নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) দিনদিন পরিণত হচ্ছে মাদকের স্বর্গরাজ্যে।
নিয়মিতই ঘটছে মাদক উদ্ধারের ঘটনা, পাশাপাশি বাড়ছে অশ্লীলতা। তবে এসব ঘটনায় প্রশাসনের নীরব ভূমিকা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনা নতুন করে জন্ম দিয়েছে আলোচনা-সমালোচনার। জানা যায়, গত ২২ অক্টোবর (বুধবার) অর্থনীতি বিভাগের এক ছাত্র ও ছাত্রীকে রাতের বেলায় ক্যাম্পাসের প্রশান্তি পার্কে ‘আপত্তিকর অবস্থায়’ আটক করেন প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা।
পরের দিন ২৩ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) ওশানোগ্রাফি বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে মাদকাসক্ত অবস্থায় আটক করে ছাত্র পরামর্শক অফিসে নিয়ে যান কয়েকজন শিক্ষার্থী। সেখানে উপস্থিত সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দের সামনেই ওই শিক্ষার্থী উগ্র আচরণ করেন।
সর্বশেষ ২৫ অক্টোবর (শনিবার) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট ভবনে আইআইটি বিভাগের এক ছাত্র ও ছাত্রীকে ‘উলঙ্গ অবস্থায়’ হাতেনাতে ধরেন সিনিয়র কয়েকজন শিক্ষার্থী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু স্থানে রাতে শিক্ষার্থীদের চলাচল কম হওয়ায় সেখানে মাদকাসক্তদের আড্ডা বসে।
অন্ধকারাচ্ছন্ন এসব জায়গায় চলে অশ্লীল কর্মকাণ্ড। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো হলো প্রশান্তি পার্ক, একাডেমিক ভবন-৩ এর নির্মাণাধীন কক্ষগুলো, নীলদিঘির পার্শ্ববর্তী স্থান, প্রভোস্ট বিল্ডিং এলাকা, মন্দিরসংলগ্ন জায়গা ও ময়নারদ্বীপ। বিশেষ করে রাত নামলেই এসব স্থানে শুরু হয় মাদকাসক্তদের আনাগোনা এবং অশ্লীলতার বিস্তার।
এছাড়া মাঝে-মধ্যে বহিরাগতরাও ক্যাম্পাসে এসে মাদকের আড্ডা বসায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এমন ঘটনা সার্বিক নিরাপত্তা ও নৈতিকতার চরম অবনতিকেই নির্দেশ করে বলে মনে করছেন অনেকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ সময় বহিরাগত মাদক ব্যবসায়ীরা এসে শিক্ষার্থীদের কাছে মাদক সরবরাহ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পকেট গেট, আলু ওয়ালার মোড় ও প্রধান গেট সংলগ্ন এলাকাতেই হয় মাদকের আদান-প্রদান।
মাঝেমধ্যে তারা ক্যাম্পাসের ভেতরেও প্রবেশ করে মাদক সরবরাহ করে। মাদকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় গাঁজার।
এদিকে অশ্লীলতা ও মাদকসংক্রান্ত শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্স বিভাগের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী লাইলাতুল জান্নাত (লিজা) বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পাসে মাদক সেবনের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ ও ক্যাম্পাসের ভেতরে মাদক সেবনের ঘটনায় আমরা নারী শিক্ষার্থীরা গভীর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।
দুঃখজনকভাবে প্রশাসন ও প্রক্টরিয়াল বডির দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখনো দেখা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি—মাদকবিরোধী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে একটি নিরাপদ, মাদকমুক্ত ও শিক্ষাবান্ধব ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা হোক।”
এপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. মেহেদী হাসান বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় যা শিক্ষার পবিত্র স্থান হওয়ার কথা, সেখানে এখন প্রায়ই দেখা যাচ্ছে কিছু শিক্ষার্থী মাদক সেবনের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কয়েকজন হাতে-নাতে ধরা পড়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই উদাসীনতা কেবল প্রশাসনের দায়িত্বহীনতারই প্রমাণ নয়, বরং এটি অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে।
তিনি আরও বলেন, মাদক সেবন শুধু ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না, এটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক পরিবেশকে বিষিয়ে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয় একটি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে আসে। কিন্তু মাদকের ছোঁয়ায় সেই পরিবেশ নষ্ট হয়ে পড়ছে।
অনেক শিক্ষার্থী এখন আতঙ্ক ও হতাশায় ভুগছে, কারণ ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও নৈতিক মান দ্রুত অবনতি ঘটছে। শিক্ষার পরিবেশ হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক গতি ও মর্যাদা। এখনই সময় প্রশাসনের কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার। মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে, জড়িতদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনে বহিষ্কারসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।”
এদিকে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি উদ্বিগ্ন শিক্ষক সমাজও। এসব ঘটনাকে শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও জ্ঞানচর্চায় অনীহা সৃষ্টির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মহিবুল ইসলাম বলেন, “সম্প্রতি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদকাসক্তির যে বিস্তার, তা কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক সংকটের প্রতিফলন। এই প্রবণতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চা ও নৈতিক মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তাই প্রশাসনিক পদক্ষেপের (মাদক নিয়ন্ত্রণ, তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি বন্ধ, ভিজিল্যান্স বৃদ্ধি, পুনর্বাসন কার্যক্রম) পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিক পুনর্গঠন ও সচেতনতামূলক সামাজিক উদ্যোগ (নৈতিক শিক্ষার প্রসার, মাদকাসক্তির পরিণাম সম্পর্কে সভা-সেমিনার ইত্যাদি আয়োজন) অত্যন্ত জরুরি।”
মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ এফ এম আরিফুর রহমান বলেন, “কোনো ব্যক্তি প্রক্টরিয়াল বডির হাতে তুলে দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটলেও, প্রক্টর নিশ্চিত করেছেন যে দায়িত্ব কেবল তাদের নয়। আনসার, পুলিশ, প্রভোস্ট এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষও যৌথভাবে কাজ করবে।”
তিনি আরও বলেন, “হোস্টেল ও ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা নিশ্চিত না হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। টিউশন কার্ডসহ ছাত্রীদের রাত ৯টা ৩০ মিনিটের মধ্যে এবং টিউশন কার্ড ছাড়া ছাত্রীদের রাত ৯টার মধ্যে হলে প্রবেশ করতে হবে।
হলে গেট যথাসময়ে বন্ধ রাখলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। প্রক্টরিয়াল বডি প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় বজায় রাখবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে যাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন, “আমি এ বিষয়ে অবগত ছিলাম না। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখব এবং প্রক্টরিয়াল বডিকে আরও শক্তিশালী করব। বরাবরের মতোই মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বহাল থাকবে এবং প্রমাণ মিললেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”