মির্জা ফখরুল

সনদ বাস্তবায়নে আদেশ জারির এখতিয়ার সরকারের নেই

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের খসড়া আদেশ জারির এখতিয়ার সরকারের নেই। ঐক্যমত কমিশনের প্রস্তাব জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট হতে পারে। এর আগে করার প্রস্তাব অযৌক্তিক ও  অপ্রয়োজনীয়। সংসদ নির্বাচনের মতো এত বড় কর্মযজ্ঞের আগে সেই সুযোগ ও সময় কোনোটাই নেই।

সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে তিনি বলেন, জুলাই সনদ প্রস্তাবে বলা হয়েছে সংস্কার প্রস্তাব ২৭০ দিনের মধ্যে কার্যকর না করলে আপনাআপনি সংবিধানে সংযুক্ত হয়ে যাবে। এ ধরনের প্রস্তাব অগণতান্ত্রিক ও হাস্যকর। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। এ সময় বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এক নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সূচনা হয়। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্র ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার, জাতির প্রত্যাশা এবং শহীদদের আকাঙ্খা পূরণের এক ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিএনপি গণঅভ্যুত্থানের প্রায় এক বছর পূর্বেই ২০২৩ সালে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে জাতির সামনে ৩১ দফা উপস্থাপন করে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এর পূর্বে ২০২২ সালে ২৭ দফা, ২০১৭ সালে ভিশন ২০৩০ প্রকাশ করে। অতএব, বিএনপি ও ফ্যাসিস্ট বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, ব্যক্তিগত শক্তিসমূহ জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সার্বিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ও ঐক্যের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে আসছে। সুতরাং রাষ্ট্র কাঠামোর প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কার বিএনপির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি। সংস্কার কমিশনগুলোর কাছে আমরা সংবিধান, বিচার বিভাগ, নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ প্রশাসন সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের দলের পক্ষ থেকে বিস্তারিত মতামত প্রদান করেছি। অন্যান্য রাজনৈতিক দলসমূহ তাদের মতামত প্রদান করেছে। পরবর্তীতে উক্ত ছয়টি সংস্কার কমিশনের সাথে আমাদের এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের দীর্ঘ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত ছয়টি সংস্কার কমিশন কর্তৃক প্রণীত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ওপরই দফাভিত্তিক আলাপ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই সমস্ত আলাপ আলোচনার ফলস্বরূপ জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন গঠিত হয়, যার সভাপতি মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সাথে রাজনৈতিক দলসমূহের প্রথম বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, সমস্ত বিষয়েই রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সেই বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে একটি জাতীয় সনদ প্রণীত ও স্বাক্ষরিত হবে। পরবর্তীতে নির্বাচিত জাতীয় সংসদে সেই সনদের বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা হবে। জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া বিভিন্ন ভাষণে তার এই বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছেন। জুলাই ঘোষণাপত্রেও এই বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে।

জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের দীর্ঘ ধারাবাহিক আলোচনায় কিছু কিছু বিষয়ে কিছু কিছু রাজনৈতিক দলের ভিন্ন মত নোট অব ডিসেন্ট সহকারে ঐকমত্য হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ যেভাবে প্রণীত হয়েছে, তাতে নোট অব ডিসেন্টের এই অংশ স্পষ্ট উল্লেখ আছে:  ভিন্নমত প্রদানকারী কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তারা সে মতে ব্যবস্থা নিতে পারে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, জুলাই সনদ ২০২৫-এ সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত বিষয়গুলো দুটি বিকল্প পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের এবং আইনগত ভিত্তি প্রদানের জন্য সরকারের কাছে পেশ করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এ সন্নিবেশিত সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিষয়গুলো কার্যকর করার উদ্দেশ্যে সরকার জুলাই সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ নামে একটি আদেশ জারি করবে। এরকম প্রস্তাবিত আদেশের খসড়া সংযুক্তি ২-এ, সংযুক্তি ৩-এ সংযুক্ত করা হয়েছে। সরকার এরকম আদেশ জারি করার এখতিয়ার নাই। সংবিধানের ১৫২ নম্বর অনুচ্ছেদের সংজ্ঞা অনুসারে আদেশ আইনের মর্যাদা প্রাপ্ত। অতএব সেটি জারি করার এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। বিকল্প প্রস্তাব ১-এ সরকার জুলাই সংসদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া বিল গণভোটে উত্থাপন করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিলের তফসিল ১-এ সংস্কার প্রস্তাবসমূহ সন্নিবেশিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বলা হয়েছে, বিল সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হবে। বিলে উল্লেখ করা হয়েছে সংবিধান সংশ্লিষ্ট তফসিল অ্যাক্ট বর্ণিত ৪৮টি দফার জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত দফাগুলো ওপর গণভোট হবে। উক্ত দফাসমূহের বিপরীতে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত রাজনৈতিক দলসমূহের মতামত, ভিন্নমত, নোট অফ ডিসেন্ট উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ ঐক্যমত্য কমিশনের প্রস্তাব এবং সুপারিশ একপেশে ও জবরদস্তুমূলক জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তাহলে এটাই প্রতীয়মান হয় দীর্ঘ এক বছর ব্যাপী সংস্কার কমিশন, জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সাথে রাজনৈতিক দলসমূহের দীর্ঘকালব্যাপী আলোচনা ছিল অর্থহীন, অর্থ ও সময়ের অপচয়, প্রহসনমূলক এবং জাতির সঙ্গে প্রতারণা। 

বিএনপি মহাসচিব বলেন, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। সে কারণে সংলাপের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। কিন্তু ঐক্যমত্য কমিশন ভিন্নমত পোষণে রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক অধিকারকে আমলেই নেয়নি। উক্ত বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে জাতীয় সংসদ গড়ে তোলার পাশাপাশি একই সঙ্গে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গড়ে তোলা হবে। তারা আলাদাভাবে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। অর্থাৎ নির্বাচিত জাতীয় সংসদটি একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে অভিহিত হবে। প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদ এবং রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়। ঐক্যমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি এজেন্ডাভুক্ত ছিল না। আলোচনার জন্য উপস্থাপিত হয়নি। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়ে কোনো ঐকমত্য হওয়ার অবকাশও ছিল না। উল্লেখ্য, জাতীয় কোনো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হলে তা পরবর্তী জাতীয় সংসদে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।