দেশের কৃষি অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত। কোথাও উৎপাদন বেশি কিন্তু ব্যয়ও বেশি, কোথাও আবার উর্বর জমি থাকা সত্ত্বেও ব্যবস্থাপনার অভাবে ফলন কম। আবার কোথাও ফসলি জমি বছরের বেশি সময় পতিত রাখা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘উৎপাদনশীল ও টেকসই কৃষি জরিপ ২০২৫’-এর তথ্য বলছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা ও লাভজনকতার মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট ভিন্নতা। জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট কৃষিজমির মধ্যে খুলনা বিভাগের কৃষিজমিই সবচেয়ে বেশি লাভজনক। এ বিভাগের ৫৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ কৃষিজমিতে টানা তিন বছর ধরে লাভজনক ফসল উৎপাদন হয়েছে। এরপর রয়েছে বরিশাল ও রংপুর বিভাগ। বরিশালের ৪৯ শতাংশ ও রংপুরের ৪৭ শতাংশ কৃষিজমি টানা তিন বছর লাভজনক ছিল। রাজশাহীতে এ হার ৪৬ শতাংশ। বিপরীতে সিলেট বিভাগে হার মাত্র ২২ শতাংশ, অর্থাৎ লাভজনক কৃষিজমির ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে এ অঞ্চল। জাতীয় পর্যায়ে দেখা গেছে, ৪৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ কৃষিজমি টানা তিন বছর লাভজনক ছিল, যা বাংলাদেশের কৃষির সামগ্রিক অবস্থার একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরে।
সমীক্ষায় দেশের ১৫ হাজার ৬০০টি খানা ও ৭২২টি প্রাতিষ্ঠানিক খামার থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তিনটি কৃষি মৌসুমে ধারাবাহিকভাবে যে জমিগুলো লাভজনক ছিল, সেগুলোকে ‘প্রত্যাশিত লাভজনক কৃষিজমি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এক বা দুই বছর লাভজনক জমিগুলোকে ধরা হয়েছে ‘গ্রহণযোগ্য’ শ্রেণিতে। এই দুই শ্রেণির মিলিত ফলেই টেকসই কৃষিজমির হার নির্ধারণ করা হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে জমির সঠিক ব্যবহার, আধুনিক প্রযুক্তির গ্রহণ ও কৃষকের সচেতনতার সম্মিলিত প্রয়াসের ওপর। খুলনার সাফল্যের মূলমন্ত্র লুকিয়ে আছে, মাটির সর্বোত্তম ব্যবহার ও মিশ্র চাষাবাদে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, খুলনা অঞ্চলের কৃষিজমি বেশি লাভজনক হওয়ার মূল কারণ হলো মিশ্র চাষাবাদ, যেখানে মাছের পাশাপাশি সবজি বা অন্যান্য ফসল চাষ করা হয়। এই পদ্ধতিতে জমির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার হয়, কারণ এক জমি থেকেই একাধিক আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেখানে একক ফসলের জমিতে টানা তিন বছর লাভজনকতার হার তুলনামূলক কম, সেখানে মিশ্র চাষে সেই হার ৫০-৫৬ শতাংশ পর্যন্ত ওঠে। এটি প্রমাণ করে যে, প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও সঠিক কৃষি কৌশল ও প্রযুক্তি প্রয়োগ করলে জমি লাভজনক করা সম্ভব।
বিপরীতে, উত্তরাঞ্চলে একক ফসলভিত্তিক চাষ বেশি হওয়ায় আয় তুলনামূলক কম এবং লাভজনক জমির পরিমাণও কম। মাটির সর্বোত্তম ব্যবহার, সঠিক প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদই খুলনার কৃষিকে টেকসই ও লাভজনক করেছে। সিলেটের কৃষি সীমাবদ্ধতার মূল কারণ লুকিয়ে আছে প্রাকৃতিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতায়। যা লাভজনক চাষাবাদের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।
কৃষিবিদদের মতে, সিলেট বিভাগের অনেক হাওর এলাকার জমি ছয় মাসের জন্য পানির নিচে থাকায় সেখানে বছরে মাত্র এক মৌসুম অর্থাৎ বোরো মৌসুমে ফসল করা সম্ভব। এ ছাড়া কিছু উঁচু জমিতে সেচের অভাব থাকায় কেবল আমন মৌসুমে ফসল হয় এবং বাকি সময় জমি পতিত থাকে। এ বাস্তবতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, টেকসই কৃষি শুধু মাটির উর্বরতার ওপর নির্ভর করে না; বরং কৃষি ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো, সেচ ব্যবস্থা এবং কৃষকের সক্রিয় উপস্থিতি সবকিছুই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের কৃষির উৎপাদনশীলতা ও টেকসই অবস্থার সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের কৃষিজমির একটি বড় অংশ এখনো টেকসই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজশাহী বিভাগে ৫১ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৫০ শতাংশ জমি টেকসই হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দুই বিভাগ লাভজনকতার দিক থেকে শীর্ষে নেই। এর প্রধান কারণ উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি, ফলে উৎপাদন টেকসই হলেও কৃষকের হাতে ন্যায্য মুনাফা পৌঁছায় না। এ থেকে বোঝা যায়, টেকসই উৎপাদন মানে সর্বাধিক লাভ নয়; বরং কৃষি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, ইনপুট খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারমূল্যের ভারসাম্য এই তিনটি উপাদানই লাভজনক কৃষির ভিত্তি নির্ধারণ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষিতে উৎপাদন বেড়েছে। তবে এর সঙ্গে সার ও কীটনাশকের ব্যবহারও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা টেকসই কৃষির জন্য সংকেতবাহী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় অর্ধেক কৃষিজমিতে এখনো সঠিক পরিমাণে ও সময়ে বৈজ্ঞানিকভাবে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা কমে যাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। এই অস্থিরতা শুধু মাটির নয়, কৃষকের আর্থিক স্থিতিতেও প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে কৃষি শ্রমিকদের মজুরিতেও রয়েছে বৈষম্য। ময়মনসিংহে প্রায় ৭৫ শতাংশ কৃষক জাতীয় গড় বা তার বেশি মজুরি পেলেও চট্টগ্রাম কিছুটা পিছিয়ে। আর সিলেট এখনো সবচেয়ে নিচে। অর্থাৎ সিলেটের কৃষি ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দুর্বল, যা সামগ্রিক কৃষি উন্নয়নের পথে বাধা। বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে টেকসই পথ খুঁজে পেতে হলে, আগে বুঝতে হবে কোনো কোনো অঞ্চলে কৃষি কাঠামো সবচেয়ে কার্যকরভাবে কাজ করছে এবং সেখান থেকে কী শেখা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে উৎপাদনশীলতা তুলনামূলকভাবে বেশি, তবে উৎপাদন ব্যয়ও সেখানে বেশি হওয়ায় কৃষকরা সবসময় বেশি লাভবান হচ্ছেন না। অন্যদিকে খুলনা ও বরিশাল বিভাগে কৃষি বেশি লাভজনক হলেও উৎপাদনের নিবিড়তা এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেনি, অর্থাৎ একই জমিতে আরও দক্ষভাবে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়ে গেছে। এই বৈচিত্র্যময় বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয় যে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং উৎপাদন নিবিড়তা বৃদ্ধি এই দুদিকে মনোযোগ দিতে হবে। বিশেষ করে সিলেটের মতো অঞ্চলে, যেখানে উৎপাদন এখনো কম, সেখানে প্রযুক্তি হস্তান্তর, কৃষক প্রশিক্ষণ ও মিশ্র চাষাবাদের প্রসার বাড়ানো জরুরি। লাভজনক অঞ্চলগুলোর অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে পারলে বাংলাদেশের কৃষি হবে টেকসই, লাভজনক এবং ভবিষ্যৎমুখী।
দেশের কৃষিকে আরও লাভজনক করে তুলতে হলে, প্রয়োজন মাটির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। যেখানে প্রতিটি জমি তার সম্পূর্ণ উৎপাদনক্ষমতা অনুযায়ী ব্যবহৃত হবে। এ লক্ষ্যে প্রথমত, মিশ্র চাষাবাদকে সম্প্রসারণ করা জরুরি। মাছ, সবজি ও ফসলের সমন্বয়ে এক জমিতে একাধিক আয়ের উৎস সৃষ্টি করলে জমির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার সম্ভব এবং কৃষকের আয় বহুগুণে বাড়ে। খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, সঠিকভাবে পরিকল্পিত মিশ্র চাষ শুধু জমির উর্বরতা রক্ষা করে না, বরং টেকসই কৃষির পথও খুলে দেয়। দ্বিতীয়ত, অঞ্চলভিত্তিক প্রযুক্তি হস্তান্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রতিটি এলাকার মাটির ধরন, জলবায়ু ও প্রাকৃতিক সম্পদ ভিন্ন তাই কৃষি প্রযুক্তিও হতে হবে সেই অনুযায়ী। উত্তরাঞ্চলে শস্যনির্ভর উৎপাদন যেমন কার্যকর, দক্ষিণাঞ্চলে মিঠা ও লবণাক্ত পানির মিশ্র চাষে প্রযুক্তির ব্যবহার সেখানে আরও বড় সাফল্য আনতে পারে। তৃতীয়ত, সেচব্যবস্থা ও পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন করতে হবে। সিলেট ও উত্তরাঞ্চলের মতো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পানির অভাব বা অতিরিক্ত পানির সমস্যায় জমি পতিত থাকে। স্থায়ী সেচব্যবস্থা ও জলধারণ অবকাঠামো গড়ে তুললে এসব জমিও নিয়মিত ফসল উৎপাদনের আওতায় আসবে। চতুর্থত, কৃষক প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা বাড়ানো অপরিহার্য। আধুনিক প্রযুক্তি, নতুন জাতের বীজ, সেচ ও সার ব্যবহারের উপযুক্ত পদ্ধতি সম্পর্কে মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিলে কৃষকরা দ্রুত পরিবর্তন গ্রহণ করতে পারবেন। এতে তাদের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং লাভজনকতা বাড়বে। সবশেষে, মজুরি ও বাজারসংযোগ জোরদার করাও অত্যন্ত জরুরি। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সমবায়ী বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কৃষকের পরিশ্রমের প্রকৃত মূল্য তিনি পান। মাটি, মানুষ ও প্রযুক্তির এই সম্মিলিত প্রয়াসই পারে বাংলাদেশের কৃষিকে টেকসই, আধুনিক ও লাভজনক করে তুলতে।
বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে মাটির সর্বোত্তম ব্যবহার, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং লাভজনক চাষাবাদের সম্প্রসারণের ওপর। খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহীর মতো অঞ্চলগুলো ইতিমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে সঠিক পরিকল্পনা, মিশ্র চাষাবাদ ও প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সীমিত সম্পদেও কৃষিকে লাভজনক ও টেকসই করা সম্ভব। এই অঞ্চলের কৃষকরা জলাশয়ভিত্তিক সবজি ও মাছ চাষে যেমন সাফল্য পেয়েছেন, তেমনি ফসলের বহুমাত্রিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জমির প্রতিটি অংশকে কাজে লাগিয়েছেন। অন্যদিকে সিলেট ও উত্তরাঞ্চলের মতো অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলো যদি এই মডেল অনুসরণ করে পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করে, আধুনিক কৃষিপদ্ধতি গ্রহণ করে এবং কৃষকের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, তবে দেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটিই হয়ে উঠতে পারে উৎপাদনের উর্বর ভাণ্ডার। এর ফলে শুধু খাদ্যনিরাপত্তা নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গ্রামীণ উন্নয়নের দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলবে।
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান ডিআরপি ফাউন্ডেশন
rssarker69@gmail.com