জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে গণভোটের মধ্যে কোনটি কখন হবে, নাকি একই দিন হবে, সে বিষয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সপ্তাহেই তার কাছ থেকে এ বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে। তবে সরকার, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন পর্যায় থেকে যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তাতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের সম্ভাবনা কম।
সরকারের ভেতরকার তথ্য অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টা ঐকমত্য কমিশনের কাছ থেকে পাওয়া জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশের বিষয়ে উপদেষ্টাদের সঙ্গে অনির্ধারিত আলোচনা করেছেন। গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত বৈঠকের পর অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় উপদেষ্টাদের অনেকে সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠানের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। তবে মুহাম্মদ ইউনূস তখন এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, ‘গণভোট ইস্যুতে প্রধান উপদেষ্টা সিদ্ধান্ত নেবেন। যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক না কেন, (সংসদ) নির্বাচন ১৫ ফেব্রুয়ারির আগে হবে। কোনো শক্তি এটিকে পেছাতে পারবে না।’ গতকাল শুক্রবার নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) জুলাই কন্যা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে সরকারকে দেওয়া ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদন ও একই বিষয়ে গণভোট ইস্যুতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। এ ইস্যুতে কয়েকটি দল রাজপথে কর্মসূচি দেওয়ার কথাও বলছে।
এ প্রসঙ্গে প্রেস সচিব বলেন, ‘বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের মত জানিয়েছে। আমরা এটিকে হুমকি হিসেবে দেখছি না। যেটা সবচেয়ে উত্তম, প্রধান উপদেষ্টা সেটাই করবেন।’
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে উপদেষ্টাদের অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় কী কথা হয়েছে, তার ইঙ্গিত মেলে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুলের বক্তব্যে। গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের পর অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘গণভোটের সময়ের ক্ষেত্রে দুটি অপশন নিয়ে প্রাথমিক কথাবার্তা হয়েছে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’ উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত বৈঠকের পর অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়।
আসিফ নজরুল বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র বিরোধের মধ্যে সরকার কী করবে বুঝতে পারছে না। ২৭০ দিন আলাপ-আলোচনার পর এমন অনৈক্যের সুর হতাশাব্যঞ্জক।’
জুলাই সনদ বিষয়ে গত মঙ্গলবার লিখিত সুপারিশ দেওয়ার বাইরেও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের সদস্যদের অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। সেদিন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ সাংবাদিকদের জানান, জাতীয় নির্বাচনের দিনসহ তার আগে যেকোনো দিন সরকার জুলাই সনদের ওপর গণভোটের আয়োজন করতে পারে এ মর্মে ঐকমত্য কমিশন সুপারিশ দিয়েছে।
ঐকমত্য কমিশনের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় কমিশনের সদস্যরা সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে দেওয়ার বিষয়ে মত দেন। সবশেষে প্রধান উপদেষ্টাই সিদ্ধান্ত দেবেন। তার আগে হয়তো প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আবার বৈঠকে বসতে পারেন।
এ বিষয়ে আলী রীয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করা হয়েছে। এতে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে জুলাই জাতীয় সনদের সুপারিশ সরকারকে দেওয়া হয়েছে। এখন সরকার কতটা গ্রহণ করবে কিংবা না করবে, সেটা তাদের এখতিয়ার।
এদিকে সনদ বাস্তবায়নের জন্য চলতি নভেম্বরেই গণভোট চেয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) স্মারকলিপি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামপন্থি আটটি দল। ইসিতে আগামী ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। এমন অবস্থায় গণভোট আয়োজনের তেমন সুযোগ দেখছে না ইসি। আর সরকারের দিক থেকে গণভোটের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা না থাকায় সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি কিছুটা সংশয়েও আছে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, গণভোট নির্বাচনের আগে হবে না পরে হবে, এ বিষয়ে সরকার কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেটি ইসির কাছে এখনো পৌঁছায়নি। গতকাল পটুয়াখলী সার্কিট হাউজে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আগামী ফেব্রুয়ারিতে রমজান মাসের আগে (জাতীয়) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমরা নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা ইতিমধ্যে প্রকাশ করেছি। নির্বাচনের তফসিল ডিসেম্বরের প্রথম ভাগে আমরা ঘোষণা করব।’
ইসি কর্মকর্তারা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচনের মতোই দেশব্যাপী বিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে গণভোট করতে হয়। সময় ও প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতার কারণে আগে গণভোট আয়োজন বেশ কষ্টসাধ্য হতে পারে।
ইসির এক কর্মকর্তা বলেন, গণভোট করতে গেলে ভোটকেন্দ্র লাগবে। বেশিরভাগ ভোটকেন্দ্র হয়ে থাকে স্কুল ও কলেজে। সারা দেশে নভেম্বরে স্কুলগুলো বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাই নভেম্বরে ভোটকেন্দ্র পাওয়া বেশ জটিল হবে।
তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সময়স্বল্পতা কোনো অজুহাত হতে পারে না। নির্বাচন কমিশন চাইলে নভেম্বরে গণভোট করতে পারবে। জুলাই জাতীয় সনদ সম্পর্কে জনগণের ধারণা আছে। তারা তাদের মতামত দিতে পারবে।’
এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, জুলাই সনদ, তা বাস্তবায়নের উপায় ও গণভোটের বিষয়ে বিএনপি নিজেদের আপত্তির কথা জানাতে প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের কাছে প্রতিনিধিদল পাঠাবে। দলের আপত্তিগুলোর মীমাংসা চাইবেন তারা।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ আট দল জুলাই সনদ বাস্তবায়নে নভেম্বরের মধ্যে গণভোটের দাবিতে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। গণভোটের মাধ্যমে পাস করা আদেশের ভিত্তিতেই সংসদ নির্বাচন চায় মোর্চাটি। সরকার আজকালের মধ্যে সিদ্ধান্ত না নিলে ৩ নভেম্বর আন্দোলনরত দলগুলোকে নিয়ে জামায়াত পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবে।
জামায়াতে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের দিক থেকে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, নভেম্বরে গণভোটসহ পাঁচ দফা দাবি আদায়ে আমরা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকব।’