গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় গণপিটুনিতে তিনজন নিহতের ঘটনায় মামলা দায়ের করে পুলিশ। রবিবার (২ অক্টোবর) গোবিন্দগঞ্জ থানার কর্মরত উপ পরিদর্শক (এসআই) তৌফিজ উদ্দিন বাদি হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন অজ্ঞাত আসামি করা হয়। মামলায় কাউকে আটক করা যায়নি।
এর আগে ভোর চারটার দিকে উপজেলার কাঁটাবাড়ি ইউনিয়নের নাসিরাবাদ এলাকায় গরু চুরি করতে গিয়ে গণপিটুতে তিনজন নিহত হয়।
নিহতরা হলেন, বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মাঝিহট্ট ইউনিয়নের দামপাড়া গ্রামের আলেব্বর আলীর ছেলে কাওছার আলী। তার মামা মোহাজার আলী বলেন, দীর্ঘদিন থেকে কাওছার ঢাকায় রিকশা চালাতেন। মাঝেমধ্যে গ্রামের বাড়িতে আসতেন। তবে গত ছয়মাসের মধ্যে তিনি বাড়িতে আসেনি। তার পাঁচ বছরের একটি মেয়ে সন্তান আছে।’ তার দাবি, কাওছার অতীতে চুরি বা ডাকাতি কাজের সাথে জড়িত ছিল না।
বাকিদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করছে রংপুর রেঞ্জের সিআইডির ক্রাইম সিনের একটি ইউনিট। তবে সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত ওই দুইজনের নাম পরিচয় বা পরিবারের খোঁজ পাওয়া যায়নি। মরদেহ তিনটি ময়নাতদন্তের জন্যে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
সরেজমিনে হেলালী পাড়া গ্রামে গিয়ে কথা হয় কৃষক আব্দুস সালামের সাথে। তিনি বলেন, ‘রাত তিনটার দিকে গোয়ালঘরে কয়েল জ্বালাতে গিয়ে দেখি আমার তিনটি গুরু নাই। পরে পাকা ঘোয়াল ঘরের দেয়াল ভাঙা। এর পরে আমি চোর চোর বলে চিৎকার করি। পরে আশপাশের লোকজন এসে চোরদের ধাওয়া করে। এক পর্যায়ে বাড়ির পাশে ধানের জমির ভেতরে গরু তিনটি পাওয়া যায়। এসময় চারদিক থেকে লোকজন জড়ো হয়। সবাই লাইট জ্বালিয়ে আলোকিত করে। আমার বাড়ি থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে নাসিরাবাদ এলাকায় শত শত লোক তিনজন চোরকে ধরে মারপিট করে। সেখানে দুইজন মারা গিয়েছে বলে আমি শুনেছি এবং সকালে হাসপাতালে একজন মারা গেছে সেটাও শুনেছি।’
হেলালী গ্রামের প্রতক্ষদর্শী আল-আমিন (২১) বলেন, রাতে চিৎকার শুনে টর্চ লাইট নিয়ে ঘটনাস্থলে আসি। পরে আমরা নাসিরাবাদ এলাকায় গিয়ে গিয়ে তিনজন লোক পুকুরে নেমে আছে দেখতে পাই। সেখানে শত শত লোকজন পুকুরের পার থেকে তাদের ইট-পাটকেল মারছে। এর পর সেই তিনজন লোক পুকুর থেকে উঠে আসলে শত শত লোকজন গণপিটুনি দিয়েছে। সেখানেই দুইজন লোক মারা গেছে। পরে শুনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন মারা গেছে।
যমুনাপাড়া গ্রামের প্রতক্ষদর্শী আসাদুল ইসলাম বলেন, নাসিরাবাদে আমার মনোহারি দোকান রয়েছে। রাতে চোর চোর বলে হৈ-হুল্লা শুনে জেগে উঠি। পরে দোকান দেখতে যাওয়ার সময় একটি মিনি পিকআপ আমার সামনে আসে। তাদের আমি আটকানোর চেষ্টা করি। কিন্তু তারা আমার ডান হাতে লোহার রড দিয়ে আঘাত করে পিকআপ নিয়ে পালিয়ে যায়। তিন থেকে চারজন ছিল সেই গাড়িতে। তবে গরু চোর না ডাকাত সেটা বুঝতে পারিনি। ঘটনাস্থল থেকে আমার দোকান প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে।
হেলালী পাড়া গ্রামের আব্দুল করিম বলেন, রাতে গরু চোর চিৎকার শুনে সালামের বাড়িতে এসে দেখি তার গরু নাই। পরে সবাই খোঁজাখোজি শুরু করি। একপর্যায়ে গরু তিনটি পাওয়া যায়। এর আগেও এই গ্রামে কয়েকবার চুরির ঘটনা ঘটেছে। গরু নিয়ে বিপদে আছি। রাত হলেই আতঙ্ক বাড়ে। গত সাতদিন আগেও বগুড়াপাড়া গ্রাম থেকে সাতটি গরু চুরি করে নিয়ে গেছে চোর। এই এলাকায় চোরের উপদ্রব খুব।
গাইবান্ধা সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সি-সার্কলের) এবিএম রশিদুল বারী বলেন, ‘একটি চোর চক্র গত রাতে হেলালী পাড়ায়ায় আব্দুস সালামের বাড়িতে গরু চুরি করতে গেলে এলাকার লোকজন তাদের গণপিটুনি দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুইজনকে মৃত অবস্থায় পায়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আর একজন মারা যায়। হত্যার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’