আফগানিস্তান পাকিস্তান বিরোধ নেপথ্যে কী?

আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই। তখন আফগানিস্তান ছিল একমাত্র দেশ, যারা পাকিস্তানকে জাতিসংঘে স্বীকৃতি দানে বিরোধিতা করেছিল। মূলত সীমানা নিয়ে বিরোধের জের ধরে, এমন বিরোধিতা ছিল আফগানিস্তানের। ১৮৯৩ সালে প্রথম দেশ দুটির মধ্যে ‘ডুরান্ড লাইন সীমানা নির্ধারণী’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু সীমান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদীকে সহায়তার জের ধরে ১৯৪৯ সালে প্রথমে পাকিস্তান আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালায় এবং এর জের ধরে চলে যুদ্ধ। এরপর ছোট ছোট অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয় দেশ দুটির মধ্যে। ১৯৬১ সালে দেশ দুটি পরস্পরের মধ্যে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করলে আফগানিস্তানে বহু নাগরিক পাকিস্তানে শরণার্থী হয়। কিন্তু ১৯৯২ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর দেশ দুটি শান্ত থাকে। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে, পুনরায় আফগানিস্তানের নাগরিক পাকিস্তান ও ইরানের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়। ২০২১ সালের জুলাই মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে চলে যায় এবং একই বছরের আগস্ট মাসে তালেবান বাহিনী বাগরাম বিমানঘাঁটি দখল করলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাগরাম বিমানঘাঁটি ছেড়ে চলে যায়। এখন প্রশ্ন হলো, দেশ দুটি নতুন করে তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে শান্ত থাকলেও হঠাৎ করে সীমান্ত বিরোধ শুরু হয় কেন? যার প্রেক্ষিতে ৯ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে পাকিস্তান আফগানিস্তানের ভেতরে বিমান হামলা চালায় এবং ১১ অক্টোবর পাল্টা আক্রমণ চালায় আফগানিস্তান।

২০০১ সালে আগস্টে তালেবান কাবুল দখল করলে, পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ খাইবার পাখতুনখাওয়া বা কেপি সেখানে তালেবান সশস্ত্র যুদ্ধে নেমে পড়ে এবং পাকিস্তানে আগে থেকেই বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতা আন্দোলন চলছিল। তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির কেপিতে সক্রিয় হওয়া মাত্র দেশটির সশস্ত্র বাহিনী, দুটি প্রদেশের বিশাল এলাকা জুড়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। কেবল ২০২৪ সালে কেপিতে পাকিস্তানের আড়াই হাজার সামরিক ও বেসামরিক মানুষ মারা গেছেন। প্রকৃত অর্থে এর ক্ষয়ক্ষতি আরও বেশি। কিন্তু পাকিস্তান আফগানিস্তানে হামলার ঘটনার সূত্রপাত কাবুল ও কান্দাহারে পাকিস্তানের বোমাবর্ষণ থেকে। টিটিপির নেতা নুরওয়ালি মেসুদকে হত্যা করতে তারা আফগানিস্তানে হামলা চালিয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় আফগান তালেবান যোদ্ধারা, পাকিস্তানের অনেকগুলো সীমান্ত চৌকিতে হামলা চালায়। এর ফলে ব্যাপক ক্ষতি হয় উভয় দেশে। হঠাৎ করে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটি পুনরায় দখলের আহ্বান জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুরু হয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন সমীকরণ ও জল্পনা-কল্পনা। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, নতুন করে আফগানিস্তান-পাকিস্তান দেশ দুটির মধ্যে পরস্পরকে আক্রমণ বা যুদ্ধ যা বাগরাম বিমানঘাঁটি দখলের একটি চেষ্টা মাত্র। আবার পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (এসএমডিএ) স্বাক্ষর হয়েছে। যে চুক্তিটিকে অনেকেই মনে করছেন, এটি মুসলিম বিশ্বের ন্যাটো। পাকিস্তান এখন নিজেকে অনেক বেশি শক্তিশালী মনে করছে। তার দাম্ভিকতা বা অহমিকা থেকেই আফগানিস্তানে হামলা করছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাম্ভিকতা স্বাধীনতার পর থেকেই। এ রাষ্ট্রে কখনো গণতন্ত্র ছিল না, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও আফগানিস্তান যুদ্ধ যার প্রমাণ। আর বাংলাদেশের কথা না-ই বললাম। সৌদি আরব ও পাকিস্তান রাষ্ট্র দুটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একান্ত অনুগত দুটি রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্র দুটি কখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদ বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে না। সুতরাং দেশ দুটির  চুক্তি মুসলিম বিশ্বে খুব একটি প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি কূটকৌশল মাত্র। যদিও সৌদি আরব ও কাতারের মধ্যস্থতায় পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছে বলে মনে হয়।

কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাগরাম বিমানঘাঁটি দখল করতে চায়? বাগরাম বিমানঘাঁটি আফগানিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি ছিল। এটি কাবুলের প্রায় ৬০ কিলোমিটার উত্তরে পারওয়ান প্রদেশে অবস্থিত। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ই আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিল এবং বাগরাম ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘাঁটি ছিল। এক সময় বাগরাম যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি ছিল। কারণ এখানে একাধিক রানওয়ে ও হেলিপ্যাড রয়েছে এবং প্রায় ৪০ হাজার সেনার আবাসন সুবিধা রয়েছে। বাগরাম এমন এক ঘাঁটি, যেখান থেকে পুরো আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চল সহজেই আচ্ছাদিত করা যায় এবং আকাশ ও স্থল উভয় অভিযান পরিচালনার জন্য আদর্শ একটি ঘাঁটি। অর্থাৎ ভারত, ইরান, চীন ও রাশিয়াকে খুব সহজে আকাশ ও স্থলপথে আক্রমণ করা যাবে। আর এ কারণেই বাগরাম বিমানঘাঁটি পুনরায় দখলের আহ্বান জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আবার অনেক কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ব্যাখ্যা করছেন যে, আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর বা ভারতপ্রীতির কারণে পাকিস্তান নাখোশ, তাই এ হামলা। যদি তাই হয় তাহলে ছোট যুদ্ধ হতে পারত, এত বড় হামলা হওয়ার কথা নয়। একটাই কারণ, এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা এবং মার্কিন বাহিনীর আফগানিস্তানে প্রয়োজনীয়তা আছে বিষয়টি জোরালোভাবে প্রমাণ করা। যার হাতিয়ার হতে পারে এ যুদ্ধটি।

এটি সত্য যে, আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক চাপ থেকে উত্তরণ ও বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করাই একমাত্র উদ্দেশ্য। এ কারণেই ভারতকে কাছে টানছে আফগানিস্তান। এমনটা মনে করেন, অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। এ বিষয়গুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশকে কৌশলী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদ-বিভাজন দূর করা। অন্যথায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত বা মানবিক করিডরকে কেন্দ্র করে দেখা দিতে পারে ভিন্ন সংকট। সুতরাং প্রতিটি ঘটনা থেকে, ইতিবাচক রাষ্ট্রনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করা দরকার।

লেখক : আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

aktarrofikul@gmail.com