ইনস্টিটিউট ফর পলিসি, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিজিএডি) শনিবার (১ নভেম্বর) রাজধানীর দ্য ওয়েস্টিন হোটেলে ‘সমন্বিত পররাষ্ট্রনীতি গঠনের পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক জাতীয় সংলাপের আয়োজন করে। সংলাপে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাবেক কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা অংশ নেন। আয়োজকরা এটিকে বাংলাদেশের নতুন বৈদেশিক অবস্থান নিয়ে জাতীয় আলোচনার সূচনা হিসেবে অভিহিত করেন।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির পুনরুজ্জীবন
আইপিজিএডির চেয়ারম্যান ড. ইশারাফ হোসেন তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, সত্তরের দশকের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে অনুপস্থিত। তিনি নতুন সরকারকে এ নীতিকে পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র হিসেবে পুনর্বহাল করার আহ্বান জানান। বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন কবির বলেন, পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় আলোচনায় খুব কম স্থান পায়। তিনি পররাষ্ট্রনীতিতে পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।
আঞ্চলিক সহযোগিতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান
বিএনপির সংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে গঠিত সার্ক আঞ্চলিক সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করেছিল। তিনি বলেন, সংসদের মতো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে পররাষ্ট্রনীতি টিকিয়ে রাখা কঠিন। সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘আপনার শত্রু আমার শত্রু হতে হবে’-এমন নীতি বাদ দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়া উচিত।
বাস্তবভিত্তিক ও মানবকেন্দ্রিক নীতি
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা বলেন, পররাষ্ট্রনীতি সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে হবে। বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম বলেন, আগের সরকারের ‘ইলিশ কূটনীতি’ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল। তিনি জলবায়ু ন্যায়বিচার ও প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকারের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
আঞ্চলিক সম্পর্ক ও নতুন সুযোগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এএসএম আলী আশরাফ বলেন, সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে এবং তৈরি পোশাকের বাইরে ফার্মাসিউটিক্যাল ও হাইটেক টেক্সটাইল খাতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সাবেক রাষ্ট্রদূত এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন বলেন, দক্ষ কূটনীতিক তৈরিতে ভারত ও সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ
বিআইআইএসএস-এর সিনিয়র গবেষণা ফেলো ড. রাজিয়া সুলতানা বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ ৬৩ শতাংশ কমেছে। তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দূরদর্শী কূটনীতির ওপর জোর দেন। এনসিপির আন্তর্জাতিক সেলের সম্পাদক সুলতান মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে হবে। ঢাকা ফোরাম ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা আশফাক জামান বলেন, বাংলাদেশকে দরিদ্র ও বন্যাপ্রবণ দেশের ইমেজ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইসলামিক ন্যাটো’ নামে পরিচিত সৌদি-পাকিস্তান চুক্তি থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে।
সমাপনী
আইপিজিএডির নির্বাহী পরিচালক আলাউদ্দিন মোহাম্মদ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভিন্ন মত থাকলেও সবাই এক টেবিলে বসতে পারে। তিনি জানান, জুলাই ২০২৪-পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি এবং আইপিজিএডি সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করেছে।
সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে, বাংলাদেশকে এখন নিজের সংজ্ঞায় নতুন করে বিশ্বের সামনে দাঁড়াতে হবে।