমে এ ধরনের ব্যবসায়িক সূচক এবারই প্রথম প্রকাশ করল এবং প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর এই সূচক প্রকাশ করার ঘোষণা দিয়েছে।

গতকাল মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক’ প্রণয়ন শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ এবং মূল বক্তব্য এবং গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ঢাকা চেম্বারের মহাসচিব (ভারপ্রাপ্ত) ড. এ কে এম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী।

গবেষণায় বলা হয়েছে, উৎপাদনমুখী খাতের ৫৬ শতাংশের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের অবদানই ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ছাড়া খাদ্যপণ্যের অবদান ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ, টেক্সটাইলের অবদান ৯ দশমিক ৩ শতাংশ, রাবার এবং প্লাস্টিক খাতের ৭ দশমিক ৭ শতাংশ, ফার্মা এবং মেডিসিন কেমিক্যালের ২ দশমিক ৭ শতাংশ, বেসিক মেটালের ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, লেদার এবং লেদার গুডসের ২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং অন্যান্য পণ্যের অবদান ২ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া সেবা খাতের ৪৪ শতাংশ অবদানের মধ্যে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসার অবদান ৬০ দশমিক ২ শতাংশ, আবাসন খাতের অবদান ১৯ শতাংশ এবং পরিবহন খাতের অবদান ২০ দশমিক ৮ শতাংশ।

মাইক্রো, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় শিল্পের (সিএমএসএমই) অবদান আলাদা করে দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ক্ষুদ্র, যার অবদান ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এ ছাড়া ছোট প্রতিষ্ঠানের অবদান প্রতিষ্ঠানের অবদান ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ, মাঝারি খাতের অবদান ১০ দশমিক ১ শতাংশ এবং বড় শিল্পের অবদান ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। 

ঢাকার চেম্বার বলছে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের গতি-প্রকৃতির বাস্তবচিত্র উদঘাটনের মাধ্যমে বিদ্যমান অবস্থা উন্নয়নে করণীয় নির্ধারণে এই সূচক প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ পরিমাপের জন্য স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বেশকিছু সূচকের কার্যক্রম রয়েছে। যদিও এসব সূচক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড কীভাবে এবং কেন পরিবর্তিত হচ্ছে তার প্রকৃত চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে না। এ প্রেক্ষিতে ডিসিসিআই ‘অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে এর কার্যক্রম রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক হলেও পরর্বতীতে ধাপে ধাপে সারা দেশে সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ত্রৈমাসিক ভিত্তিকে প্রকাশিতব্য এ সূচকের মাধমে বিশেষ করে শিল্প খাতে উৎপাদন, বিক্রয়, অর্ডার প্রবাহ, রপ্তানির প্রবণতা, কর্মসংস্থান, ব্যবসায়িক আস্থা এবং বিনিয়োগের প্রবৃত্তি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া পাবে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় ঢাকা চেম্বারের মহাসচিব (ভারপ্রাপ্ত) ড. এ কে এম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ সময়ে এ গবেষণাটি পরিচালিত হয়, যেখানে মোট ৬৫৪ জন উত্তরদাতার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে উৎপাদন খাত থেকে ৩৬৫ জন এবং সেবা খাত থেকে ২৮৯ জন। তিনি জানান,  আটটি উৎপাদন শিল্প থেকে বাছাই করা হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে খাদ্যপণ্য, টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য,  ফার্মাসিউটিক্যালস, ঔষধি রাসায়নিক ও উদ্ভিজ্জ পণ্য, রাবার ও প্লাস্টিকপণ্য, অন্যান্য অ-ধাতব খনিজ এবং মৌলিক ধাতু, এ ছাড়াও পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য, স্থল পরিবহন এবং রিয়েল এস্টেট কার্যক্রম ৩টি সেবা খাত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, তৈরি পোশাক খাত অনেক ধরনের সুবিধা বেশি পাচ্ছে, তাই এর সঙ্গে অন্যান্য খাতের তুলনার বিষয়টি তেমন যৌক্তিক নয়। দেশের এসএমইরা কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি, যদিও এ খাতের উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন আশানুরূপ নয়। ডিসিসিআইয়ের ইনডেক্সের বিষয়ে তিনি বলেন, তথ্য বিশ্লেষণের বিষয়টি শুধু নিজেদের মধ্যে করলে হবে না, আমাদের প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে এর তুলনামূলক মূল্যায়ন জরুরি। অর্থনীতির সব সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা বেশ নাজুক, এর অন্যতম কারণ হলো সরকার প্রস্তাবিত সংস্কার কার্যক্রমগুলো ভালোভাবে মূল্যায়ন করছে না।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি অর্গানাইজেশন (এনপিও)-এর মহাপরিচালক মো. নূরুল আলম বলেন, গবেষণা কার্যক্রমে তথ্য সংগ্রহে আরও সচেতন হতে হবে, যা প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়নে আরও সহায়ক হবে এবং শিল্পসংশ্লিষ্ট সেবা প্রাপ্তির বিষয়টি কি ধরনের প্রভাব ফেলে তা নির্ধারণের ওপর জোরারোপ করা আবশ্যক।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন প্রজেক্ট (এসএসজিপি)-এর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ নেসার আহমেদ বলেন, এলডিসি উত্তরণের আগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদ্যমান সুবিধার বেশিরভাগই বাংলাদেশ ব্যবহার করেছে, তাই এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী সময়ে এ সুবিধা বঞ্চিত হওয়া পরিবেশ মোকাবিলায় আমাদের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।  

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন বলেন, অর্থনীতি, শিল্প খাত, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার ওপর বিদেশি উদ্যোক্তাদের আস্থা থাকলেই, বিনিয়োগ প্রাপ্তির পাশাপাশি বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ সম্ভব। তিনি কৃষি খাতকে এ গবেষণায় অন্তর্ভুক্তির আহ্বান জানান, যা দেশের অন্যতম বড় খাতের অবস্থা নির্ণয়ে সহায়ক হবে।   

বিএফটিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সাইফ উদ্দিন আহমেদ দেশের বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের সঙ্গে ঢাকা চেম্বারের গবেষণার তথ্যের সমন্বয়ের ওপর জোরারোপ করেন, সেই সঙ্গে এ গবেষণায় খাত ভিত্তিক আরও বহুমুখী তথ্যের সংযোজনের সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। এ ছাড়াও হালকা প্রকৌশল, সেবা খাতসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে এ জরিপে সম্পৃক্ত করার তিনি প্রস্তাব করেন।  

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (এসএমইএসপিডি) নওশাদ মোস্তফা বলেন, এসএমইদের জন্য নীতিমালা ইতিমধ্যে বেশ সহজীকরণ করা হয়েছে, তবে ঋণপ্রাপ্তিতে কি ধরনের সমস্যা পরিলক্ষিত হচ্ছে, উদ্যোক্তাদের থেকে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সে অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণ সহজতর হবে।