ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় ঘুষ ছাড়া পাওয়া যায় না পুলিশ ক্লিয়ারেন্স। অভিযোগ আছে কাগজপত্র ঠিক থাকুক আর না থাকুক ক্লিয়ারেন্সের জন্য ঘুষ দিতেই হয় থানার পুলিশ সদস্যদের।
স্থানীয় অনেকে জানান, গত (৫ আগস্ট) সাধারণ জনগণ তাদের ক্রোধ থেকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় হামলা চালানোর পরে কয়েক মাস ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ ছিলো। তবে কয়েক মাস যেতে না যেতেই আবারো শুরু হয়েছে ঘুষ লেনদেন। এতে করে থানায় সেবা নিতে আসা অনেকেই ভোগান্তিতে পড়ছে।
পুলিশ ক্লিয়ারেন্স রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও অপরাধীদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে এবং আবেদনকারী কোন ব্যক্তি তার এলাকায় অপরাধমূলক কার্যকলাপের তথ্য আছে কি না, তা যাচাই করতে সাধারণত পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দরকার হয়। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস অবশ্যই প্রয়োজন পড়ে। সেই ডকুমেন্টস গুলো প্রথম শ্রেণির গ্যাজেট অফিসার দ্বারা সত্যায়িত হতে হয়। তবে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় ঘুষ দিলেই মিলছে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য পাসপোর্টে দেয়া স্থায়ী অথবা বর্তমান যে কোনো একটি ঠিকানায় আবেদন করতে হয়। এটি হতে হবে মেট্রোপলিটন বা জেলা পুলিশের আওতাধীন অঞ্চলে। যদি পাসপোর্টে ঠিকানা উল্লেখ না থাকে তবে ঠিকানার প্রমাণস্বরূপ ন্যাশনাল আইডি কার্ড বা স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলের দেয়া জন্ম সনদের ফটোকপি ১ম শ্রেণির সরকারি গেজেটেড কর্মকর্তাকে দিয়ে সত্যায়িত করে স্ক্যান করতে হবে। আবেদনকারী যদি দেশের বাইরে অবস্থান করেন তাহলে তার পক্ষে দেশে থাকা যে কেউ আবেদন করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে তিনি যে দেশে অবস্থান করছেন সে দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস-হাইকমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সত্যায়িত পাসপোর্টের তথ্য পাতার ফটোকপির স্ক্যানকপি প্রয়োজন।
সম্প্রতি দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে উঠে আসে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার পুলিশ ক্লিয়ারেন্সে ঘুষ বাণিজ্যের তথ্য চিত্র। গোপন ক্যামেরায় ধরা পরে কাগজপত্র ঠিক থাকার পরেও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স করানোর জন্য দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এক এ এসআইকে দিতে হচ্ছে ঘুষ।
ঘুষ নেওয়া ঐ পুলিশ সদস্য জানান, পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য নেওয়া ঘুষের টাকা চার ভাগ করা হয়। এক ভাগ পায় থানার ওসি, এক ভাগ দিতে হয় এস পি অফিসে, এক ভাগ দিতে হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এবং এক ভাগ তার নিজের। ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে ঐ পুলিশ সদস্য জানান, আবেদনকারীর বিরুদ্ধে থানায় কোন মামলা না থাকার শর্তে, কাগজপত্র না থাকলেও শুধু মাত্র পাসপোর্ট আর এনআইডি কার্ড থাকলেই থানা থেকে টাকার বিনিময়ে সে করে দিতে পারবে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স। এতে করে অপরাধীদের দেশ ত্যাগ সহজ হয়ে যাচ্ছে। তবে সরাসরি ক্যামেরা নিয়ে ঐ এ এস আই সদস্যের মুখোমুখী হলে ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানায় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় তাদের ঘুষ দেওয়ায় কথা।
মো. রাকিবুল ইসলাম নামে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সংগ্রহ করা এক ব্যক্তি জানান, দক্ষিণ কেরাণীগন্জ থানায় পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য গিয়েছিলাম। অভিজ্ঞতা খুবই বাজে। আমার কাছে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স করতে বিশ হাজার টাকা চাইছে। আমার সমস্যা হলো পাসপোর্টে লেখা জাজিরা (অষ্টদোনা), আইডি কার্ডে লেখা জাজিরা, অষ্টদোনা। একটা ব্রাকেটের জন্য বিশ হাজার টাকা চায়। আমি গেছি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স করতে, আমারে জিজ্ঞেস করে ভিসা আসছে নাকি আসবে। আমি বললাম ভিসার জন্য জমা দেওয়া লাগবে। বলে টাকা লাগবে বিশ হাজার আর নইলে আইডি কার্ড ঠিক কইরা আনো, নতুন পাসপোর্ট কইরা আনো। যেহেতু ৫ আগস্টের পরে গেছি সাহস নিয়া যেই দুই একটা যুক্তি দিলাম তাকে। কিন্তু কাজ হয় নি, আমার সঙ্গে অনেক বাজে ব্যবহার করে কাগজপত্র ফেরত দিয়ে দিয়েছে।
মো. সাইফুল নামে আগানগরের একজন জানান, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বলা হয় ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তাদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তাই সরকার সর্বোচ্চ সম্মানের জায়গায় রেখেছে তাদের। এই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বিদেশে যাওয়ার আগে কী পরিমাণ হয়রানির শিকার হন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলা। আমি প্রবাসী বাঙালী। আমার কাগজপত্র ঠিক থাকার পরেও, পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এক এস আই আমার কাছ থেকে মোটা অংকের ঘুষ নিয়েছে। বিদেশে আসতে হবে তাই কোন ঝামেলা না করে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছি।
শুভাঢ্যার অপর এক ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর জানান, পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় আবেদন করলে, তদন্তকারী কর্মকর্তা এক এ এস আই আমাকে ফোন দিয়ে ডেকে এনে প্রথমে ২ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে আমি টাকা দিতে অপরাগতা জানালে করতে পারবে না বলে জানান। পরবর্তীতে নানা জটিলতার কথা বলে আবারও ৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরবর্তীতে আমি ২ হাজার টাকা ঐ পুলিশ সদস্যকে দিতে বাধ্য হই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার সামনে এক দোকানি জানান, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স করার জন্য থানায় একাধিক দালালের লিংক রয়েছে। এই দালালদের টাকা দিলেই মিলে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স। ওরা থানায় গিয়ে কাগজপত্র হাতিয়ে নিজেদের করা সার্টিফিকেট গুলো বের করে নিয়ে আসে। দালাল সিন্ডিকেটে টাকা দিলেই পাওয়া যায় সোনার হরিণ নামক পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের।
এ বিষয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা অফিসার ইনচার্জ সৈয়দ মোহাম্মদ আক্তার হোসেন ক্যামেরার সামনে কথা বলতে না চাইলেও জানান, তার থানায় ঘুষ লেনদেন হয় না। এছাড়া কেও ঘুষ নিয়ে থাকলে অভিযোগ দেওয়া সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান তিনি।
কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাকে ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেন নি, তার অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায় নি।